• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    অসুস্থ নজরুলকে নিয়ে ক্ষমতাবানদের ‘চিকিৎসা চিকিৎসা’ খেলা

    হাবিব মোস্তফা | ২৬ আগস্ট ২০১৭ | ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

    অসুস্থ নজরুলকে নিয়ে ক্ষমতাবানদের ‘চিকিৎসা চিকিৎসা’ খেলা

    কাজী নজরুল ইসলাম অকস্মাৎ বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। ১৯৪২ সালের ১৭ জুলাই কবির শাশুড়ি গিরীবালা দেবীর চিঠির ভাষ্য: “নজরুলের জিহ্বার আড়ষ্টতা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সকাল থেকেই তিনি উত্তেজিত এবং বেশ জোরেশোরে চেঁচিয়ে ক্রোধের সঙ্গে কথা বলছেন। তবে তার সব কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।”
    গিরীবালা দেবীর চিঠি পেয়ে চুরুলিয়া থেকে নজরুলের বড় ভাই ও ছোট ভাই সাহেব জান ও কাজী আলী হোসেন চলে এলেন। তারা গিরীবালা দেবীকে বললেন- ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে দিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব কিনা।
    অসুখের শুরু থেকেই কবির খাওয়া-দাওয়ায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ঠিক উন্মাদের মতো তাড়াহুড়া করে, আবার কখনও বামহাতে তিনি খাবার মুখে দিতেন। তার শাশুড়ি গিরীবালা দেবী মাছের কাঁটা বেছে না দিলে কাঁটা ছাড়িয়ে খাওয়ার বুদ্ধিও তার লোপ পেয়েছিল। সে দৃশ্য বড়ই করুণ। তবে অসুখের মধ্যেও তার খাওয়ার রুচি হ্রাস পায়নি। বেশ খেতে পারতেন। কিছুদিন পর কবির আবার এক নতুন উপসর্গ দেখা দিল। কোনো কোনো দিন অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়তে লাগলেন এবং অশ্রাব্য গালাগাল করতে শুরু করলেন। ক্রমে এমন অবস্থা দাঁড়াল, পাগলামির জন্য তাকে বাড়িতে রাখা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে উঠল। সে সময় তার কামরায় কারও যাওয়ার সাহস হতো না। কবির কনিষ্ঠ সহোদর কাজী আলী হোসেন তখন এখানে দিনকয়েক ছিলেন। তিনি কবির চেয়েও বলিষ্ঠ চেহারার শক্তিমান পুরুষ। অধিকাংশ সময় তিনি কবিকে কলতলায় নিয়ে গা ধুয়ে কাপড় বদলিয়ে দিতেন এবং কবির মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে সভ্যভব্য করে তুলতেন। এ সময় কবির সামনে খাবার দিলে কখনও তিনি খেয়েছেন, আবার কখনও ভাত-তরকারি হাত দিয়ে চটকিয়ে মেঝের ওপর লেপে দিয়েছেন। অনেক সময় চটকানো হাত মাথায় ঘষেছেন। কী নিদারুণ দৃশ্য! এ দৃশ্য দেখে প্রিয়জনদের দুচোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে।
    শেরেবাংলা একে ফজলুল হক নজরুলের অসুস্থতার খবর শুনে টেলিফোনে ডক্টর শ্যামা প্রসাদকে (তৎকালীন অর্থমন্ত্রী) বললেন,
    : শ্যামা প্রসাদ, কবি নজরুল ইসলাম অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি যতটুকু শুনলাম, তাতে প্যারালাইসিস বলেই মনে হচ্ছে। ডা. বিধানকে দেখানোর জন্য আমাকে এসে ধরেছে। বিধান রায়কে দিয়ে নজরুলকে দেখানোর ব্যবস্থা তুমি করে দাও।
    নজরুলের অসুস্থতার সব ঘটনা ডক্টর মুখার্জি শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন-
    : কবি নজরুলের আর্থিক ব্যবস্থা হচ্ছে না কেন? কবির আর্থিক অবস্থা কেমন?
    গিরীবালা দেবী বললেন-
    : আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। দেনায় ডুবে রয়েছেন।
    তমিজ উদ্দিন তখন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষামন্ত্রী। তার কাছে গেলে শফিকুল ইসলাম (তখন তিনি ছাত্র) বলে উঠলেন-
    : নজরুল ইসলামের অসুখ, তো এখানে কেন? তমিজ উদ্দিন সাহেব কী করবেন? হক সাহেবের কাছে গেলে ভালো হয় না? মুসলিম সমাজের স্বার্থের বিরুদ্ধে যে নবযুগে লিখছে, সেই কবিকে মুসলমান কেন সাহায্য করতে যাবে? একজন মুসলমান হিসেবে এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, কবি নজরুল ইসলাম বর্তমানে মুসলিম স্বার্থবিরোধী লোক।
    হক সাহেবের কাছে গেলে হক সাহেব সব শুনে বললেন-
    : নজরুলকে রাঁচি পাঠিয়ে দাও। পাগলের জন্য রাঁচিতে গভর্মেন্ট সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখে দিয়েছে। বাড়িতে রেখে কি পাগলের কোনো চিকিৎসা করা যায়?


    নজরুলের চিকিৎসার জন্য ডক্টর শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি, শ্রীযুক্ত সজনীকান্ত দাস, জুলফিকার হায়দার, সৈয়দ বদরুদ্দোজা, স্যার এএফ রহমান, শ্রীযুক্ত তারা শংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ন কবির, কবিরাজ বিমলা নন্দ তর্কতীর্থ, শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, শ্রীযুক্ত তুষারকান্তি ঘোষ, শ্রীযুক্ত চপলাকান্ত ভট্টাচার্য ও শ্রীযুক্ত গোপাল হালদারকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হল। নজরুল ফান্ড উৎসাহের সঙ্গেই বেশ কিছুদিন টাকা সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু মাত্র ২০০ টাকা করে তিন মাসে মোট ৬০০ টাকা তারা কবিপত্মীকে দিয়েছিলেন। এর পর আর কোনো টাকা পাওয়া যায়নি। কবির আর্থিক দুরবস্থা আরও চরমে উঠেছিল। আর তারই সুযোগ নিয়ে কলকাতা শহরে এবং মফস্বল অঞ্চলেও টাকা রোজগারের ফন্দি-ফিকির হিসেবে একে অন্যের সঙ্গে যেন প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছিল। কবির নামে নানা রকম ভুয়া ফান্ড, সমিতি ও লটারি খেলা পর্যন্ত শুরু হয়ে গেল।
    পীড়িত কবিকে সাহায্য করতে গিয়ে আশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য মানুষ ও মানুষের চরিত্র বোঝা গেছে স্বার্থ ও অর্থ কী সাংঘাতিক জিনিস! এরপর অর্থের অভাবে নিজ দেশে নজরুল আর ভালো করে তার চিকিৎসা করাতে পারেননি। অদৃষ্টের এ এক নির্মম পরিহাস!

    ajkerograbani.com

    শিকলভাঙ্গার কবি যখন অসুস্থ, তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনজন মুসলমান। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন। এরা কেউ তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি, তার জন্য একটা পয়সা খরচ করেননি। এই মহৎপ্রাণ কবি জীবদ্দশায় প্রতারিত হয়েছেন বন্ধু-বান্ধব দ্বারা, পরে অবহেলিত হয়েছেন পুস্তক প্রকাশক দ্বারা। কবির ব্যক্তিগত বন্ধু-বান্ধবদের কাউকেই সেই দুর্দিনে কাছে পাওয়া যায়নি। ১৯৩২ থেকে ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ ১০টি বছর কবির জীবনে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এ সময় তার জীবনে যে উত্থান-পতন সংঘটিত হয়, তা খুবই বেদনাদায়ক। বেশ জাঁকজমক ও সাড়ম্বরে কবির সংসার চলছিল। কিন্তু সে মাত্র কয়েকদিন। দেখতে দেখতে অবিশ্বাস্যভাবে কর্পূরের মতো সব কিছু মিলিয়ে গেল।
    কেন এমন হল? ইতিহাস বলে, নজরুল ইসলাম মানুষ হিসেবে যেমন ছিলেন প্রাণবান ও উচ্ছল, তেমনি বৈষয়িক বুদ্ধিতে ছিলেন একেবারেই অপরিপক্ব ও বেহিসেবী। এ রকম বেহিসেবী মানুষ আমাদের সাহিত্য ক্ষেত্রে দ্বিতীয় আর একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

    নজরুলের অসুস্থ জীবনের গোড়ার কথা সম্পর্কে ড. অশোক বাগচী যে কথাগুলো বলেছেন, তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ড. বাগচী বলেন-
    : নজরুলের অসুস্থতার লক্ষণ যখন প্রথম প্রকাশ পায়, তখন বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বিশেষ করে তার স্ত্রী প্রমিলা নজরুল যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন (১৯৩৯ খ্রি.), তারপর দেখা যায় নজরুল হঠাৎ কালী সাধনা শুরু করেছেন। অনেকেই এটাকে ধরে নেন তার মানসিক বৈকল্য হিসেবে। গেরুয়া পোশাক আর মাথায় গেরুয়া টুপি ছিল তার তখনকার পরিধেয় বস্ত্র। সে সময় তিনি মাঝে মাঝে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান গাওয়ার সময় একটু-আধটু বেসুরো হতে থাকেন। কিন্তু পুরোপুরি অসুস্থ হওয়ার পর (১৯৪২ খ্রি.) তিনি সবকিছুর বাইরে চলে যান।
    আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরো সার্জন ড. অশোক কুমার বাগচী ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চিকিৎসার জন্য কবিকে ভিয়েনায় নিয়ে যান। নজরুলের মস্তিষ্কের প্রথম আধুনিক পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে তার উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনার যে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকরা যৌথভাবে নজরুলের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ভিয়েনার বিখ্যাত নিউরো লজিস্ট স্যার রাশেল ব্রেইন, নিউরো সার্জন ড. ওয়েলি ম্যাকিসক এবং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. উইলিয়াম সার্জেন্ট। ড. অশোক বাগচীও ছিলেন যৌথভাবে তাদের সঙ্গে। ওই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে নজরুলের ব্যাধি মানসিক বৈকল্য নয়।
    ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই নজরুল প্রথম বাকশক্তি হারান। এরপর থেকে তার যত রকমের চিকিৎসা করা হয়েছে, সব চিকিৎসা ছিল ভুল ও ব্যর্থ। একমাত্র ডা. বিধান চন্দ্র রায়ই আশংকা করেছিলেন নজরুল স্নায়ুবিক বৈকল্যে আক্রান্ত হয়েছেন, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে আলঝেইমার্স। কিন্তু নজরুলের জন্য সে সময় গঠিত মেডিকেল বোর্ড ডা. বিধান চন্দ্রের সুপারিশ কোনোক্রমেই গ্রহণ করেননি।
    ড. অশোক বাগচীর মতে, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের মধ্যে যখন প্রাথমিকভাবে এ রোগের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তখনই যদি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো, তবে নজরুলের সম্ভবত এ করুণ পরিণতি হতো না।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4755