• শিরোনাম

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সাংবাদিকতা ও নগদ নারায়ণ

    খালিদ ফেরদৌস | ২৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৭:২৪ অপরাহ্ণ

    জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সাংবাদিকতা ও নগদ নারায়ণ

    আসন্ন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল জাতীয় সংসদ নির্বাচন; যেখানে অনিশ্চয়তার ডামাডোলও কম না। কারণ দফায় দফায় প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি একে অপরকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে, এমন অভিযোগের বানে বিদ্ধ করছে। যদিও সারাদেশের রাজনৈতিক সচেতন মানুষের ভাবনা জুড়ে নির্বাচন, নজর এখন টিভি চ্যানেলের পর্দায়, পত্রিকার পাতায় বা অনলাইন পোর্টালে। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে সাধারণ মানুষের আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে পুঁজি করে লোকসানে থাকা, ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ভূইফোড় মিডিয়াগুলোও মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করে নিদিষ্ট কোন রাজনৈতিক শক্তিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবার চেষ্টা করছে। বেড়ে গেছে অখ্যাত মিডিয়াগুলোরও চাহিদা। তারা দেশের দুই বড়জোটের নামে রাজনৈতিক নানা গুজব রটিয়ে ও মিথ্যা-বানোয়াট সংবাদ প্রচার করে অসৎ উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যতিব্যস্ত। ইত্তেফাক, যুগান্তর, প্রথম আলোর মতো প্রথিতযশা পত্রিকা বাদে অনেক মিডিয়া দলবাজি ও দলকানা মনোভাব দেখিয়ে একটা বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর স্বার্ধ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা শুধু দৃষ্টিকটু নয়; নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং সাংবাদিকতা পেশার জন্য আত্মঘাতী।
    কিছু কিছু মিডিয়া ও সাংবাদিক সাংবাদিকতা পেশার যথাযথ নিয়ম-কাননের তোয়াক্কা না করে কোন নিদিষ্ট গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য পূরণের জন্য মিথ্যা ও ভূয়া সংবাদ প্রচার করছে। কেউ কেউ নির্বাচনের সুয়োগে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে নির্বাচন করতে চাই এমন সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করছে। ৩০ ডিসেম্বর হতে যাওয়া একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন কোন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার রিপোর্টাদের দলের মনোনয়ন প্রত্যাশিদের সাক্ষাতকার বা সংবাদ প্রচারের নামে নগদ নারায়ণ গ্রহণের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ আছে, দেশের একটা নিউজ চ্যানেলের রিপোর্টার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সনামধন্য শিক্ষকের কাছ থেকে সাক্ষাতকার গ্রহণ করে তা প্রচারের জন্য টাকা দাবি করে। আমি নিজে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত থাকায় আগামী সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। যেখানে গিয়ে খুব স্থূলভাবে অবলোকন করেছি; বিভিন্ন চ্যানেলের সাংবাদিক মনোনয়ন প্রত্যাশিদের অভিমত বা সাক্ষাতকার প্রচারের কথা বলে কোন রাকঢাক না করে খোলামেলাভাবে উৎকোচ গ্রহণ করছে। আরো মজার তথ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নিজেদের জাত চেনাতে বা দলের নীতি নির্ধারকদের কাছে নিজেকে যোগ্য ও জনপ্রিয় হিসেবে প্রমাণ করতে লাখ লাখ টাকা মিডিয়ার পেছনে খরচ করার জন্য বাজেট করে রেখেছে। বললে কট্যুক্তি হবে না, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সমুদয় নির্বাচনি ব্যয় পঁচিশ লাখ টাকার বেশি কোন কোন প্রার্থী শুধুমাত্র মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারনার জন্য প্রস্তুত রেখেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এই ব্যয় কোটি টাকা পেরুলে অবাক হবার থাকবে না। এটাতে তথ্য বিভ্রাট ও অসত্য সত্যের মোড়কে উপস্থাপিত হওয়াতে দল ও সাধারণ জনগণ সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া এটা অবিরত ধারায় চলতে থাকলে ভালো ও গুণী মানুষের সাক্ষাতকার টিভি বা পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও দর্শক বাঁকা চোখে দেখতে পারে।
    অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপন তৈরি করে মিডিয়াতে প্রচারের ব্যবস্থা উন্নত বিশ্বেও প্রচলন অাছে। যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্টশিয়াল নির্বাচনে ডেমোক্রাট ও রিপাবলিক দলীয় প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর পক্ষে অনেক টাকা ব্যয় করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল। আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের কিছু লোক আমেরিকার সেই নির্বাচনে বিজ্ঞাপন প্রচারে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গিয়েছিল।
    কোন কোন মিডিয়া সংসদ নির্বাচনে ইচ্ছুক ব্যক্তির দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করে দেব এমন ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেবার পায়তারা করছে। এমন হলুদ সাংবাদিকতা বা নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ড সাংবাদিক হিসেবে তো নয়ই একজন বিবেচনাপ্রসূত মানুষ হয়ে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আবেগ ধ্বংসের পাশাপাশি সঠিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পথে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। এখন ইস্তেহার ঘোষণার পর থেকে সাংবিধানিকভাবে সকল ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে। এমনটি বিচেনায় নিয়ে সুষ্টু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তাদের উচিৎ হবে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে দূরে রাখ দে তীক্ষ্ণ নজর রাখা।
    কেননা আসন্ন জাতীয় নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নতি ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা স্থানান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন মানে শুধু একটা নির্বাচন নয় এটা ইদ-পূজা-পার্বণকে টপকিয়ে সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম। উৎসব বলার কারণ প্রতি পাঁচ বছর পর পর দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলেরপ্রতিআবেগ-ভালোবাসারজন্য অনেকবাধা-বিপত্তি, ভয়, ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বলয় ভেদ করে রাত-দিন একাকার করে নিজ দলের জন্য কাজ করে এবং ভোটের দিন নানা প্রতিকূলতা পেরিয়েও ভোট কেন্দ্রে গিয়ে “ আমার ভোট আমি দেব, দেখে শুনে বুঝে দেব” ভিত্তিতে সবাই তার ভোটাভিকার প্রয়োগ করে।
    দীর্ঘদিন দলের জন্য শ্রম দিয়ে, মেধা বিনিয়োগ করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিয়ে দলকে বিজয়ী করে একজন সাধারণ কর্মী বা সমর্থক জীবনে হয়তো কিছুই পাবে না কিন্তু সে বুক ফুলিয়ে বলবে, আমার দল ক্ষমতায়। এটা জাতীয় মনোবল (National Confidence) বৃদ্ধি করে। সমর্থকদের নিজ দলের গঠিত সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মকাণ্ডসহ সার্বিক কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকে যা জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
    আমরা জানি উন্নত বিশ্বে ৫০% ভোট কাস্ট হয় না। যেখানে বাংলাদেশে ৮০-৯০% ভোট কাস্ট হবার অনেক ইতিহাস আছে। তাই এত বৃহৎ একটা অংশের আবেগ নিয়ে খেলা করাটা সকলের জন্য খারাপ পরিস্থিতি বয়ে আনতে পারে। যা দেশের জন্য মারাত্বক ক্ষতির কারণ। আর বর্তমান বিশ্ব যেহেতু মিডিয়া নির্ভর হয়ে পড়েছে তাই সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িতদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখাটা খুব জরুরি। তাই মিডিয়াকর্মীদেকে মানুষের আবেগ-অনুভূতি তথা দেশের রাজনৈতিক উৎকর্ষ সাধনে সাংবাদিকতায় কঠোর ও কঠিন পেশাদারিত্ব বজায় রাখা উচিৎ। এখন সাংবাদিকতা শুধুমাত্র একটা পেশা নয় এটা একটা ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়াকে বলা হয় ছায়া সরকার (Shadow Government) আর দেশের টেকসই উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি ছায়া সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঠিক চিত্র একমাত্র সাংবাদিকরাই সবাই সামনে তুলে ধরতে পারে। যা ক্ষমতাসীনদের সংযত আচরণের সাথে সাথে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করায়।
    ১/১১ পর দুই নেত্রীর মুক্তিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো।
    এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের উপর সকল জনগণের কল্যাণ ও অগ্রগতি নির্ভর করে। তাই সাংবাদিকদের আর্থিক লাভ বা নগদ নারায়ণের কথা চিন্তা না করে দেশের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে গুটি কয়েক অসাধু সাংবাদিকের কারণে সাংবাদিক সমাজ বিতর্কীত হচ্ছে। সাংবাদিক সমিতির উচিৎ হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সাংবাদিকতা পেশাকে কলুষ ও কালো টাকার রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা।
    যা হোক, সারাদেশে যে নির্বাচন কেন্দ্রিক উৎসবের আমেজ ও আবেগ তৈরি হয়েছে তা আরো বেগবান করে একটা উদাহরণ সৃষ্টিকারী ভােলো একটা নির্বাচন আয়োজনে তাদের দায়িত্ব পালনে যত্নবান হতে হবে। এটা করা সম্ভব না হলে দেশ অভাবনীয় সংকটে পতিত হবে। আর করা সম্ভব হলে দেশ এগিয়ে যাবে টেকসই ও সার্বিক উন্নয়নের স্রোতধারায়। কারণ যে দেশের সাংবাদিকতার মান যত উন্নত সেই দেশের ন্যায় বিচায় ও আইনের শাসন তত বেশি মজবুত ও দৃঢ়।
    লেখক;
    খালিদ ফেরদৌস
    কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী