• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    আবার সেই ভোলার বোরহানউদ্দিন

    শেখ কনক | ২১ অক্টোবর ২০১৯ | ১০:১৯ অপরাহ্ণ

    আবার সেই ভোলার বোরহানউদ্দিন

    স্মৃতি যদি খুব বেশি প্রতারনা না করে তাহলে আপনাদের নিশ্চই মনে থাকবার কথা ১৯৯০,৯১ এবং বিশেষ করে ২০০১ সালের কথা। বিএনপি জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ভোলার এই বোরহান উদ্দিনেই হিন্দুদের উপর সে সময়ে যে নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছিল তাকে অনেকেই সে সময় দাঙ্গা বললেও আসলে তা ছিলো পরিকল্পিত ভাবে ভোলার হিন্দুদের উপর ঘটানো মানবতাবিরোধী অপরাধ। ধর্ষণ, গনধর্ষণ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, নৃশংস হত্যা হেন কোন অপরাধ নেই ধর্ম রক্ষার জিকির তুলে যা সেই সময় করা হয়নি।

    একই ঘটনা একই রুপে ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল গতকাল ২০ অক্টোবর ২০১৯ সেই ভোলার বোরহানউদ্দিনেই। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে, বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক ব্যক্তির আইডি থেকে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে মর্মে এলাকায় মাইকিং করে ‘ তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটিয়ে, একজন মৌলানাকে গ্রেফতার করা হয়েছে মর্মে গুজব রটিয়ে সংঘর্ষের সুত্রপাত করেন। বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের যে ব্যক্তির আইডি থেকে এটা করা হয়েছে বলে প্রচার করা হয় সেই শুভ গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর বোরহানউদ্দিন থানায় হাজির হয়ে তার আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে একটি জিডি করেন। পুলিশ শুভকে থানায় তাদের হেফাজতে রেখে বিষয়টি তদন্ত করেন এবং আইডি হ্যাকের সত্যতাও পান। যারা শুভর আইডি হ্যাক করে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) নামে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যটি স্ক্রিনশটের মাধ্যমে প্রচার করছিলেন শরীফ ও ইমন নামে তাদের দু’জনকে পুলিশ আটকও করে। দফায় দফায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সাথে বৈঠক করে তাদের কোনরূপ সংঘর্ষে জড়িত না হতে অনুরোধও করেন। বিক্ষোভকারী কতিপয় নেতা পুলিশ কতৃপক্ষকে আস্বস্তও করেন। তারপরও সেখানে তান্ডব ঘটানো হয়েছে, ৪ জন মানুষের প্রানহানী ঘটেছে, মারাত্বক আহত হয়েছে পুলিশ সহ আর অনেকে।


    একটু পিছনফিরে দেখা যাক, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামুতে এক বৌদ্ধ তরুন উত্তম কুমারের ফেসবুক থেকে কোরান ও নবীকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব করার অভিযোগ তুলে ১৯ টি বৌদ্ধ মন্দির এবং ৩০ টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। তদন্ত করে উত্তম কুমার নামে কোন তরুনের খোঁজই পাওয়া যায়নি।
    ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাম্মনবাড়িয়ার নাসির নগরে রসরাজ নামক এক মৎসজীবির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে সংখালঘুদের ঘরবাড়ি, ধর্মীয় উপাসনালয়ে ভাংচুর লুটপাটের ঘটনা তদন্ত করে দেখা যায়, রসরাজ ফেসবুক চালাতে জানেন না। পাসওয়ার্ড কাকে বলে এ নিয়ে তার ধারনা নেই।
    ২০১৭ সালের ১০ তারিখ রংপুরের গঙ্গাচড়ায় একই কায়দায় একই ঘটনা ঘটিয়ে একজনকে খুন এবং হিন্দুদের ঘরবাড়িতে অগ্নি সংযোগ, লুটপাট করা হয়। এই ঘটনায় দেখা যায়, যে টিটু নামের সংখ্যালঘু ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছিল সে টিটু বহু আগেই গঙ্গাচড়া ছেড়ে নারায়ণগন্জে বসবাস করেন এবং পোস্টটি সম্পর্কে টিটু কিছুই জানেন না।

    এই যে ঘটনাগুলো একের পর একটা ঘটছে পাঠক যদি মনে করেন কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার করণেই ধর্মপ্রান মুসলমানেরা এটি ঘটাচ্ছে তাহলে সেটা হবে ভুল। স্বরণ করা যেতে পারে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে হেফাজতের তান্ডবের কথা। ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তির প্রতিবাদে সমাবেশে যখন বিএনপি জামায়াত সমর্থন দিলো তখন তারা সরকার পতনের স্বপ্ন নিয়ে জ্বালাও পোড়াও ভাংচুর শুরু করে এক ভয়ংকর বিভীষিকাময় অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। হাজর হাজার নিহতের গুজব রটিয়ে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল।

    গুজব সাধারণত অশিক্ষিত, অজ্ঞ, অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষে যেমন বিশ্বাস করে তেমনি তাদের ব্যবহার করে সহজেই তাদের মধ্যে প্রয়োগও করা যায়। উক্ত ঘটনা গুলো আমরা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব অধিকাংশ ঘটনায় আধুনিক শিক্ষা বঞ্চিত মাদ্রাসা পড়ুয়া এবং সহজ সরল গ্রামবাসীকে ব্যবহার করা হয়েছে। গুজব রটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের স্বরূপ চিনতে অসুবিধে হওয়ারও কথা নয়। যারা এটি ঘটাচ্ছে তারা সুপরিকল্পিত ভাবে ভেবে চিন্তে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েই এই অপকর্মটি করে যাচ্ছে।

    সাম্প্রদায়িকতার বিষে বিষাক্ত মানুষরুপি এই সব নরপিশাচরা কেবল যে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক তাই নয়, এরা বর্বর, অসভ্য, মিথ্যেবাদী, খুনি। তাদের লক্ষ্যও পরিস্কার। একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে ভয় ও আতংক সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের বাড়ি ঘর লুট করা, মা বোনদের ধর্ষণ করা, হত্যা করা, দেশ ত্যাগে বাধ্য করা, একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চালানো। তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিনত করা তথা পাকিস্তান আফগানিস্তান মডেলের একটি ব্যার্থ রাষ্ট্রে পরিনত করা।
    আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি, অতিতের রামুর ঘটনায় ১৯ টি, নাসির নগরের ঘটনায় ৮ টি এবং গঙ্গাচড়ার ঘটনায় দুটি মামলা হলেও এযাবত কেবল নাসির নগরের একটি মামলায় অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য সকল মামলারই তদন্ত চলছে। বোরহানউদ্দিনের ঘটনায়ও হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা হয়েছে। প্রচলিত আইনে এ সকল মামলার বিচার করতে কত বছর লাগবে তার যেমন কোন নিশ্চয়তা নেই তেমনি এরই মধ্যে আরেকটি রামু, নাসির নগর, গঙ্গাচড়া কিংবা বোরহান উদ্দিন যে হবে না তারও নিশ্চয়তা নেই। হাজার হাজার আসামিকে বিচারের আওতায় আনার কঠিন কাজটি না করে ধ্রুত এ সকল ঘটনার পিছনের কারিগরদের চিহ্নিত করে বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলা বর্বর, ভয়ংকর মৌলবাদীদের কাছে ১৯৬৯ সালেই যখন পরাজিত হয়নি তখন স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরর ওদের সমূলে নির্মূল করেই স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালন করার শপথ নিতে হবে প্রতিটি সোনার বাংলার বাঙালির। এটাই এখন সময়ের দাবি।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী