শুক্রবার, জুন ৫, ২০২০

করোনায় বিপর্যস্ত আবাসন ও সহযোগী শিল্পখাত

  |   শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০ | প্রিন্ট  

করোনায় বিপর্যস্ত আবাসন ও সহযোগী শিল্পখাত

২০১৩-১৮ সাল এই ৫ বছর দেশের আবাসন ও সহযোগী শিল্পে চরম দুঃসময় গেছে। মাঝের একটি বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে সবে একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করছিল শিল্পটি। গত বছর ১৬-১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও হয়েছিল এ খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার আঘাতে একেবারে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে আবাসন ও সহযোগী ২১১ শিল্পকে।
এবারের পরিস্থিতি এমন, যার মুখোমুখি অতীতে কখনও হয়নি কেউ এ খাতের উদ্যোক্তাদের। তাই করোনার কারণে শিল্পের কী অপূরণীয় ক্ষতি হবে তার সঠিক নির্ণয় করা কঠিন বলে মনে করছেন শিল্পমালিকরা। তবে করোনার আঘাত সবচেয়ে বেশি আবাসন ও সহযোগী শিল্পের ওপর যে লেগেছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে আবাসন শিল্পে মতোই এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ২১১টি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্পখাত চরম হুমকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন এসব খাতের ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, মহামারি করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাবে স্থবির আবাসন খাত। ফলে ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, কনস্ট্রাকশন, স্যানিটারি, সিরামিক, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যাবল ও লাইটিং শিল্পের মতো ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ খাতে নেমেছে বিপর্যয়। চরম ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে ৫৯ লাখ নির্মাণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান। জানা গেছে, মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ২১১ ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্পখাত স্থবির। এসব খাতে দুই হাজারেরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকিতে পড়েছে।
সার্বিক বিষয় সম্পর্কে আবাসন মালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন জানান, এবারের পরিস্থিতি অতীতের কোনো সময়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। ধরে নিতে হবে এটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই পারেন আমাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে। তিনি বলেন, করোনার কারণে আবাসন শিল্পেই ক্ষতি সবচেয়ে বেশি অবশ্যই হবে। তবে এর ক্ষতি নির্ণয় করা সম্ভব নয়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বলা যাবে না কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। এখন ফ্ল্যাট বিক্রি তো দূরের কথা, নির্মাণই কাজই সম্পূর্ণ বন্ধ। কতদিন এভাবে চলবে তা কারও জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে কনস্ট্রাকশন, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে এবং বড় বড় অবকাঠামোর ব্যাপক নির্মাণ দরকার পড়বে। তার জন্যও দরকার পড়বে বিশাল অর্থনীতির। সুতরাং আবাসন শিল্পসহ আবাসন খাতের সহযোগী ২১১টি সাব-সেক্টরে গতি আনতে হলে এই শিল্পের দিকে সরকারকে সুনজর দিতে হবে। নতুবা এসব খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, আবাসন শিল্পে ৩৫ লাখ এবং সাব-সেক্টরসহ মোট ৭০-৭৫ লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে আবাসন শিল্পের সহযোগী ২১১টি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পের মধ্যে রয়েছে ২৭টি কনস্ট্রাকশন সামগ্রী খাত এবং ৪৩টি বাথ ও কিচেন ফিটিংস পণ্যসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহকারী খাত। আরও রয়েছে ৪৪টি ইলেকট্রিক্যাল, ৪৪টি ফার্নিচার, ১৮টি সার্ফেজ ফার্নিশিংসহ আরও অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প। এসব খাতের মধ্যে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে দেশের সিমেন্ট, রড, স্টিল ও রি-রোলিং মিলস, সিরামিক ও টাইলস, কেমিক্যালস, ইট, বালু, পাথর, পিভিসি পাইপ, উড, গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম, কিচেন ফিটিংস, গ্যাস স্টোভ, ওয়াটার হিটার, আয়রন, ফ্লাশিং ইকুইপমেন্টস, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, ট্রান্সফরমার, লাইট, ক্যাবলস, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার, এয়ারকুলার, বিল্ডিং ইনস্টলেশন, গ্লাস ডোর, টিমবার, ইলেকট্রিক্যাল সিকিউরিটি ডোর, বিল্ডিং সেফটি, মোজাইক, পেইন্ট, সিরামিকের বিভিন্ন পণ্য, বিভিন্ন ধরনের পাইপ, ফিটিংস, কাচ ও কাচজাতীয় অন্যান্য পণ্য, পাথর ও পাথরজাত পণ্য, পেইন্ট, লোহাজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, আসবাবপত্র ও কাঠজাত বিভিন্ন পণ্য, প্লাইউড, বৈদ্যুতিক ফিটিংস ও অন্যান্য সামগ্রী, নির্মাণকাজের যন্ত্রপাতি, আঠাজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, স্টিলজাত পণ্য, অ্যালুমিনিয়াম খাতের মতো ২১১টি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প। করোনাভাইরাসের প্রভাবে আবাসন খাতে হুমকিতে পড়ায় বিপর্যয় নেমেছে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পেও।
এসব খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আবাসন খাত সচল হলেই ঘুরে দাঁড়াবে লিঙ্কেজ শিল্প। এ ছাড়া আবাসন কোম্পানিগুলোতে ২০ হাজার নির্মাণকাজ ব্যবস্থাপক, ১০ হাজার ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, তিন হাজার স্নাতক প্রকৌশলী এবং প্রায় ৫০০ স্থপতি নিয়োজিত রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি ও ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বলেন, শুনছি সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা কাটছাঁট করবে। এটা করা হলে সিমেন্ট শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া সিমেন্ট খাতকে প্রণোদনা দিলেও এখনও বাংলাদেশে এমন কিছু দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমরা চাই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চলমান রাখা হোক। অন্যথায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন করোনা মহামারি চলছে। সামনে অর্থনৈতিক মহামারি শুরু হবে। ফলে আমরা বেশ খারাপ অবস্থায় আছি। এত বড় ধাক্কা সহজে সামলানো যাবে না। কারণ অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ নেই। ব্যাংকগুলো টাকা সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছে। তাই হাত গুটিয়ে রাখা ব্যাংকগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।’
মহামারি করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে নতুন বাজেট সামনে রেখে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে দেওয়া পত্রে আবাসন শিল্পের বিনিয়োগকারীদের মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদানে অনুরোধ করেছে রিহ্যাব। সংগঠনটি বলেছে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমগ্র নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। বর্তমানে এই আবাসন শিল্প একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্মাণ খাত দারুণভাবে ক্ষণতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবাসনশিল্পের ৩৫ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
রিহ্যাব বলেছে, আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ক্রেতাদের কিস্তির ওপর ভিত্তি করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। অধিকাংশ ডেভেলপারের সঙ্গে তফসিলি ব্যাংকের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সুযোগ-সুবিধা নেই। তারা নিজ নিজ বিনিয়োগ এবং ক্রেতার কিস্তির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। করোনার প্রভাবে ক্রেতারা কোনো কিস্তি দিচ্ছে না। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা না থাকার কারণে ডেভেলপাররা গভীর সঙ্কটে পড়েছেন। অফিস পরিচালনা, নির্মাণকাজ এবং দৈনন্দিন জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থায় সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বরাদ্দ প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছে রিহ্যাব।
বাংলাদেশ কনস্ট্রাকশন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন চৌধুরী জুয়েল বলেন, ‘কনস্ট্রাকশনের জন্য কোনো ঋণ নেই। ক্রেতারা কিস্তির টাকা দিতে পারছে না। একটা দোদুল্যমান অবস্থা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে আসছে বাজেটে আবাসন খাতে বিশেষ বরাদ্দ ও রেজিস্ট্রি খরচ কমানোর দাবি করছি।’
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে কাজ না থাকায় জীবনযাপনে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে দেশের প্রায় ৫৯ লাখ নির্মাণ শ্রমিক। দেশের অবকাঠামো নির্মাণকারী কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি হয়েছে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা। এ খাতের প্রায় ৩৪ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ এখন অজানা। আছে ছাঁটাই, চাকরি হারানো ও বেকারত্বের শঙ্কা। আবার আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক এখন কর্মহীন। এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের। কনস্ট্রাকশন ও আবাসনশিল্প মিলিয়ে প্রায় ৫৯ লাখ নির্মাণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা গেছে, আবাসন ও কনস্ট্রাকশন শিল্পের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, পেইন্টসহ অনেক শিল্পখাত জড়িত। কীভাবে করোনাভাইরাসের এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে তা কেউ বলতে পারছেন না। আবাসন ও কনস্ট্রাকশন খাতে আরও ধাক্কা আসতে পারে। কবে নাগাদ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে, এর উপায় দেখছেন না উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় আবাসন খাতকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের কাছে নীতি-সহায়তা চান উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, আবাসন খাত পদে পদে যেসব হয়রানির শিকার হচ্ছে, তা থেকে পরিত্রাণ দেওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। প্রকল্প অনুমোদনের সব প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। নীতি-সহায়তার সঙ্গে কর প্রণোদনাও প্রয়োজন। এগুলো সরকার ইতিবাচকভাবে দেখলে তবেই ঘুরে দাঁড়াবে আবাসন খাত। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে বিপদগ্রস্ত নির্মাণ শ্রমিকরাও রক্ষা পাবেন। এখন নির্মাণ শ্রমিকদের ভাগ্য অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী এসএম খোরশেদ আলম মনে করেন, করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দেশের কনস্ট্রাকশন খাতের সব কাজ বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অজানা। ৫০ শতাংশের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ধরে রাখতে সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের স্বার্থে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে।


Posted ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]