• শিরোনাম

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    কারবালা : অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়

    হাবিব মোস্তফা | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

    কারবালা : অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়

    কোরাইশ বংশের দুই শাখায় নবী মুহাম্মদ (সঃ) ও সাহাবা মুয়াবিয়া (রাঃ) জন্ম। তাদের দুজনেরই পূর্ব পুরুষ আবদে মানাফ। আবদে মানাফের দুই পুত্র ছিল: আবদে শামস ও আবদে হাশিম। আবদে শামসের মৃত্যুর পর তার পুত্র উমাইয়া কোরাইশ বংশের নেতৃত্বের দাবী করায় চাচা আবদে হাশিমের সাথে তার বিবাদ বাঁধে। এই বিবাদে কোরাইশ বংশ দুই গোত্রে বিভক্ত হয়ে যায়: ১.হাশিমি গোত্র ২. উমাইয়া গোত্র । ৫৭০ খ্রি: হাশিমি গোত্রের আবদুল্লার ঔরসে মুহাম্মদ (সঃ) জন্মগ্রহন করেন এবং ৬০২ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া গোত্রের আবু সুফিয়ানের ঔরসে মুয়াবিয়া জন্ম গ্রহন করেন। মক্কা বিজয়ের পর নবীজির কাছ থেকে সরকারী উচ্চ পর্যায়ে চাকুরী দেয়ার অঙ্গিকার নিয়ে মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে সাহাবার মর্যাদা লাভ করেন এবং নবীজির ওহী লেখক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
    একজন সফল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিশ্বনবীর ৬৩ বছরের জিন্দেগীর সমাপ্তি হলে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দায়িত্ব নিয়ে তথা খলিফা নিয়ে শুরু হলো চরম হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা। বিশ্বনবী তো লিখিতভাবে কারো নাম ওছিয়ত করে যাননি। এখন উপায়? নবীর কাছের সাহাবা হিসেবে আবুবকর, আলী, ওসমান কিংবা ওমর কারো থেকে কেউ পিছিয়ে নন। উমাইয়াদের মধ্যে বয়োজ্যৈষ্ঠ ছিলেন নবীজীর কনিষ্ঠ ও প্রিয় পত্নী আয়েশা (রা:) এর পিতা হযরত আবু বকর। অপর পক্ষে হাশিমি গোত্রের প্রার্থী নবী কন্যা খাতুনে জান্নাত ফাতিমা (রা:) এর স্বামী সবচেয়ে কম বয়সে ইসলাম গ্রহনকারী হযরত আলী। খলিফা মনোনয়ন নিয়ে উমাইয়া ও হাশেমী গোত্র দ্বন্দ্বের পুরনো আগুন মূহুর্তের মধ্যে জ্বলে উঠল।
    মক্কার কোরাইশগণ যেদিন রাসূলের মস্তকের বিনিময়ে বিরাট পুরস্কার ঘোষনা করল এবং নৃশংসা আরব দস্যুরা রসুলের দেহ হতে মস্তক আলাদা করার জন্য শানিত তরবারী হাতে ভোরের অপেক্ষা করছিল, সেই রাতে নির্ভিক আলী প্রিয় নবীর শয্যাতে চাদর আবৃত করে শুয়ে রইলেন। উদ্দেশ্য মোশরেকগন দেখে বিভ্রান্ত হবেন যে, রসুলই বুঝি বিছানায় শুয়ে আছে। ইত্যবসরে রসুল নিরাপদে মদীনায় হিযরত করলেন। আলী একবারও ভাবলেন না যে, কত বড় বিপদ তিনি সাদরে বরণ করতে যাচ্ছেন। হতে পারতো রসুলকে না পেয়ে তারা আলীকেই হত্যা করে বসতো। কিন্তু আলী নিজের জীবনের মায়া করলেন না। নবী করিম নিজেও বিভিন্ন কারনে আলীকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। অসংখ্য প্রমানের মধ্যে একটি হলো: নবী কন্যা ফাতেমা যখন বিয়ের বয়সে উন্নীত হলেন তখন নবীজির আপন চাচাত ভাই হওয়া সত্তেও আলীর সাথেই ফাতিমাকে বিয়ে দেয়া হয় । রসূল মনে মনে চাইতেন, রসুলের ওফাতের পর আলী যেন ইসলামের প্রধান কান্ডারি তথা প্রথম খলিফা নিযুক্ত হন। আলীর জ্ঞান গরিমার পরিধি শুধু এলমে শরীয়তেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে তিনি আরোহন করেছিলেন। এজন্যই রসুল বলেছেন: ‘আমি জ্ঞানের শহর আলী তার দরজা’। মহানবী আলী সম্পর্কে আরো বলেন: ‘হে আলী, আমার নিকট তুমি সে রকম, যেরকম মুসার নিকট হারুন, কিন্তু আমার পরে আর কোন নবী আসবেনা’। মহানবী আরো বলেন: ‘যে আলীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করল, সে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করল’।
    খলিফা নির্ধারনে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের জন্য আলীর সমর্থকগন বিদায় হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পথে গাদিরে খুম নামক স্থানে নবীজির ভাষনের কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন। প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার হাজীর উপস্থিতিতে আল্লাহর নবী সমবেত সকলের মধ্যে আলির হাতকে উচু করে বলেছিলেন: ‘আমি যার মাওলা আলী তার মাওলা, হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালবাসবে তুমিও তাকে ভালবেসো, যে তার সাথে শত্রুতা পোষন করবে তুমিও তাকে শত্রু জেনো’।
    মাওলা অর্থ প্রভু, কান্ডারী, অভিভাবক ইত্যাদি। নবী মুহাম্মদ ইসলাম ধর্মের অভিভাবক আর নবীর ওফাতের পরে ইসলামের অভিভাবক তথা খলিফা হবেন আলী। নবীর এই হাদিস তাই প্রমান করে। কিন্তু নবীর এ হাদিসের মূল্য কেউ দিলনা। উমাইয়ারা তীব্র সুরে আলীর কথার বিরুধীতা করল। তারা আবু বকরকেই রাসুলের প্রথম উত্তরসুরী করতে চাইল। যুক্তি দেখাল, রাসুলের জীবদ্দশায় রাসূল অসুস্থ হলে রাসুলতো আবুবকরের ইমামতিত্বে নামাজ আদায় করতেন। তাই আবু বকরই হবেন প্রথম খলিফা।
    সাধারণ জনগন এ স্পর্শকাতর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মক্কার একজন ও মদীনার একজন করে মোট দুই খলিফা নির্বাচিত করার পক্ষে মতামত দিলেন। সবাই খেলাফাতের গদি নিয়ে ব্যস্ত, এদিকে রাসূলের দেহ মোবারক জানাযা বিহীন পড়ে আছে, ওদিকে কারো খেয়াল নেই। অবশেষে হযরত আলী নিজ উদ্যোগে নবীজির জানাযার ব্যবস্থা করল। দাফন শেষে আলী জানতে পারল- সব যুক্তি তর্ক পদদলিত করে উমাইয়া গোত্রের লোকজন হযরত আবু বকরকেই ইসলামের প্রথম খলিফা মনোনিত করেছে। আবুবকর তাঁর স্বর্ণোজ্জল খেলাফাত শেষ করে মৃত্যুর পূর্বে নিজের পছন্দ মত খলিফা নিযুক্ত করেন তাঁর অনুসারী ও আস্থাভাজন হযরত ওমরকে। অত্যন্ত দূরদর্শি, উচ্চাভিলাসী ও চতুর রাজনীতিবিদ মুয়াবিয়াকে খলিফা ওমর তাঁর খিলাফাত কালে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন। খলিফা ওমর (রা: ) ইবনে মোলজেম নামক ঘাতকের হাতে আহত হয়ে মৃত্যুর পূর্বে তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ও তাঁর অনুসারী আব্দুর রহমান বিন আউফের হাতে। তারা উমাইয়া গোত্রের (নবীজির দুই কন্যার স্বামী) হযরত ওসমান (রা:) কে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করলেন।
    উসমান (রা:) খেলাফাত লাভে যারপর নাই খুশি হলো উমাইয়াগণ আর ক্রোধে ফেটে পড়ল হাশিমিগণ। বন্ধু বাৎসল, কোমল মনের অধিকারী খলিফা উসমান প্রশাসনিক অস্থিরতা, বাইতুল মালের অপব্যবহার এবং রাজ্যের সার্বিক নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হয়ে বিক্ষুব্দ জনতার হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হলেন।
    উসমানের মৃত্যুর পর প্রথম বারের মত জনগনের বিপুল ভোটে হযরত আলী খলিফা নির্বাচিত হলেন। কিন্তু পুরো আরব তথা উমাইয়া গোত্র জুড়ে তখন ওসমান হত্যার বিচার নিয়ে তীব্র আক্রোশ আকাশ বাতাস প্রকোম্পিত হলো। মা আয়েশা ঘোষণা দিলেন : উসমান হত্যায় আলী জড়িত। উসমান হত্যার প্রতিশোধ নিতে মা আয়েশার ডাকে উমাইয়া গোত্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। হযরত আয়েশা (রা:) আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন। আয়েশা ও আলীর মধ্যকার এই যুদ্ধ ইতিহাসের পাতায় জামাল যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে আলী জয়ী হলেন।
    আলী বিরাজমান অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা শান্ত করার জন্য সকল প্রাদেশিক গভর্নরের পদ বাতিলের ঘোষনা দিলেন। মুয়াবিয়াসহ সকল উমাইয়া গভর্নরগণ আলীর খেলাফাত অস্বীকার করলো এবং গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ না করে স্বপদে বহাল থাকল। এক পর্যায়ে মুয়াবিয়া নিজেকে স্বাধীন সাম্রাজ্যের খলিফা দাবী করে বসলো।
    মুয়াবিয়া আচমকা আলীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। হযরত আলী যুদ্ধ এড়ানোর জন্য ওসমান হত্যার বিচার করবেন বলে সবাইকে আশ্বস্ত করলেন, শান্তিপূর্ন আলোচনার জন্য মুয়াবিয়ার কাছে তিনি পত্র পাঠালেন। প্রতিউত্তরে মুয়াবিয়া জানিয়ে দিলেন : ‘উসমান হত্যাকারীদের তার কাছে শোপর্দ না করা পর্যন্ত কোন ধরনের আলোচনায় বসতে সে রাজী নয়’।
    আলী জানতেন তাঁর সেনা বাহিনীর বেশীর ভাগ লোকই উসমান হত্যার সাথে জড়িত। তাই উসমান হত্যাকারীদের মুয়াবিয়ার হাতে সোপর্দ করার অর্থই হচ্ছে নিজেই মুয়াবিয়াকে খলিফা হিসেবে মেনে নেয়া। আর এটা কিছুতেই হতে পারেনা। সুতরাং কোনরূপ সুরাহা হলো না, শুরু হলো আলী এবং মুয়াবিয়ার মধ্যে প্রকাশ্যে অস্ত্র যুদ্ধ। যুদ্ধে আলীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত দেখে মুয়াবিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে এক অনবদ্য প্রতারনার আশ্রয় নিল। তিনি তার সৈন্যবাহিনীকে বর্শার ফলকে কোরআন গেঁথে উড়াতে নির্দেশ দিলেন আর মুয়াবিয়ার সৈন্যরা কথা মত এই কাজ করে শ্লোগান দিতে থাকল: ‘অস্ত্র নয় আমরা কোরআনের মাধ্যমে ফয়সালা চাই’।
    আলীর সৈন্য বাহিনী মুয়াবিয়ার প্রতারনার ফাঁদে পা দিয়ে নিশ্চিত বিজয়ের যুদ্ধ বন্ধ করে দিল। বাধ্য হয়ে আলী যুদ্ধ বন্ধ করে মুয়াবিয়ার সাথে ঐতিহাসিক এক চুক্তি সাক্ষর করলেন। কিন্তু কট্টর আলী পন্থিরা মুয়াবিয়ার সাথে আলীর এই সন্ধি মেনে না নিয়ে আলীর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষনা করল এবং তারা আলীর পক্ষ থেথে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে খারিজি নাম ধারন করল।
    শান্তি চুক্তির প্রতিনিধিগন পরামর্শ দিলেন: যতক্ষন পর্যন্ত কমিটি সিদ্ধান্ত ব্যক্ত না করছে ততদিন আলীর অনুসারীরা আলীকে ও মুয়াবিয়ার লোকজন মুয়াবিয়াকে তাদের খলিফা হিসেবে মেনে চলবে। কেউ কাউকে আক্রমন করতে পারবেনা।
    কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত প্রকাশের জন্য ছয় মাস সময় চাইল। কমিটির মধ্যে অধিকাংশই ছিল উমাইয়া গোত্রের লোকজন।
    ছয় মাস পর কমিটি ঘোষনা করলেন: আজ থেকে আলী ও মুয়াবিয়া উভয়ের খেলাফাত অবৈধ ঘোষনা করা হলো। সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগন নতুন খলিফা নির্বাচিত করবেন। আগে থেকে শিখিয়ে দেয়া কমিটির ভিতর থেকে হঠাৎ একদল উচ্চস্বরে বলে উঠল: ‘রাজনীতিতে আলী সম্পূর্ন নতুন। খলিফা হয়ার যোগ্যতা তার এখনো হয়নি। রাজ্যের এই সংকটময় দিনে আমীরুল মোমিনিন হযরত মুয়াবিয়ার মত একজন বিচক্ষন, দক্ষ রাজনীতিবিদ আমাদের প্রয়োজন’।
    আলীর সমর্থকদের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। তারা শ্লোগান দিতে থাকল: মুয়াবিয়া শয়তান, মুয়াবিয়া শয়তান। কোনরুপ সিদ্ধান্ত ছাড়াই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে সম্মেলন ভঙ্গ হয়ে যায়। শুরু হয় মুসলিম বিশ্বে এক চরম অস্থির সময়। কিছুদিন পর রমযান মাসে ফজর নামাজে সেজদারত অবস্থায় ইবনে মুলজাম নামক এক খারিজি মসজিদ প্রাঙ্গনে বিষ মাখা তরবারীর আঘাতে আলীকে মারাত্মক ভাবে আহত করে, এ ঘটনার কয়েকদিন পর আলী মারা যান। চির প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যুতে মুয়াবিয়া স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলল।
    মুয়াবিয়া তার চলার পথে কোন কাঁটা রাখতে চাইলনা। তাই আলী দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও মুয়াবিয়া নবী পরিবারের পিছু ছাড়লেন না। মুয়াবিয়ার এবারের টার্গেট হলো আলী (রা:) এর জ্যৈষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান। হাসান (রা:) ঘরমুখো নিরীহ সরল স্বভাবের মানুষ ছিলেন, রাজনীতি কিংবা ক্ষমতা তাঁর পছন্দ ছিলনা। কিন্তু মুয়াবিয়া হাসানকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেন। হাসান মুয়াবিয়ার সাথে কোনরুপ সংঘাতে জড়াতে চাইলেন না। মুয়াবিয়া হাসানের লোভী স্ত্রী যায়েদাকে গুপ্তচর মারফত জানিয়ে দিল- যায়েদা যদি তার স্বামী হাসানকে বিষপানে হত্যা করতে পারে তাহলে তাকে এক লক্ষ দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে এবং পুত্র এজিদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করা হবে। লোভী যায়েদা মুয়াবিয়ার ফাঁদে পা দিলেন। যায়েদার দেয়া বিষ মিশ্রিত দুধ পান করে হাসান ইহলোক ত্যাগ করেন। বাবা এবং বড় ভাইকে হারিয়ে হোসাইন (রা:) দু:খ ভারাক্রান্ত মনে সপরিবারে মদীনায় চলে আসলেন।
    মুয়াবিয়া এবার ভাবলেন, নিজে ক্ষমতায় থাকতেই রাষ্ট্রের ক্ষমতা উমাইয়াদের হাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্থ করতে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি জ্যৈষ্ঠ পুত্র ইয়াজিদকে অগণতান্ত্রিকভাবে তার উত্তরাধিকারী তথা মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা মনোনিত করেন। মুয়াবিয়ার ওছিয়ত ও নীলনকশা অনুযায়ী তার মৃত্যুর পর পুত্র ইয়াজিদ পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেই সব ধরনের অনৈসলামিক কাজে লিপ্ত হয়। ইয়াজিদ মদ্যপ ছিল, ছিল তার বহু নারীতে আসক্তি পক্ষান্তরে ইবাদতের প্রতি ছিল তার দারুন অনাসক্তি। ইসলামের যেই খেলাফতের আসনে বসে আবু বকর, ওমরের মত সাহাবাগন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অন্যায়, দুর্নীতি কঠিন হস্তে মুলোচ্ছেদ করতেন, সেই পবিত্র আসনে বসে ইয়াজিদ নিজেই পাপের বন্যা বইয়ে দিল। যে দামেস্ক নগরী ইত:পূর্বে জ্ঞান ও ধর্ম চর্চার কেন্দ্র ভূমি ছিল, সেখানে এখন শুধু মোসাহেবী ও পাপ চর্চার স্রোত বইতে লাগল।
    নবী দৌহিত্র ইমাম হোসাইন ইয়াজিদদের হাতে বায়াত নেননি কিংবা তার সাথে কোনরুপ সংঘাতেও জড়াতে চাননি। বাবা (শেরে খোদা হযরত আলী) এবং বড় ভাই ইমাম হাসানকে হারিয়ে হোসেন দু:খ ভারাক্রান্ত মনে মদীনাতেই সাধারন মানুষের মত জীবন যাপন করছিলেন। এদিকে কুফাবাসী ইয়াজিদের অপশাসন ও অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য বার বার হোসাইনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছিল। কুফাবাসী হোসাইনের কাছে পর পর দেড় শতাধিক পত্র লিখে। এক পর্যায়ে হোসাইন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তাই কুফার প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য হোসাইন তাঁর চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে দূত হিসেবে সেখানে প্রেরন করেন। আকিল সেখানে গমন করে কুফাবাসীর সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে হোসাইন কে কুফায় আগমনের জন্য পত্র লিখেন। চিঠি হোসাইনের হস্তগত হবার পূর্বেই ইয়াজিদের অধিনস্থ ইরাকের শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের হাতে মুসলিম ধরা পড়েন এবং নির্মম ভাবে তিনি শহীদ হন। এ ঘটনায় কুফাবাসী প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন। তারা হোসাইনকে সাহায্যের পরিবর্তে নিজের জীবনকে বাঁচানো বেশী জরুরী মনে করল। নিয়তির ইচ্ছায় হোসেনের কাছে মুসলিমের মৃত্যু সংবাদ পৌছানের আগেই হোসাইন তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং অনুচরসহ ৩রা জিলহজ্ব ৬০ হিজরী কুফার অভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে মুসলিমের মৃত্যু সংবাদ শুনে ইমামের সঙ্গীগন বলল: এ অবস্থায় কুফায় গিয়ে আমাদের কোন লাভ নেই, চলুন আমরা মদীনায় ফিরে যাই।
    কিন্তু ইমাম কাফেলায় শামিল মুসলিমের আত্মীয়রা বলল: ‘এ হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে আমরা ফিরব না, যার ইচ্ছে হয় ফিরে যাক।’ হোসাইন ব্যথিত লোকদের মনস্তুষ্টি ও অন্তরজ্বালা নিবারনের জন্য কুফা যাত্রার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।
    প্রায় ১ মাস সফরের পর ২রা মহরম ক্লান্ত পরিশ্রান্ত কাফেলা ফোরাত নদীর তীরে এসে ইয়াজিদ বাহিনীর বাধার সম্মুখীন হলো। বাধ্য হয়ে ফোরাতের তীরে হোসাইন তাঁর সঙ্গী সাথী নিয়ে তাঁবু গাড়লেন। এতদিনে শিবিরে খাবার ও পানি সংকট দেখা দিল। ইয়াজিদ বাহিনী ফোরাত নদী থেকে ইমাম পরিবারের জন্য পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিল। কুফার শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের চার হাজার সশস্ত্র সৈন্য বাহিনী ইমামের শিবির অবরুদ্ধ করে ফেলল। বন্দী শিবিরে পানির জন্য হাহাকার পড়ে গেলো। একে তো মরুভূমির উত্তপ্ত হাওয়া-তপ্ত বালি, তদুপরি পানির অভাব; পিপাসায় সকলের কন্ঠতালু শুকিয়ে যাচ্ছে। মানুষতো ভালো কাফেলার উট ও ঘোড়া গুলো পর্যন্ত পিপাসায় মূমুর্ষ প্রায়। ইমামের এ শিবিরে কয়েকটি মাসুম বাচ্চা ছিল। তারা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পানি পানি বলে গগণ বিদারী চিৎকার শুরু করে দিয়েছে।
    এই অবস্থায় হোসাইন ওবায়দুল্লাহর নিকট তিনটি প্রস্তাব দিলেন: ১) হয় তাঁকে মদীনায় ফিরত যেতে দেয়া হোক ২) অথবা কোন মুসলিম দেশে গমন করার সুযোগ প্রদান ৩) অথবা ইয়াজিদের সাথে আলোচনায় বসার জন্য দামেস্কে যেতে দেয়া হোক। কিন্তু পাষন্ড ওবায়দুল্লাহ হোসেইনের কোন প্রস্তাবই গ্রহন করল না।
    জীবনের সর্বশেষ রাতে হোসাইন তাঁর সঙ্গী সাথীদের একত্র করে দরদি কন্ঠে তাদেরকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। হোসাইনের সঙ্গী মুসলিম বিন আওসাজা ইমামকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ‘হে নবীর আওলাদ; দুশমনের এই বিশাল বেষ্টনির মধ্যে আপনকে একা রেখে আমরা চলে যাব? খোদার কসম, এ কাজ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ আপনার পর আমাদের জীবন নসিব না করুন’। বাকী রাতটুকু ইমাম ও তাঁর সঙ্গীদের মোনাজাত ও আহাজারিতে কাটে।
    ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই অক্টোবর। পানির পিপাসায় শিবিরের সকলের জীবন মরনাপন্ন। বাচ্চারা সকলে মূর্ছা গেল, যারা বয়স্ক ছিল তারাও কাতর হয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল মরতে যখন হবেই তাহলে লড়াই করেই মরব। শিশু আর মহিলা ছাড়া অন্য সব পুরুষ সদস্যরা তরবারী হাতে ফুরাত নদীর দিকে এগোল। উদ্দেশ্য যুদ্ধ নয়, পানি পান করা। কিন্তু নিষ্ঠুর ইয়াজিদ বাহিনী ক্ষুধার্ত পিপাসার্ত হোসাইন বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ। হাসান পুত্র কাশিম সর্ব প্রথম শহীদ হলেন। হোসাইন পিপাসায় মৃতপ্রায় তাঁর দুধের শিশু আসগরকে নিয়ে ফোরাতের দিকে পা বাড়ালেন। শত্রুরা তীর এসে আসগরের বুক বিদীর্ণ করলো। বিষন্ন হোসাইন হাঁটু গেড়ে শিবিরের সামনে বসে পড়লেন। দেখতে দেখতে হোসাইনের সফর সঙ্গী নবীজির প্রিয় সাহাবা হাবিব ইবনে মাজাহের, মুসলিম ইবনে আওসাজা সহ হোসাইনের সকল পুরুষ সঙ্গী শহীদ হতে থাকলেন।
    কারবালার মাঠে একে একে সকল সঙ্গী যখন মারা যাচ্ছে হোসাইন তখন সকলের লাশ তুলে এনে তাঁর তাঁবুতে রাখছেন। অবশেষে হোসাইন যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তিনি তাঁর নানাজীর শিরস্ত্রান মাথায় বাঁধলেন, পবিত্র পিরহান অঙ্গে পড়লেন, বড় ভাই হাসানের কটি বন্ধটি হাতে বাধলেন। ডান হাতে ধারন করলেন পিতা আলীর জুলফিকার, বাম হাতে বর্শা, পৃষ্ঠে বাধলেন বর্ম। এই অপূর্ব সাজে সজ্জিত হয়ে বীর হোসাইন দুলদুলে আরোহন করলেন। যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে হোসাইন এক মর্মস্পর্শী ভাষন দিলেন: ‘হে লোক সকল, আপনারা তাড়াহুড়ো ও গোলমাল করবেন না, শান্ত হোন, আমার কথাগুলো মনযোগ সহকারে শুনুন। আমি দুনিয়াবি খেলাফাতের মোহ ভুলে এমনকি ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ না নিয়েই নানাজীর রওযার পাশে বসে শুধু আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলাম। আপনারা বার বার আমাকে পত্র দিয়ে ভালোবাসার পরকাষ্ঠা দেখিয়ে আমাকে কুফায় আসার জন্য অনুরোধ করেছেন, আমার আনুগত্য স্বীকার করবেন বলে ওয়াদা করেছেন। কি জানি কি বুঝে আজ আপনারা আপনাদের ওয়াদা ভঙ্গ করে সরাসরি গাদ্দারি করছেন। ভালো কথা-আমি না হয় আপনাদের শত্রু, কিন্তু আমার সঙ্গী সাথী নিস্পাপ শিশু ও অসহায় নারীদের সাথে আপনাদের কিসের শত্রুতা? এক বিন্দু পানির জন্য তারা আজ মারা যাচ্ছে, তাদের প্রতি কি আপনাদের একটু মায়া হয়না? কেমন মুসলমান আপনারা?
    হে কুফাবাসীগন, যে বিশ্ব নবীর কলেমা আপনারা পাঠ করছেন, যার উপর দুরুদ পড়ছেন তার রক্ত আজ আমার শরীরে প্রবাহিত। নবী পরিবারের সাথে এত বড় বেয়াদবি ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করতে আপনাদের অন্তর কেঁপে উঠছেনা? আজ আমার পরিবারের সাথেই আপনারা এমন অমানুষিক আচরন করছেন?’
