শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

‘অল্প বয়সী’ অনেকে কাজ করত হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায়

ডেস্ক রিপোর্ট   |   শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

‘অল্প বয়সী’ অনেকে কাজ করত হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায়

লাবণ্য আক্তারের বয়স ১৪। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের দক্ষিণ শ্রীপুরে। চেংমারি হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। গ্রামে খালার বাড়িতে বড় হচ্ছিল সে। বাবা-মা ও পাঁচ ভাইবোন থাকতেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। করোনাকালে বাবার রুটিরুজিতে টান পড়লে লাবণ্যও চলে আসে এখানে। স্কুল বন্ধ থাকায় মাস দেড়েক আগে সে চাকরি নেয় হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায়। বৃহস্পতিবার রাতে আগুন লাগার সময় সে কারখানাতেই ছিল। এখন আর তার খোঁজ মিলছে না।

শুক্রবার সন্ধ্যায় লাবণ্যের বাবা মন্টু মিয়া ও মা জোসনা বেগমের সঙ্গে দেখা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে। জোসনা বেগম বলেন, ‘ফোনে মাইয়া কইল, মা আমার সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। খুব কষ্ট হাইতাছে। আমারে মাফ কইরা দিও।’ ফোন পেয়েইে মা-বাবা ছুটে যান কারখানার সামনে। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখার সামনে তারা অসহায় ছিলেন। সারাটা রাত আগুন জ্বলতে দেখেছেন। সকালে একে একে লাশ নিয়ে আসা হলো। কিন্তু লাবণ্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি।


শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এখনও মেয়ের আশায় মর্গের সামনে বসে ছিলেন তারা। জোসনা বেগম বলেন, করোনাকালে সংসারে চরম অভাব দেখা দেয়। এক বেলা খেলে দুই বেলা অভুক্ত থাকতে হতো। বাধ্য হয়ে ছোট্ট মেয়েকে কাজে দিয়েছি। বৃহস্পতিবার রাতে শিফটে ডিউটি ছিল। দুপুরে মুরগি দিয়ে ভাত খেয়েছে। মাংসটা খুব ভালো লেগেছিল। বিকেলে সে আবার ভাত খেতে চেয়েছিল। কিন্তু অভাবের সংসার। মেয়েকে বিকেলে আর ভাত খেতে দেননি মা। কে জানত, মেয়ে আর কোনো দিনই ভাত খাওয়ার আবদার করবে না মায়ের কাছে।

ভোলার চরফ্যাসনের হাসনাইন পড়শোনা করত চতুর্থ শ্রেণিতে। গত ঈদুল ফিতরের পর পাঁচ হাজার টাকা বেতনে হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় চাকরি নেয়। আগুনের ঘটনার পর থেকে এখন তার নাম নিখোঁজের তালিকায়। মৌলভীবাজারের চাঁনপুর এলাকার ১৪ বছরের শিশু কম্পা রানী বর্ম পড়াশোনা করত পঞ্চম শ্রেণিতে। আগুনের ঘটনার আট দিন আগে কাজ নিয়েছিল হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায়। মেয়ের খোঁজে বাবা প্রভার চন্দ্র দাস ও মা সুমা রানী বর্ম মর্গের সামনে আহাজারি করছেন।


সংসারে অভাব থাকলেও ছোট্ট মেয়ে শান্তা মনিকে (১৪) কাজে দিতে রাজি ছিলেন না মা সীমা আক্তার। করোনাকালে সংসারে অভাবের তাড়নায় আর না করতে পারেননি। গত বৃহস্পতিবার ছিল তার কাজের দ্বিতীয় দিন। কিন্তু সেই মেয়ে এখন বেঁচে আছে কিনা, জানতে পারছেন না মা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন সীমা আক্তার। জানান, শান্তা মনির যখন আট বছর, তখন তার বাবা জাকির হোসেন মারা যান। এরপর থেকে তিন ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। ছেলেরা বিভিন্ন কারখানায় এবং নিজে তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। কান্না করতে করতে সীমা বলেন, ‘বাবামরা মেয়ে আমার। সকালে ভাত খেয়েও আসেনি।’

এভাবে ছোট্ট কচি শিশুর স্বজনদের আর্তনাদ শোনা গেল ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকাজুড়ে। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে অন্তত ১৭ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের বয়স ১৪-১৬ বছরের মধ্যে ছিল। তারা জানান, ‘অল্প বয়সী’ অনেকে এখানে কাজ করে।

মর্গের সামনে দেখা হয় ২৫ বছর বয়সী আলাউদ্দিন নামে হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানার এক কর্মীর সঙ্গে। যখন আগুন লাগে, তিনি তখন কাজে ছিলেন না। তিনি বলেন, হাসেম ফুডস কারখানায় সেজান জুস, চানাচুর, সেমাই, চকলেটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হতো। কম বয়সী কয়েকশ কিশোর-কিশোরী ছিল কারখানার কর্মীদের মধ্যে।

কম বয়সীদের এভাবে কারখানায় কাজ করানোর বিষয়ে হাসেম ফুডসের মূল কোম্পানি সজীব গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন বলেন, কম বয়সী যারা আছে, কাজ নেওয়ার সময় তারা বয়স আঠারোই বলেছে। ওরা আমাদের কাছে যে ডকুমেন্টস দিয়েছে, সেখানে ১৮ বছর পূর্ণ রয়েছে।

Facebook Comments Box

Posted ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১০ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০