মঙ্গলবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ইসলামে মানবাধিকার

আনিসুর রহমান   |   সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | প্রিন্ট  

ইসলামে মানবাধিকার

’মানবাধিকার’ কথাটা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, এর সঙ্গে আমরা কম-বেশি পরিচিত। মানবাধিকার শব্দটির অর্থ এভাবে দাঁড় করানো যেতে পারে, মানব শব্দের অর্থ মানুষ আর অধিকার অর্থ অধিকার অর্থাৎ মানুষের অধিকার বা মানুষের জন্য যে অধিকার রয়েছে তার সমষ্টিরূপকে আমরা মানবাধিকার বলতে পারি।
বর্তমান বিশ্বে ’Human Rights’ শব্দটি বহুল আলোচিত ও বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। দুর্বল জাতিগুলোর সাথে সবল জাতিগুলোর আচরণ আজকাল মানবাধিকারকে একটি উপহাসের বস্তুতে পরিণত করেছে।

মানুষ মাত্রই তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে, ভোগ করার অধিকার আছে, কথা বলার অধিকার আছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মান্য করে ভ্রমণ করার অধিকার আছে। আমরা যখন দেখি এই অধিকারগুলো বিভিন্ন আইন-কানুন বেড়া বেদি দিয়ে মানুষের বা নাগরিকের অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে, আমরা তখন তাকে বলি মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
আমরা মানবিক জায়গা থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছি, যান্ত্রিক মানুষের পরিণত হচ্ছি। আমরা বর্তমানে দেখি নামধারী কিছু মুসলমানরা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়, ধর্মের নামে। তারা এটাকে জিহাদ বলে চালিয়ে দিতে চায়। ভিন্নধর্মী মানুষদের প্রতি আমাদের ভিন্নরকম চোখ ইদানিং লক্ষ্য করা যায়। এসব থেকে বেরিয়ে এসে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ভিতরে ডুকতে হবে। আমাদের মানবিক হয়ে উঠতে হবে।
মানবাধিকার প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজিদে বার বার বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, নবী মুহাম্মাদ (স.) তাঁর জীবনের পুরো সময়টা মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বিলিয়েছে। তিনি কখন অন্য ধর্মের মানুষকে আঘাত দিয়ে কথা বলেননি। তিনি কখন ভিন্নমতাবলম্বী মানুষকে আঘাত করেননি করার জন্য কাউকে উদ্ভদ্ধ করেননি আমরা যারা তাঁর অনুসারী তাদেরকে তাঁর অনুকরণ করা জরুরী।
মানবাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন: সূরা আম্বিয়া আয়াত ১০৭: ‘ওয়ামা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আল’আমিন’ অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা রাসুল (সা.) কে বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ব জগতের প্রতি কেবল রহমত/ আশির্বাদ রূপে প্রেরণ করেছি।’ তাফসিরে বর্ণিত-রাসুল (সা.) কে আল্লাহ কেবল মুসলিমদের জন্য আশির্বাদ স্বরূপ প্রেরণ করেন নাই, অমুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সমগ্র মানবজাতির জন্য, জ্বীন জাতি, পশু-পাখি, জীব-জন্তু, গাছ-পালা, নদী-নালা, পাহার-পর্বত সকল সৃষ্ট বস্তুর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। বোখারি শরীফে বলা হয়েছে, ‘খায়রুন্নাছে মানয়েনফাউন্নাসে’ অর্থ: যে মানুষের কল্যাণ করে, সেবা করে সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি। এখানে মুসলিম মোত্তাকি বলা হয়নি, মানুষ বলা হয়েছে, মুসলিম, অমুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সব মানুষের সেবার কথা বলা হয়েছে।
মানবাধিকারের প্রধান ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) কর্তৃক মদীনা সনদ ঘোষণার মধ্য দিয়ে। মদীনা সনদকে পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত সংবিধান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এ সনদে মোট ৪৭ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে যেগুলোতে মানবাধিকারের বিষয়গুলো সর্বপ্রথম সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অনুচ্ছেদসমূহ:
১. সনদে স্বাক্ষরকারী সকল সম্প্রদায় একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে এবং সব সম্প্রদায় সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।
২. সব নাগরিক পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
৩. নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।৪. সকল প্রকার রক্তক্ষয়, হত্যা ও ধর্ষণ নিষিদ্ধ।
৫. কোনো লোক ব্যক্তিগত অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তার কারণে অপরাধীর সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না।
৬. দুর্বল ও অসহায়দের সর্বোতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে।
ইসলামে সার্বজনীন মানবাধিকারের বিষয়টি জীবনের সর্বক্ষেত্র ও বিভাগে পরিব্যাপ্ত। ইসলাম মানবজাতিকে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবময় অধিকার ও মর্যাদা প্রদান করেছে। মানুষকে সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের মর্মবাণী শুনিয়ে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, বংশীয় মর্যাদা, শ্রেণীবৈষম্য ও বর্ণপ্রথার বিলুপ্তি ঘোষণা করেছে। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবজাতির সম্মান ও মর্যাদার অধিকার, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি জীবনযাত্রার মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার, জীবনরক্ষণ ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, একতা, সংঘবদ্ধ ও সাম্যের অধিকার, হালাল উপার্জনের অধিকার, এতিম, মিসকিন, অসহায় নারী ও শিশুর অধিকার, প্রতিবেশির অধিকার, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রভৃতি সব ব্যাপারেই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ও কালজয়ী চিরন্তন আদর্শ হিসেবে ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
মহানবী সা: বিদায় হজ্জের ভাষণে এসব উল্লেখিত মানবাধিকারের কথা সংক্ষিপ্ত অথচ স্পষ্ট করে বলে গেছেন।
আমার বিশ্বাস আমরা পরিপূর্ণ ইসলাম ধর্ম মান্য করলে মানবিক হয়ে উঠবো। তখন কেউ কাউকে আঘাত করবে না, সামাজি ভ্রাতৃত্ব বিরাজ করবে সবখানে। বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় একসঙ্গে বসোবাস করতে পারবো। সবাই সবার বিপদে এগিয়ে আসবে, সবাই হয়ে উঠবে সত্যিকারের মানুষ। সব ধর্মমের, বর্ণের, জাতির, মানুষ মানবিক হোক এই প্রত্যাশা।
লেখক, আনিসুর রহমান

Facebook Comments Box


Posted ১:২৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০