    ইমামের বক্তব্য শেষে ইয়াজিদের কিছু সৈন্য বাহিনী সেনাপতি হোরের নেতৃত্বে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেয়। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। হোসাইনের পক্ষের ক্ষুৎপিপাসায় কাতর লোকজন একে একে সবাই শহীদ হচ্ছেন। হোসাইন এবার রুদ্র মূর্তি ধারণ করলেন। বাবার প্রদত্ত জুলফিকারের আঘাতে নিমিষে অনেক শত্রুর মস্তক দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেলো। ইয়াজিদের সৈন্য বাহিনী ভয় পেয়ে গেলো, তারা পিছু হটতে শুরু করলো। হোসাইন দেখলেন তিনি ফোরাতের অতি নিকটে। সাত দিনের পিপাসার্ত হোসাইন একটু পানি পান করবেন এ প্রত্যাশায় দুলদুল থেকে এক লাফে নেমে ফোরাতের নিকটবর্তী হলেন, আজলা করে পানি তুলে মুখে দেবেন এই মূহুর্তে তাঁর চোখে নিস্পাপ শিশু আলী আসগরের মুখচ্ছবি ভেসে উঠলো। ইমাম ভাবলেন নিস্পাপ এ দুধের শিশু পানি পান না করতে পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো, আর আমি তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করব, তা কখনো হয়না। তিনি মুখে না দিয়েই পানি নদীতে ফেলে দিয়ে তীরে এসে দাড়ালেন। ইয়াজিদের সৈন্যগনের প্রত্যেকের বাসনা ছিল সে ছাড়া অন্য কেউ হোসাইনকে হত্যা করুক। যাতে তার হাত রসুলের দৌহিত্রের রক্তে রঞ্জিত না হয়। অবশেষে সীমার বিন যুল জাওশান নামক ইয়াজিদের এক সৈন্য বর্শা দিয়ে আঘাত করে হোসাইনকে ধরাশায়ী করে ফেলে। একজন নবী প্রেমিক, নবীর পরিবার প্রেমিক মুসলমান হিসেবে তারপরের দৃশ্য বর্ননায় আমার অক্ষমতা রয়েছে। কারন বিষয়টি সম্পূর্ণ কল্পনার আশ্রয় নিয়ে লিখতে হবে। কোন কোন গবেষকদের মতে, সিমার হোসাইনের বুকের উপর বসে হাতের খঞ্জর দিয়ে অতি দ্রুত এবং দৃঢ়তার সাথে জীবিত মুমূর্র্ষ হোসাইনের দেহ থেকে মাথা আলাদা করেছিল। আবার কেউ কেউ দাবী করেছেন বর্শার আঘাতেই হোসাইন শহীদ হয়েছিলেন, অতপর সীমার হোসাইনের মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তরবারী দিয়ে জবাই করে তাঁর মাথা আলাদা করেছিল।
    সিমারের নির্দেশে হোসেনের মস্তক বিহীন দেহটি রক্ষা পায়নি পৈচাশিকতা ও নারকীয়তা থেকে। হোসেনের প্রাণহীন দেহকে বিবস্ত্র করা হয়। তার পর এই পবিত্র দেহটির উপর দিয়ে শতাধিক ঘোড়া আরোহী সহ দামেস্কের উদ্দেশ্যে বাতাসের বেগে যাত্রা শুরু করে। ঘোড়ার পায়ের আঘাতে হোসেনের দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে কারবালার মাঠে ছিটকে পড়ে। আর পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের ঘোষিত পুরস্কারের কল্পনায় বিভোড় খুনী সিমার হোসেনের মাথা বর্শার অগ্রভাগে গেঁথে খুশি মনে দামেস্কের রাজপ্রাসাদের দিকে রওয়ানা হয়।
    কারবালার যুদ্ধ থেকে আমরা এই শিক্ষা পেতে পারি যে, সত্য কখনোই অসত্য আর অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। কারবালার মাঠে যে ইমাম হোসাইন(রা:) ইয়াজিদের বায়াত মেনে নিতেন, তাহলে পৃথিবীর ইতিহাসের এই রক্তাক্ত ঘটনার অবতারনা হত না। তাতে আপাত দৃষ্টিতে নবী পরিবারের সদস্যরা প্রাণে বেঁচে গেলেও পৃথিবী থেকে ইসলামের নাম চিরতরে মুছে যেত। ইসলামের শ্বাশত প্রেম ও ভালবাসার পতাকা কখনোই আর আকাশে উড়ত না, কোরআনের চিরকল্যাণকর সুমহান বাণী কর্মে-চিন্তায়-দর্শনে ধারণ করার মত কেউ অবশিষ্ট থাকতো না।
    কারবালার ময়দানে নবী পরিবারের সদস্যরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে প্রমান করে গেলেন আহলে বায়াত তথা সত্যিকারের ইসলামের কান্ডারিরা যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন থাকবে, ত্যাগের মহান দীক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে সৃষ্টির কল্যানে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিবে।

    লেখক: গীতিকবি-সংগীত শিল্পী- গবেষক

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী