মঙ্গলবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় কাঁচামাল সংকটের মুখে দেশের শিল্প খাত

  |   শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২০ | প্রিন্ট  

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় কাঁচামাল সংকটের মুখে দেশের শিল্প খাত

করোনায় কাঁচামাল সঙ্কটের মুখে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। কারণ পণ্য সরবরাহকারী অনেক দেশেই করোনা মারাত্মক আকার ধারণ করায় ওসব দেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল আসতে দেরি হচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি। পাশাপাশি দেশে কোয়ারেন্টিনের কারণেও বিদেশি জাহাজ থেকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ হচ্ছে না এসবের বিরূপ প্রভাব স্থানীয় শিল্পের ওপর পড়েছে। তাতে শিল্প উৎপাদনের গতি ব্যাহত হচ্ছে। করোনার প্রথম সংক্রমণের সময় একদফা এমন সঙ্কটের পর দ্বিতীয় দফায় তা আরো তীব্র হচ্ছে। শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রফতানিকারক অনেক দেশের পণ্য সরবরাহে গতি কমেছে। আবার নিয়ম অনুযায়ী করোনাভাইরাসমুক্ত করতে অনেক আমদানি জাহাজ ১৫ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকায় পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ও ক্ষতিপূরণ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নানা কারণে বিশ্ববাজারে শিল্পের কাঁচামালের দামও বেড়েছে। এসব পরিস্থিতিতে নতুন করে কাঁচামাল নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে রডের কাঁচামালে টনপ্রতি বেড়েছে ১১ হাজার ৯০০ টাকা (১৪০ ডলার মার্কিন ডলার)। অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনমুখী শিল্প আমদানি কাটছাঁট করছে। তাতে স্থানীয় বাজারে ফিনিশড রডের মূল্য বেড়েছে টনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অন্যান্য শিল্পের কাঁচামালের একই অবস্থা বিরাজ করছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উৎপাদনমুখী শিল্পের অনুকূলে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি কম হয়েছে। ওই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৯৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১৬ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণপত্র খোলার পরিমাণ কমেছে ১২৪ কোটি মার্কিন ডলার বা ১০ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। স্থানীয় শিল্পের পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল সংকটের বিষয়টি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির নিম্নমুখী প্রবণতাই ফুটিয়ে তুলেছে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে দেশের স্থানীয় শিল্পে কাঁচামাল আমদানি হ্রাসসহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ওই তিন মাসে বিদেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ১৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। আর গত অর্থবছরে একই সময়ে এ খাতে ২০ হাজার ৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছিল। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭ হাজার ৬৫৯ কোটি মার্কিন ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে হয়েছিল ১৯ হাজার ৬০৫ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কাঁচামাল আমদানি কমার কারণে এই সময়ে অনেক শিল্পে উৎপাদনও কমেছে।
সূত্র আরো জানায়, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ওয়্যারিং অ্যাপারেলস (পোশাক) শিল্পের উৎপাদন কমেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, কেমিক্যাল ও কেমিক্যালজাত পণ্যের উৎপাদন কমেছে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ, বেসিক মেটেরিয়ালসে কমেছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে রফতানিও বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ বেশির ভাগ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হয়। সেগুলো দিয়ে পণ্য তৈরি করে রফতানি হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে উৎপাদনমুখী শিল্পের সব ধরনের কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে। কাঁচামাল আমদানি হ্রাসের পেছনে ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। কারণ মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনা চলছে। অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে পণ্যের চাহিদা তেমন না থাকায় শিল্পের উৎপাদন কমতে পারে। আর উৎপাদন হ্রাসের ফলে কাঁচামালের আমদানিও কমতে পারে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে স্টিল মিল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান মাসাদুল ইসলাম জানান, কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে বিশ্ববাজারে রড উৎপাদন উপকরণের মূল্য বেড়েছে। আমদানি পণ্যের সরবরাহে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। তাছাড়া করোনার কারণে ১৫ দিন শিপমেন্ট বিলম্ব হচ্ছে। তাতে প্রতি কনটেইনারে ৩৫০ ডলার খরচ বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে অনেকে আমদানি করছে না। যে কারণে রড উৎপাদন শিল্পে কাঁচামালের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শিল্পকে অস্বাভাবিক দামে কিনতে হবে। তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে রডের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. হাতেম জানান, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে অর্ডার বাতিল হচ্ছে। যে কারণে এ শিল্পে কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁচামালের পুরনো মজুদ থেকে অর্ডার অনুযায়ী ফিনিশড পণ্য উৎপাদন করছে। এ বিষয়টি নিয়ে খুব শিগগিরই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক করা হবে।

Facebook Comments Box


Posted ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০