• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    ইসলামে শ্রম, শ্রমিক ও মালিক

    মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম | ০১ মে ২০১৭ | ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

    ইসলামে শ্রম, শ্রমিক ও মালিক

    ইসলাম একটি সু-সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তব সম্মত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এখানে যেমন মালিকের সার্থ সংরক্ষন করা হয়েছে তেমনি শ্রমিকের সার্থ ও সংরক্ষন করা হয়েছে। আমাদের দেশে অধিকাংশ সময়ে দেখা যায় শ্রমিকের সাথে খারাপ ব্যাবহার করা হয়, আথচ আমাদের প্রিয় নবিজী বলেছেন “আল কা-ছিবু বাবিবুল্লাহ” অর্থাৎ শ্রমিকররা হলো আল্লাহর বন্ধু। আনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে ঠকানো হয়, মজুরী কম দেওয়া হয় আবার ঘুরিয়ে সময় ক্ষেপণ করে দেরিতে দেওয়া হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (স:) বলেছেন “শ্রমিকের মাথার ঘাম শুকানোর আগে তাদের পাওনা বুঝিয়ে দাও।“
    এবার আমরা কয়েকজন নবী রাসুলের শ্রমজীবন নিয়ে আলোচনা করবোঃ
    ১। মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম নিজে কৃষিকাজ করে জমিতে ফল-ফসল উৎপাদন করে সংসার নির্বাহ করতেন, জীবিকা সংগ্রহ করতেন।
    ২। জাতির আদি মাতা হযরত হাওয়া আলাইহিস সাল্লাম কাপড় বুনন, সেলাই, কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি প্রভৃতি নিজেদের শ্রমের দ্বারাই করতেন।
    ৩। আল্লাহর নবী হযরত নূহ আলাইহিস সাল্লাম মহাপ্লাবনের পূর্বে আল্লাহর নির্দেশে এক বিশাল কিস্তি নিজ শ্রমের মাধ্যমে নির্মাণ করেছিলেন। কাঠ দিয়ে গড়া এই বিশাল কিস্তি নির্মাণে তিনি যে কাঠ ব্যবহার করেছিলেন সেই কাঠ ছিল তাঁর নিজ হাতে লাগানো গাছের। তিনতলা ও বহু কক্ষবিশিষ্ট এই কিস্তি যখন তিনি কাঠ কেটে, হাতুড়ি পিটিয়ে নির্মাণকাজে ব্যাপৃত ছিলেন তখন তা দেখে তাঁর লোকজন তাঁকে সূত্রধর বলে দারুণ ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল এবং গালাগালাও করেছিল।
    ৪। হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম তিনি লোহা দিয়ে বর্ম তৈরি করেছেন অর্থাৎ তিনি কামারের কাজ করতেন।
    ৫। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই শৈশবকাল থেকে সারা জীবন অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন। এমনকি তিনি মসজিদে নববী নির্মাণে, মসজিদে কুবা নির্মাণে, খন্দক যুদ্ধের খাল খননের কাজে নিজে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ছাগল চরাতেন।
    শ্রম বিশ্ব মানবতাকে মহীয়ান করে তোলে। শ্রমের মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টি জগতের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব যেমন প্রমাণ করেছে তেমনি শ্রমের মাধ্যমেই তার কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করেছে। আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি জগতের সব কিছু মানুষের অধীনে করে দিয়েছেন, যা মানুষ শ্রম প্রয়োগের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারে। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে : তিনি (আল্লাহ)-ই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত-দিন, সূর্য ও চন্দ্রকে এবং নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই বিধানে। অবশ্যই এতে রয়েছে জ্ঞানী কওমের জন্য নিদর্শন এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের বস্তু তোমাদের জন্য (সূরা নহল : আয়াত ১২-১৩)।
    হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম উনার শ্রমের মর্যাদা প্রদান সম্পর্কিত একটি ঘটনা প্রণিধানযোগ্য। তা হলো- হযরত আবু ওবায়দা (রাঃ)যখন বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করলেন তখন খৃস্টান যারা ছিল তারা বললো যে, হে আবু ওবায়দা বায়তুল মুকাদ্দাস এর চাবি আপনাদের যিনি খলীফা আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব (রাঃ) এর কাছে দিতে চাই। তখন হযরত উমর (রাঃ) উনার এক খাদেমকে নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে রাওনা হলেন। কিছু দূর যেয়ে আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব (রাঃ) খাদেমকে বললেন এবার আপনি উঠের পিঠে উঠুন আর আমি উটের রশি ধরে টানি। এভাবে পাল্টা পাল্টি করে যখন বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছিলেন তখন হযরত উমর (রাঃ) ছিলেন আমি উটের রশি ধরে আর খাদেম ছিলেন উঠের পিঠে। সকলে যখন উটের পিঠের লোকটাকে স্বাগতম জানানোর জন্য এগিয়ে আসলো তখন খাদেম বললেন যিনি উটের রশি ধরে আছেন উনিয়ে আমাদের খলিফাতুল মুসলমিন হযরত উমর (রাঃ)। তখন সবাই অবাগ হলো এটা কি ভাবে সম্ভব? খলিফাতুল মুসলমিন হযরত উমর (রাঃ) উটের রশি ধরে, আর খাদেম উঠের পিঠে। এভাবেই হযরত উমর (রাঃ) শ্রমিকের মর্যাদা প্রদান করেছিলেন।
    শ্রম ও শ্রমিক প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন;
    لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ
    অর্থ: “নিশ্চয় আমি (মহান আল্লাহ পাক) মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রম নির্ভর করে।” (সূরা বালাদ: আয়াত শরীফ ৪)
    ইসলামে শ্রমের দিক দিয়ে একজন শ্রমিক ও রাজা-বাদশাহর স্থান একই। কেননা উভয়েই শ্রম দিয়ে থাকে। তবে যার ভিতর যত বেশি খোদাভীতি, তাক্বওয়া, পরহেযগারী থাকবে সে তত বেশি মর্যাদার অধিকারী হবে। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন;
    ا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
    অর্থ: “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ঐ ব্যক্তি, যে বেশি পরহেযগার।” (সূরা হুজুরাত: আয়াত ১৩)
    অর্থাৎ ইসলামে কারো মর্যাদা-মর্তবা নির্ধারণের জন্য বাহ্যিক অবস্থাকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি বরং তার আভ্যন্তরীণ অবস্থাকে প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে শ্রমিকের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ইসলামই একমাত্র শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেছে।
    শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য ও সম্মানজনক মজুরি দেওয়ার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। শ্রমিকের মজুরি এমনভাবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে যাতে সে মালিকের মতো পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে, খেয়েপরে সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা-সমানভাবে পেতে পারে। কেউ খাবে আর কেউ খাবে না এই অসম নীতিকে ইসলাম সমর্থন করে না। শ্রমিকেরা কঠিন পরিশ্রম করে, দেহের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করবে আর সেই উৎপাদন থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে মালিক বিলাসী জীবনযাপন করবে এটা ইসলাম চায় না। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার ন্যায্য মজুরি দিয়ে দাও। (ইবনে মাজা)
    বুখারি শরিফে সঙ্কলিত একখানি হাদিসে আছে যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা যাদের প্রতি অতিশয় রাগান্বিত হবেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেসব ব্যক্তি যারা আল্লাহর নামে ওয়াদা করার পর সে ওয়াদা ভঙ্গ করে, যারা স্বাধীন মানুষ বিক্রি করে সেই মূল্য ভোগ করে এবং শ্রমিকের দ্বারা পুরোপুরি কাজ করিয়ে নিয়ে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রদান করে না। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক না দেওয়াটা মারাত্মক অপরাধ।
    ইসলামের আবির্ভাবের আগেই সেই আইয়ামে জাহিলিয়াতে ক্রীতদাস প্রথা সমগ্র পৃথিবীতে এমনভাবে জেঁকে বসেছিল যে, শ্রম আদায়ের নামে ক্রীতদাসের ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হতো। শ্রমজীবী মানুষকে পশুর অধম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তারা স্বপ্নের সুখের কথা ভাবতে পারত না। মরার পরে কবরে গিয়ে তারা সুখ-শান্তি পাওয়ার চিন্তাও করতে পারত না।
    ইসলাম এই করুণ হাল থেকে মানবতাকে উদ্ধার করে অমানবিক ও অনৈতিক সব কার্যকলাপের মূল উৎপাটন করার মধ্য দিয়ে ইনসাফভিত্তিক একটি অনন্য সমতার সমাজ গড়ে তোলে। মদিনা মনওয়ারায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে সেই বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা স্থাপন করেন। ইসলামের ইনসাফভিত্তিক সমাজ সচেতনতার ছায়াতলে শ্রমিকের অবস্থান পরিবারের সদস্যের অবস্থানে পরিণত হয়।
    ইসলামের চিরন্তন শান্তির আলোয় উদ্ভাসিত কাফ্রী ক্রীতদাস হযরত বিলাল (রা.) মুক্ত মানুষে পরিণত হন। তাঁকে সাহাবায়ে কেরাম সম্বোধন করতেন। ‘সাইয়েদুনা’ আমাদের নেতা বলে। তাঁকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু লাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় সম্মানজনক মুয়াজ্জিন পদে নিযুক্ত করেন।


    আসুন আমরা শ্রমিকদের সম্মান করি, তাদের পাওনাগুলি বুঝিয়ে দেই, তাদেরকে যেন না ঠকাই। একটি সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ গঠনে আমরা ভুমিকা রাখি। আর শ্রমিক হয়ে আমাদের নিজেদেরকে ছোট মনে না করি, আমরা যেন চিন্তা করি নবি রাসুলগণ ও শ্রমিক ছিলেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

    ajkerograbani.com

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757