• শিরোনাম

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    প্রসঙ্গঃ মুকসুদপুরের গোপীনাথপুরের মিয়া বাড়ী

    মোঃ শহীদুল ইসলাম বেলায়েত | ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ

    প্রসঙ্গঃ মুকসুদপুরের গোপীনাথপুরের মিয়া বাড়ী

    মরহুম বড় ভাই বাকি মিয়া পর্যন্ত গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের গোপীনাথপুর মিয়া বাড়ী পরিবারের ১৭তম প্রজন্ম। যাদের অনেকেই ইতিমধ্যেই গত হয়েছেন। মুকসুদপুর উপজেলার বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আশরাফুল আলম শিমুল এ পরিবারের ১৮তম প্রজন্ম। যতদুর জানতে পেরেছি তাতে অনুমান করছি মোঘল শাসনের শেষ দিকে বর্তমান সালথা থানার জদুনন্দি গ্রাম থেকে ফৈজদ্দিন শরীফ বর্তমান গোপীনাথপুর গ্রামে এসে প্রথম বসবাস শুরু করেন। তখন এ গ্রামে অল্প কয়েক ঘর কুমার সম্প্রদায় বসবাস করতেন বলে পূর্বসুরীদের কাছ থেকে জেনেছি। উক্ত কুমারদের একজনের নামানুসারে এ গ্রামের নাম গোপীনাথপুর রাখা হয় বলে জেনেছি। এর পরবর্তি ৬ পুরুষের কোন ইতিহাস জানা না থাকায় তাদের সম্পর্কে কোন তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। এ পরিবারের ৮ম পুরুষ ছিলেন গয়েজউদ্দিন শরীফ। সম্ভবতঃ তার নামের সঙ্গে মিয়া যুক্ত হয়ে তিনি গয়েজউদ্দিন মিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং সামাজিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে মিয়া বংশের গোড়া পত্তন করেন। তাঁর একমাত্র পূত্র ছিলেন মোমতাজ মিয়া। মৃত্যুকালে মোমতাজ মিয়া এতো বিপুল পরিমান বিত্ত রেখে যান যে তার একমাত্র পূত্র ফৈজদ্দিন মিয়া বৃটিশ সরকারের নিকট থেকে জোত কিনে নেন। উজানী রাজাদের কিছু অংশ বাদ দিয়ে তেলিহাটি পরগনার কৃষনাদিয়া থেকে কাশিয়ানী উপজেলার রাহুথড় পর্যন্ত যার পরিধি ছিলো। জোতদার ফৈজদ্দিন মিয়া নামে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।ফৈজদ্দিন মিয়ার ইন্তেকালের পরে তার পূত্র বিষু মিয়া জোতের অধিকারী হন। বিষু মিয়ার একমাত্র পূত্র ছিলেন চান্দ মিয়া। এই ১৩ তম পূরুষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই মাত্র একজন উত্তরাধিকারী রেখে ইন্তেকাল করেন। চান মিয়া মৃত্যুর সময় সাবের মিয়া, জাবের মিয়া ও নাজেম মিয়া নামে তিন পূত্র রেখে যান। এ সময় থেকেই বংশের জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। সাবের মিয়া জৈষ্ঠ্য হওয়ায় তার কাঁধেই বংশের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব আসে। জোত ততা¡বধান করা ও বংশীয় প্রভাব রক্ষা করতে সাবের মিয়া ব্যস্ত থাকতেন। যাতায়াতের জন্য তার দুটি বিশাল দেহী ঘোড়া ছিলো। বংশীয় প্রভাব বৃদ্ধির জন্য এতদাঞ্চলের প্রভাবশালীদের সংগে আত্মীয়তা করেছিলেন। অন্য দুভাই জাবের মিয়া ও নাজেম মিয়া পিছন থেকে বড় ভাইকে যেমন শক্তি যুগিয়েছেন তেমনি বিশাল সংসারের সব ঝামেলাও তারাই সামলাতেন। সাবের মিয়ার পূত্র ছিলেন আঃ লতিফ মিয়া, আঃ মজিদ মিয়া, আঃ রশিদ মিয়া, আঃ মালেক মিয়া, আঃ জলীল মিয়া, আঃ ওহাব মিয়া ও আঃ মান্নান মিয়া। জাবের মিয়ার একমাত্র পূত্র ছিলেন আঃ ওয়াজেদ মিয়া এবং নাজেম মিয়ার আঃ গনি মিয়া,আঃ লাল মিয়া ও বালা মিয়া নামে তিন পূত্র ছিলো। বংশের কন্যা সন্তানদের সংখ্যাও কম ছিলনা,তবে তাদের সম্পর্কে তথ্যের স্বল্পতা লেখার পরিধির কথা ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম। আঃ লতিফ মিয়া ছিলেন রসিক ও সৌখিন মানুষ। আনন্দ ফুর্তী নিয়েই তিনি বেশী সময় ব্যয় করতেন। তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিলেন চাচাত ভাই আঃ ওয়াজেদ মিয়া। সে আমলে চিকিৎসক না থাকায় এ দুজনে মিলে কবিরাজি করতেন এবং জ্বিন তাড়ানো, ঝাড়-ফুক, তাবিজ-কবজ দিয়ে মানুষের উপকারের চেষ্টা করতেন। আঃ মজিদ মিয়া ছিলেন সৎ ও ধার্মিক। তার সুললিত কন্ঠের কোরআন তিলাওয়াত ও আজান মানুষকে মুগ্ধ করতো। বর্তমান টেংরাখোলা ও পশারগাতি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ইউনিয়ন বোর্ডের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। একনাগাড়ে ২৮ বছর তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং খানপুরার জমিদার রহমতজান চৌধুরীর পূত্র মহম্মদ জান চৌধুরীকে পরাজিত করে পর পর দুইবার তদানিন্তন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ফরিদপুর জুরী বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয়, উজানী রাজাদের এক কন্যা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। রাজকন্যা মালেকুন্নেছা চৌধুরানীকে পাবনা জেলায় বিয়ে দিয়ে জামাতাকে খানপুরার জমিদারী উপহার দেয়া হয়। মালেকুন্নেছা চৌধুরানীর একমাত্র সন্তান ছিলেন জমিদার রহমতজান চৌধুরী। লতিফজান চৌধুরী, সৈয়দজান চৌধুরী ও মহম্মদজান চৌধুরী এই তিনজন ছিলেন রহমতজান চৌধুরীর পূত্র। সাবের মিয়ার ৩য় পূত্র আঃ রশিদ মিয়ার কোন বংশধর না রেখেই মারা যান। ৪র্থ পূত্র আঃ মালেক মিয়া ছিলেন দীর্ঘ দেহী পূরুষ। তার মুষ্ঠি ও কব্জির শক্তি বংশের সম্মান রায় ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। কমলাপুর গ্রামের বিত্তশালী জসিমউদ্দীন তালুকদারের কন্যার সঙ্গে আঃ মালেক মিয়ার বিয়ে হয়। পঞ্চাশের দশকে আঃ মালেক মিয়া টেংরাখোলা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেশ কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। আঃ জলীল মিয়াও ছিলেন সুপূরুষ। নিজের চেষ্টায় তিনি বিশাল অর্থ বিত্তের মালিক হন। তার বাড়িতে প্রায় প্রতি সপ্তাহে মিলাদ মাহফিল, জিকির ও তবারক বিতরণ করা হতো। এলাকায় তিনি মুন্সী সাহেব হিসাবে পরিচিত ছিলেন। আঃ ওহাব মিয়া ছিলেন অন্যান্য ভাইদের তুলনায় একটু খাটো। ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আঃ ওহাব মিয়া ছিলেন উদার ও তীক্ন বুদ্ধি সম্পন্ন। যৌবনে কিছুদিন প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকতা করেছিলেন বিধায় অনেকে তাকে মাষ্টার সাহেব বলে সম্মোধন করতো। তিনি ছিলেন উঁচু মাপের একজন নাট্যাভিনেতা। চাচার সে প্রভাব হয়তো আমার মনে প্রভাব ফেলেছিলো বিধায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার পদচারনা। সব ছোট মান্নান মিয়া ছিলেন সকলের প্রিয়। মুরব্বীরা তাকে মানি মিয়া নামে ডাকতেন। আর আমরা যারা প্রায় শ-খানেক ভাতিজা ভাতিজি ছিলাম তার নামটাকে একটু ছোট করে আদর মাখিয়ে ডাকতাম “মনা” বলে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনতা পাওয়ার পরে সরকার জোতদারী প্রথা তুলে দেয়ায় বিপাকে পড়ে এ পরিবার। জোতের প্রায় সব সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়। পরিবারের এই ১৬তম পুরুষের আমলেই মুকসুদপুর থানা স্থাপন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারী দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন,প্রথম কুমার নদ সংস্কার ইত্যাদি উন্নয়ন মূলক কাজ হয়। এ পরিবারের প্রধান বৈশিষ্ট ছিল সকল শ্রেণীর মানুষের সংগে সম্মানজনক আচরন করা। মানুষের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। যা এখনও অনেকের মধ্যে বিরাজমান। সকল শ্রেণীর মানুষের সংগে আত্মিক সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ দিনের। গোপীনাথপুরের মিয়া পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তি অনেকের কাছেই ছিল ঈর্ষনীয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে এ বংশের ১৬তম পুরুষের সকলেই ইন্তেকাল করায় পরিবারের উপর দুর্যোগ নেমে আসে। বয়সে তরুণ হলেও আঃ ওহাব মিয়ার প্রথম পূত্র খায়রুল বাকি মিয়া পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষা করতে এগিয়ে আসলেন। সকল মতভেদ ভুলে বংশের সকলে এবং গ্রামের সব মানুষ তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সকলের ঐকান্তিক চেষ্টায় বাকি মিয়া প্রথমে টেংরাখোলা ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান এবং সব শেষে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গোপীনাথপুর মিয়া পরিবারের নিভু নিভু প্রদীপকে উজ্জীবিত করেন। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু মিয়া পরিবার নয় গোপীনাথপুর গ্রামের উপরই যেন বজ্রাঘাত হয়। এ আঘাতকে মোকাবেলা করতে গ্রামের সকলে এবং হিতাকাঙ্খীরা বাকি মিয়ার জৈষ্ঠ্য পূত্র আশ্রাফুল আলম শিমুলকে নিয়ে এগিয়ে যায়। প্রথমে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। শিমুল মিয়া গ্রাম ও বংশের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবেন কিনা তা ভবিষ্যতই হয়তো নির্ধারন করবে। জনাব অলিউল হক খান যাকে আমি মোক্তার ভাই বলে সম্মোধন করে থাকি তার লেখায় নির্বাচিত মুকসুদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম শিমুলের কাছে উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নের যে আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিলেন তা শুধু তার একার নয়; অনেকেরই। উপজেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূর্নীতির যে চিত্র স্বল্প পরিসরে বলার চেষ্টা করেছেন এবং তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে যে পরামর্শ দিয়েছেন তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জোটবদ্ধ রাজনৈতিক কোন দলের সদস্য না হয়ে এককভাবে নির্বাচিত হয়ে শিমুল মিয়া কাঙ্খীত চাহিদা পূরণ করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে বৈকি। বিশেষ করে শিমুল মিয়াকে নির্বাচিত করায় সরকারি দলের ন্থানীয় উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের প্রকাশ্যে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা গেছে। ইংগিতটা এমন যে শিমুলকে নির্বাচিত করে ভোটাররা শুধু ভুলই করেনি অপরাধও করেছে। আর সে ভূলের মাশুল শিমুলসহ অনেককেই দিতে হবে। অপরাধ না নিতে অনুরোধ করে মোক্তার ভাইকে বলতে চাই, উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন সরকারি দলের নেতারা শিমুলের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াবেন, ডুবে যাওয়া মুকসুদপুরের দূর্নীতির জাল তখনই ছিড়বে যখন সরকারি দলের স্থানীয় প্রধান নেতারা কলুসমুক্ত হয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসবেন।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী