রবিবার, মার্চ ২৯, ২০২০

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

করোনার প্রভাবে বন্ধের আশঙ্কায় দেশের ৫০ শতাংশ খামার

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

করোনার প্রভাবে বন্ধের আশঙ্কায় দেশের ৫০ শতাংশ খামার

দেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত দুগ্ধ খামারের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। এসব খামারে প্রত্যক্ষভাবে ৭০ লাখ এবং পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশে দুধের চাহিদার প্রায় ৬৬ শতাংশই আসছে স্থানীয় এসব দুগ্ধ খামার ও গৃহস্থের গাভী পালন থেকে। কিন্তু চলমান কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন দুগ্ধ খামারিরা। প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো কমিয়েছে দুধ সংগ্রহ। হোটেল, মিষ্টির দোকান কিংবা ব্যক্তি বিপণনও বন্ধ। খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পারায় দেশের ৫০ শতাংশ খামার বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৯৯ লাখ ২৩ হাজার টন বা ৯৯০ কোটি লিটার দুধ বছরে উৎপাদন করা হয়। সে হিসেবে দৈনিক দুধের উৎপাদন প্রায় তিন-সাড়ে তিন কোটি লিটার। উৎপাদিত দুধের প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিনিয়ত বাজারে বিপণন হয়। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর থেকে বিপণনযোগ্য দুধের প্রায় ১২-১৫ শতাংশ বা প্রায় প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ লিটার দুধ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছিল। গত সপ্তাহে অবিক্রীত দুধের পরিমাণ ৪০-৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন খামারিরা।
বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিডিএফএ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২৬ মার্চ বৈঠক করেছেন সংগঠনটির নেতারা। বৈঠকে বর্তমানে সমগ্র দেশের দুগ্ধ শিল্পে খামারিদের ভোগান্তির নানা তথ্য উঠে এসেছে। অবস্থার উন্নতি না হলে খামারিরা এক মাসেই ৩-৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
বিডিএফএ সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ এমরান এ বিষয়ে বলেন, গ্রামের একজন কৃষক গরুর দুধ বিক্রি করে নিজের পরিবারের খাদ্য এবং তার পোষা প্রাণীটির জন্য খাবার কিনে আনেন। গত সাতদিন ধরে প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিদের দুধ বিক্রি করতে চরম অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। কিছু দুধ বিক্রি হলেও তা অনেক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলোকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত না করলে দেশের দুগ্ধ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশের বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিদিন প্রায় ১০-১৫ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে গুঁড়ো দুধ, ঘি, মাখন, ফ্লেভারড মিল্ক, আইসক্রিম, ক্রিম তৈরি করার সক্ষমতা আছে। সরকার ও দেশের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো থেকে এ সহযোগিতা না পেলে অচিরেই প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য বলছে, একজন মানুষের প্রতিদিন ২৫০ মিলিলিটার দুধের প্রয়োজন। সে হিসেবে দেশে প্রতি বছর ১ কোটি ৫২ লাখ টন দুধের চাহিদা রয়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয়েছে ৯৯ লাখ ২৩ হাজার টন। সে হিসেবে জনপ্রতি দুধের চাহিদা মিটছে ১৬৫ মিলিগ্রাম। ফলে এখনো ঘাটতি প্রায় ৫৩ লাখ টন। জনপ্রতি প্রতিদিন ঘাটতি ৮৫ মিলিলিটার।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন তরল দুধ গ্রহণের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় দুগ্ধ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশে জনপ্রতি দুধ গ্রহণের পরিমাণ আরো কমে যাবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো দেশের মোট উৎপাদনের মাত্র ৫-৭ শতাংশ বা প্রতিদিন ১২-১৫ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে থাকে। বাজার থেকে দুধ সংগ্রহে শীর্ষে সমবায় অধিদপ্তরের সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)। এর পরই রয়েছে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের আড়ং, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ ডেইরি। এছাড়া আকিজ গ্রুপ, রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রডাক্ট লিমিটেড, আফতাব ডেইরি, ইবনে সিনা, আমেরিকান ডেইরি, এসিআই লিমিটেড ও আবুল মোনেম গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করে থাকে। খামারিরা উৎপাদিত বাকি দুধ বিক্রি করে বিভিন্ন মিষ্টির দোকান, বসতবাড়ি কিংবা স্থানীয় বাজারগুলোতে। পরিস্থিতির কারণে বড় কোম্পানিগুলো তাদের সংগ্রহ যেমন কমিয়েছে, তেমনই মিষ্টির দোকান কিংবা ব্যক্তি বিপণন প্রায় বন্ধের পথে। চলমান পরিস্থিতিতে সহযোগিতা না করলে সামনের রমজানে সংকট আরো ঘনীভূত হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ইমরান হোসেন বলেন, পশুখাদ্যের অত্যধিক উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও পানির বিল কৃষির আওতায় না এনে বাণিজ্যিকীকরণসহ নানা সমস্যার কারণে দেশের দুগ্ধ খামারগুলো এমনিতেই হুমকির সম্মুখীন। এর মধ্যে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দুধ বিক্রি একেবারেই বন্ধের উপক্রম। ফলে আসন্ন রোজার মাসে দেশে দেখা যেতে পারে দুধ ও দুধ-জাতীয় পণ্যের সংকট। তাই এ সময় দুধ মজুদ করে রাখতে পারলেই দেশে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় হবে, তেমনই দেশের দুগ্ধ শিল্পকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।


Posted ১১:০৪ এএম | রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement