বৃহস্পতিবার, জুলাই ৮, ২০২১

অনন্ত আকাশে মহাতারকা

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

অনন্ত আকাশে মহাতারকা

৭ জুলাই বুধবার সকালে বলিউড সিনেমার সিংহপুরুষ দিলীপ কুমার চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার অভিনীত চলচ্চিত্র কয়েক প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গী। আপন সৃষ্টিকর্ম তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। ‘দিলীপ কুমার’ নামটি বলিউডের ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে চিরদিনের জন্য লেখা থাকবে। বরেণ্য এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি তারকাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি …

আসাদুজ্জামান নূর


১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হলো। তখন থেকেই এ দেশে ভারতীয় ছবি আসা বন্ধ হয়ে গেল। এরপরও ভারতীয় ছবির প্রতি যে আকর্ষণ তা দমিয়ে রাখতে পারেনি কেউ। এই আকর্ষণের মূলে ছিলেন একজন অভিনেতা, তিনি দিলীপ কুমার। কারমাইকেল কলেজে পড়ার সময় এবং তারও আগে ও পরে হলে গিয়ে তার অনেক ছবি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ‘দাগ’, ‘সাংদিল’, ‘আন’, ‘দেবদাস’, ‘মুঘল-ই-আজম’, ‘গঙ্গা-যমুনা’, ‘মধুমতী’, ‘মুসাফির’, ‘আন্দাজ’, ‘আরজু’সহ আরও কত যে ছবি দেখেছি, তার হিসাব কষা মুশকিল। সিনেমা হলে ভারতীয় ছবি প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভিসিআর এবং পরবর্তী সময়ে ডিভিডি, টেলিভিশন- নানা মাধ্যমে ছবি দেখেছি। এখনও সুযোগ পেলে দেখি। আসলে দিলীপ কুমারের যে অনবদ্য অভিনয়, তা দর্শকমাত্রই মনোযোগ কেড়ে নেয়। দিলীপ কুমার সেই শিল্পী, যিনি বলিউড ছবিতে আধুনিক অভিনয়শৈলীর প্রবর্তন করেছিলেন। তার আগের অভিনয়শিল্পীদের অতি নাটকীয় অভিনয় সমর্থন করেননি। যেজন্য নিজের মতো করে আধুনিক অভিনয়ের ধারার সূচনা করেছিলেন দিলীপ কুমার। সে কারণেই তার অভিনয় অন্য সবার চেয়ে আলাদা মনে হতো। শুধু তাই নয়, পর্দায় চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরার বিষয়ে তার যে চেষ্টা- সেটা মুগ্ধ করেছে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত সবাইকে। এমনকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তার আধুনিক অভিনয়শৈলীকেই বেছে নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে অনেকে অভিনয়ের আধুনিক ধারাকে আরও শানিত করার চেষ্টা করেছেন, একই সঙ্গে চেষ্টা করেছেন অভিনয়ে আরও বৈচিত্র্য নিয়ে আসার। তাদের কেউই দিলীপ কুমারকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। সে কারণেই অভিনেতা হিসেবে দিলীপ কুমার হয়ে উঠেছেন তার কালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।

শুধু পর্দায় নয়, পর্দার বাইরেও দিলীপ কুমারকে কাছে থেকে দেখার যে ইচ্ছা ছিল, তা অপূরণীয় থাকেনি।


ববিতা

চলচ্চিত্র জগতের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের অবসান হলো। জীবনমঞ্চ থেকে চিরবিদায় নিলেন বলিউডের ‘ট্র্যাজেডি কিং’ দিলীপ কুমার। গতকাল সকালে এ খবরটি শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। তার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ চলচ্চিত্র জগৎ। ছোটবেলা থেকে তার অভিনয়ের ভক্ত ছিলাম। যখন যশোরে থাকতাম তখন বড় বোন সুচন্দা আপার সঙ্গে সিনেমা হলে তার অভিনীত অসংখ্য ছবি দেখেছি। ‘জোয়ারভাটা’, ‘গঙ্গা-যমুনা’, ‘মধুমতী’ ছবিগুলো দেখা হয়েছে অসংখ্যবার। প্রিয় অভিনেতা নেই ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি ছিলেন বহু অভিনেতার ‘শিক্ষাগুরু’। পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ খান। সেই কিশোর বয়সে, মুম্বাই থেকে পুনেতে পাড়ি দিলেন কাজের খোঁজে। কয়েক বছর পর আবার মুম্বাই ফিরে বাবার ফলের ব্যবসায় যুক্ত হন। তখন পরিচয় হয় প্রখ্যাত সাইকোলজিস্ট ডা. মাসানির সঙ্গে। তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন বোম্বে টকিজের মালিকের সঙ্গে। সেই থেকেই ঘুরে গেল জীবনের মোড়। বদলে দিলেন নিজের নাম। ইউসুফ খান থেকে হয়ে উঠলেন দিলীপ কুমার। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নাম বদলে পা রাখেন বলিউডে। উপহার দেন অসংখ্য ব্যবসা সফল ছবি। তার অভিনয়ে তৈরি হলো এক আলাদা আঙ্গিক। একসময় অভিনয় থেকে সরে এলেও তার আঙ্গিককে অনুকরণ করে বিখ্যাত হয়েছেন বলিউডের বহু অভিনেতা। বলিউডের একাধিক ছবি, যা তৎকালীন সময়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে, তাতেই নায়ক হিসেবে দেখা দিতেন দিলীপ কুমার। সুদর্শন বলে শুধু রোমান্টিক চরিত্রে নয়, চলচ্চিত্রের উঠোনে অভিনয়ের বিভিন্ন ঘরানায় তাকে দেখা গেছে। সেভাবেই ছড়িয়েছে সুনাম। দিলীপ কুমার তার অভিনীত চরিত্রগুলো সূক্ষ্ণভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন। কোনো কোনো সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব হয়ে যেতেন, সেটাও দর্শকের ওপর গভীর ছাপ রেখে যেত। নিচু স্বরে দৃঢ়তার সঙ্গে সংলাপ বলতেন, যা ভালো লাগত।

মামুনুর রশীদ

কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমারে অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। একসময় বম্বের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয়ে আধুনিকতা এনেছিলেন তিনি। শুধু আধুনিকতা দিয়ে ওই বাণিজ্যিক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তার অসাধারণ অভিনয় দিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রির গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। পাকিস্তানের পেশোয়ারে তার জন্ম হলেও সেখানে থাকেননি। বম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি যখন ঢাকায় এসেছিলেন তখন তার সঙ্গে অনেক অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছি। ওই আড্ডায় তার নাম নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, দিলীপ কুমার হলো ‘আত্মা’ আর ‘ইউসুফ খান’ হচ্ছে তার ছায়া।

তিনি অনেক ভাষা জানতেন। ইংরেজি, উর্দু, ফারসিসহ বহু ভাষার পাশাপাশি বাংলাও ভালো বুঝতেন। ‘দেবদাস’-এ তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারাবিশ্বে সুঅভিনেতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। তিনি মুঘল-ই-আজম, গঙ্গা-যমুনা, মধুমতীসহ অসংখ্য ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন, যা ভোলার নয়। যুদ্ধের আগে মফস্বল শহরে বম্বের সব ছবি মুক্তি পেত। পুরান ঢাকার সদরঘাটের ‘রূপমহল’, ‘নিশাত’, টাঙ্গাইলেও অনেক সিনেমা হলে তার ছবি দেখেছি। ছবি দেখার পাশাপাশি তার অভিনয়ের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতাম। দিলীপ কুমার স্বাভাবিক অভিনয়ের রীতি সৃষ্টি করেছিলেন। অভিনয়কে তিনি আভিজাত্য ও গৌরব দিয়েছেন। সেই একজন গৌরবময় মানুষের ইতি হলো। যদিও তিনি দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন। যেজন্য জীবনকে অভিনয়ের জন্য কাজে লাগাতে পেরেছেন। শুধু একজন গুণী অভিনেতাই নন, ব্যক্তি দিলীপ কুমার বেশ দিলখোলা মানুষ। যে কোনো আড্ডায় হো হো করে হাসতেন। তিনি যখন বক্তৃতা করতেন সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। বেশিরভাগ সময়ই ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন। প্রাণবন্ত মানুষটির পাঠাভ্যাস ছিল। বম্বেতে একটি বড় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমার মনে হয় এত বড় লাইব্রেরি কোনো ব্যক্তির নেই।

Posted ১২:০০ পিএম | বৃহস্পতিবার, ০৮ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement