• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    আনন্দের নববর্ষ, প্রতিবাদের নববর্ষ

    অনলাইন ডেস্ক | ১৪ এপ্রিল ২০১৭ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

    আনন্দের নববর্ষ, প্রতিবাদের নববর্ষ

    আবার সূচনা হলো নতুন বাংলা বছরের। মৌলবাদী উগ্রপন্থীদের নানা তৎপরতায় শঙ্কা ও উদ্বেগের যে ছায়া ঘনিয়ে উঠেছিল, তাকে উড়িয়ে দিতে আয়োজকেরা এবার সংকল্পবদ্ধ। আরও আনন্দ ও উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করার প্রত্যয় নিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে এবারের বৈশাখী উৎসব। অন্যদিকে চট্টগ্রামে চারুকলা অনুষদের শিল্পীদের আঁকা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী দেয়ালচিত্র মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কালি দিয়ে। মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বৈশাখী অনুষ্ঠানকে ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়ে হেফাজতে ইসলাম এগুলোকে বলেছে বর্জনের কথা। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ কারণে অনুষ্ঠান সংকুচিত করার চাপ তৈরি হয়েছে। আর তাই সারা দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা নববর্ষের উৎসব উদ্যাপন করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রতিবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। কঠোর নিরাপত্তার ভেতরেও ১৪২৪ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানাতে সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহে উদ্যাপিত হচ্ছে বর্ষবরণের উৎসব।
    সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পয়লা বৈশাখের উৎসব অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে উদ্যাপিত হবে। তবে তার সঙ্গে এবার যুক্ত হবে উগ্র, অসহিষ্ণু, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ওই অপশক্তিকে রুখে দেওয়ার জন্য আমরা সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং আরও বেশি সংখ্যায় বৈশাখী উৎসবে অংশ নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।’
    ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিকেল পাঁচটার মধ্যে উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরুর পর আর কেউ এর ভেতরে যেতে পারবে না। বড় মুখোশ পরা বা ব্যাগ বহন করা যাবে না।
    উগ্রবাদীদের হুমকির কারণে নববর্ষ বরণের উৎসব আয়োজনে এবার রয়েছে বাড়তি উৎসাহ। চট্টগ্রামে গত মঙ্গলবার রাতে দেয়ালচিত্রে কালিমা লেপনের পরদিনই শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা নতুন উৎসাহে আবার সেখানে ছবি এঁকেছেন। ঢাকায় ছায়ানট, উদীচী ও ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর পাশাপাশি আরও বহু সংগঠন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়েছে।
    রমনার বটমূলে ২০০১ সালে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে জঙ্গিরা বোমা হামলা করেও অনুষ্ঠান বন্ধ করতে পারেনি। ছায়ানটের সহসভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জঙ্গিদের উত্থানে আমরা উদ্বিগ্ন। তবু স্পষ্টভাবে বলতে চাই, পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানের সঙ্গে ধর্মের কোনো বিরোধ নেই। এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসব। কোনো অপশক্তির কাছে আমরা পরাজয় মানব না। যে চেতনা নিয়ে ছায়ানটের সূচনা হয়েছিল, তাদের বাঙালি সংস্কৃতির সেই চর্চা অব্যাহত থাকবে।’
    গণসংগীতশিল্পী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, ‘ছায়ানটের অনুষ্ঠানের অর্ধশত বছরের পাশাপাশি শিশুপার্কের নারকেলবীথি চত্বরে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী ৩৪ বছর ধরে লোক ও গণসংগীতের অনুষ্ঠান করছে। ১৯৮৯ সালে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান নিয়ে পথে নেমেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। বছরের প্রথম দিনে এসব অনুষ্ঠান নিছক গানবাজনা নয়। এর লক্ষ্য কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তার বোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্গঠন। এবারের পয়লা বৈশাখের উৎসব হচ্ছে এই প্রতিবাদী চেতনার নতুন তাৎপর্যে।’
    ভারত ভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপর আঘাত হানে। তখন রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আগলে রাখার আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। গত পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন, পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানগুলো জাতীয় জীবনে অভূতপূর্ব তাৎপর্য যোগ করে। এসব সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাঙালির জাতিচেতনা বিকশিত করে মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।
    ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক প্রথমবারের মতো পয়লা বৈশাখে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। সে বছর পূর্ব বাংলায় বিপুল উৎসাহে বৈশাখী উৎসব উদ্যাপিত হয়। তবে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেন। বৈশাখী উৎসব উদ্যাপনে তাতে বিপুল জোয়ার জাগে। ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে শুরু হয় বর্ষবরণ উপলক্ষে ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের এবার অর্ধশত বছর পূর্ণ হচ্ছে। ভোরের আলো ফোটার পরপরই ছায়ানটের নবীন-প্রবীণ শতাধিক শিল্পীর কণ্ঠে গীত হবে রবীন্দ্রনাথের গান ‘আলোকের এই ঝর্নাধারায় ধুইয়ে দাও…।’ সূচনা হবে নববর্ষের দিনভর আনন্দঘন উৎসবের। এ ছাড়া সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিচালনায় সুরের ধারার শিল্পীদের হাজার কণ্ঠে থাকছে বর্ষবরণের গানের অনুষ্ঠান। সকাল সাড়ে সাতটায় শিশুপার্কের নারকেলবীথি চত্বরে হবে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর লোক ও গণসংগীতের অনুষ্ঠান। সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের আয়োজনে নববর্ষের বিশেষ আকর্ষণ বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা নামবে পথে।
    এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সালে জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচার ও অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবার বিপুল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। গত বছর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অর্জনের সাফল্য উদ্যাপনের জন্য এবার সারা দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি আজ পুরো রাজধানীই মেতে উঠবে বৈশাখী উৎসবে। রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকবে বিভিন্ন সংগঠনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমির মাঠে শুরু হবে লোক ও কারুশিল্প সামগ্রীর সম্ভার নিয়ে বৈশাখী মেলা। বরাবরের মতোই উৎসবে মেতে উঠবে নগরবাসী।


    Facebook Comments


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    webnewsdesign.com

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4669