বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২০

আমরা কি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উপযোগী?

এম তুহিনুজ্জামান তুহিন   |   বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০ | প্রিন্ট  

আমরা কি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের উপযোগী?

বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে।
এরপর ক্রমাগত বাড়তে থাকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। ফলে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য বন্ধ করা হয় সকল অফিস আদালত ও যানবাহন চলাচল। বন্ধ করা হয় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত ধাপে ধাপে ছুটি বাড়িয়ে বন্ধই আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এসময় শিক্ষার্থীরা যেন সেশনজটে না পড়ে এমন এমন যুক্তি সামনে এনে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এই নির্দেশের জন্য ওতপেতে বসে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে অনলাইন ক্লাস নেয়া শুরু করে। সাথে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ডিপার্টমেন্টও অনলাইন ক্লাস শুরু করে এবং কেউবা শুরু করার কথা ভাবছেন।
এখন কথা হলো, বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুকরণ করার কথা কথা ভাবছেন ভালো কথা,এর জন্য আপনাদের বাহবা দেওয়া উচিৎ। কিন্তু আপনাদের এটাও মাথা রাখতে হবে সে-সকল দেশের সুযোগ সুবিধা ও শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে বাংলাদেশের বড় পার্থক্য রয়েছে,রয়েছে অনেক সমস্যা।চলুন সমস্যা গুলো একটু আলোচনা করা যাক।
প্রথমত, অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে হলে প্রত্যেকের মানসম্পন্ন স্মার্টফোন থাকা জরুরী।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে মোটামুটি সকলের মানসম্পন্ন স্মার্টফোন থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলের স্মার্টফোন নেই কিংবা থাকলেও তা অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের উপযুক্ত নয়। তাছাড়া তাদের সবার পক্ষে হটাৎ করে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করার জন্য স্মার্টফোন কেনা সম্ভব নয়। কারন তাদের অধিকাংশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। করোনার প্রভাবে আরো খারাপ সময় চলছে তাদের। এখন অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সকল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদেরকে স্মার্টফোন কিনে দিতে হবে।যা আসলেই কষ্টসাধ্য কাজ।
দ্বিতীয়ত, দুর্বল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা হবে অন্যতম বড় সমস্যা। কারন আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। যার ফলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী গ্রাম থেকেই আসে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই ফোর-জি’র যুগেও গ্রামে টু-জি নেটওয়ার্কও পাওয়া ভার। সেখানে অনলাইন ক্লাস তো দূরের কথা,সাধারণভাবে ফোনে কথা বলাও কষ্টসাধ্য। সিম কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না,বাস্তবতা ভিন্ন।
তৃতীয়ত, বৈদ্যুতিক সমস্যা। আমার মনে হয়, এই ঝড়-বৃষ্টির ঋতুতে এটিই হতে পারে অন্যতম বড় সমস্যা।কয়েকদিন আগে ঘুর্ণিঝড় আম্ফানের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে,যার ফলে অনেক অঞ্চলের বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না কয়েকদিন। আর এই মৌসুমে হরহামেশাই হালকা ঝড় হাওয়া বয়ে গেলে দুই দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ এর দেখা মিলে না। তাই অনলাইন ক্লাসে সকলের উপস্থিতিতে ব্যাঘাত ঘটবে।
চতুর্থত, ইন্টারনেট প্যাকেজের গলাকাটা মূল্য।বড় শহরের মতো ছোট শহর কিংবা গ্রামে ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা নেই।সেখানে একমাত্র উপায় বিভিন্ন সিম কোম্পানির ইন্টারনেট প্যাকেজ।সেখানে আবার গ্রামীণফোন সিম ছাড়া অন্য সিম গুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহার করা কঠিন ব্যাপার।তাই গ্রামে থাকলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে ভিড়তে হবে গ্রামীণফোনের কাছে।আর এই গ্রামীণফোনই হলো “গলাকাটা গ্যাং”এর সরদার।চড়া দামে ইন্টারনেট ক্রয় করে নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ অনেকের সাধ্যের বাইরে।তাই অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ইন্টারনেট প্যাকেজের ব্যবস্থা করতে হবে।
এসকল সমস্যা ছাড়াও আরো সমস্যা আছে।বাস্তব ক্লাসে শিক্ষক যেভাবে পাঠদান করেন,তা অনলাইনে অনেক শিক্ষকই করতে পারেন না।আবার শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণও হয় কষ্টসাধ্য।কয়েকটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে,অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে ক্লাসে গড়ে ৬০% শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়।তাহলে বড় একটি অংশ ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছে না,যার কারন অমনোযোগীতা নয়।বরং মনোযোগী অনেক শিক্ষার্থী উপরে আলোচিত সমস্যা সমূহের কারনে উপস্থিত হতে পারছে না। আর এই বড় অংশের অনুপস্থিতিকে উপেক্ষা করে শুধু মাত্র দ্রুত সময়ে “সার্টিফিকেট প্রদান” এর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে এই নতুন শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষাকে গলাটিপে হত্যার পায়তারা মাত্র।
এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য সবচেয়ে তোড়জোড় করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো।কারণ তারা কোনো ভাবে সেমিস্টার শেষ করতে পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা দাবি করতে পারবে।আগেও শুনেছি, তারা “শিক্ষা”কে বাণিজ্যে পরিনত করেছে। আজকাল বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি।তারা এমনটাও বলছে,বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম না চালাতে পারলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিবে কিভাবে?আমার প্রশ্ন হলো,এতদিন রমরমা ব্যবসা করেও হটাৎ তারা এতো গরীব কিভাবে হয়,যে ছয়মাস শিক্ষক কর্মচারীদের বেতনই বহন করতে পারবে না! তাদের এই মহামারীর মধ্যে অতি বাণিজ্যিক মানসিকতা থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও বের হয়ে আসতে হবে।
এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসবে,তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী?
আমার মতে,চারদিকে চলছে মৃত্যুর মিছিল,এখন বেঁচে থাকাটাই বড়।আমাদের সকলেরই “এরশাদ ভ্যাকেশন” এর ইতিহাস জানা আছে।সেই সেশনজটও কিন্তু কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও যদি এ করোনা সমস্যার সমাধান না হয়,সেক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের আলাদা শিফটে ভাগ করে আলাদা সময়ে বা আলাদা দিনে ক্লাসের আয়োজন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যেতে পারে।তবে আপাতত অনলাইন ক্লাসের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত না নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখায় উত্তম।মনে রাখতে হবে,দ্রুত সময়ে সার্টিফিকেট অর্জন মানেই “শিক্ষা” অর্জন নয়।
(লেখক, শিক্ষার্থী,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)


Posted ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]