শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

“কালের বিবর্তনে আধুনিক গোলকিপিং”

ডেস্ক রিপোর্ট   |   শুক্রবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ | প্রিন্ট  

“কালের বিবর্তনে আধুনিক গোলকিপিং”

গোলরক্ষক বা গোলী ফুটবলের এমন একটি অবস্থান যেখানে খেলার ফল নির্ধারণ হয়। যে কারণে গোলকিপিং পজিশনটি অনেকটা স্নায়ুচাপে থাকা একজন খেলোয়াড়ের অবস্থানও বলা যেতে পারে। গোলরক্ষকের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে গোল রক্ষা করা। যদিও সময়ের প্রয়োজনে এবং ফুটবলের নিয়ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় সাধারণ খেলোয়াড়ের ভূমিকাও পালন করে।

সাধারণত প্রথম পছন্দের গোলরক্ষকের জন্য দলের জার্সি নম্বরটি ১ হয়ে থাকে। তবে তারা ১ ও ৯৯ এর মধ্যে যে কোনো জার্সি নম্বর পরিধান করতে পারেন। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছেন উবালদো ফিলোল, যিনি ১৯৭৮ এবং ১৯৮২ ফিফা বিশ্বকাপে যথাক্রমে ৫ এবং ৭ নং জার্সি পরিধান করে খেলেছিলেন। ১৮৫৭ টম ব্রাউন’স স্কুল ড্রেস উপন্যাসটিতে গোলরক্ষক শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।


১৫৮১ সালে গোলরক্ষকের কোন নির্দিষ্ট অবস্থান ছিল না। পরবর্তী সময়ে ১৬০২ সালে যে ফুটবল ম্যাচ খেলা হতো তা হচ্ছে দুইপাশে স্থাপন করা হতো ২ দলের জন্য দূরত্ব ছিল ৮ থেকে ১০ ফুট যার নাম করা হয়েছিল গোল এবং এটিকে রক্ষা করার জন্য নিয়মিত একজন দাঁড় করানো হয়েছিল।

ইংলিশ এফএ দ্বারা ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত খেলার নিয়ম কানুন গোলরক্ষকের জন্য বিশেষ নিয়ম বা বিধি তৈরি করেনি। এর বিপরীতে যে কোন খেলোয়াড় বল ধরতে বা বলটিকে দূরে সরানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৮৭০ সালে সকল খেলোয়াড়ের জন্য বলটিকে হাত দিয়ে ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৭১ সালে গোলরক্ষকের পরিচিতি প্রদান করার জন্য নিয়মে বেশ কিছু সংশোধন আনা হয়েছিল। সে সময় নির্দিষ্ট করে শুধুমাত্র গোলকিপারকে তার গোল রক্ষা করার জন্য বলটি ধরা এবং বলটিকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল।


১৯৯০ সালে ফিফা বিশ্বকাপে দেখা যায় যে কোন দল সুবিধাজনক অবস্থান থাকলে গোলরক্ষককে শুধু শুধু প্রয়োজন ছাড়া ব্যাক পাস দিত এবং সময়ক্ষেপণ করত যা কিনা খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করতো। এরপর ১৯৯২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন খেলার নিয়মে ফের পরিবর্তন করেছিল। যার ফলে গোলরক্ষকদের উপর ব্যাক পাস নিয়মে প্রভাব ফেলেছিল। মূলত তখন থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক গোলকিপিংয়ের একটা অন্যতম প্রচলন আমরা দেখতে পাই।

গোলরক্ষকের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলে বেশ কয়েকজন গোলকিপারের নাম স্মরণ না করলেই নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের লেভ ইয়াসিন যাদের মাঝে অন্যতম। তাকে পৃথিবীর ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যা তাকে ২০০২ সালে ফিফার স্বপ্নের দলে স্থান পেতে সাহায্য করে। লেভ ইয়াসিন পৃথিবীর ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র গোলরক্ষক যিনি ফিফা ব্যালন ডি’অর পেয়েছিলেন।

মেক্সিকো জাতীয় দলের গোলরক্ষক জর্জ ক্যাম্পোস, যার মাত্র ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতা ছিল এবং তার পোশাকের বৈচিত্র্য তাকে অনন্য করে রেখেছিল। জর্জ ক্যাম্পোসকে তার সময়ে একবিংশ শতাব্দীর সেরা গোলরক্ষক বলা হতো। ব্রাজিল জাতীয় দলের গোলরক্ষক রোজারিও চেনি এক রেকর্ডের কারণে এখনো অনন্য। গোলরক্ষক হিসাবে ক্লাবের পক্ষ হয়ে ১৩১ টা গোল করেন তিনি। যার সবগুলো কোন না কোন ফ্রি কিক এবং পেনাল্টি থেকে এসেছে।

আধুনিক গোলকিপিং ধারণাটা একবারে শুরু হয়নি। এটি ধাপে ধাপে কিছু নিয়ম কানুন পরিবর্তন এবং ট্যাকটিকেল পরিবর্তনের কারণেই হয়েছে। আধুনিক গোলরক্ষকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গোল রক্ষার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় থেকে গোলরক্ষকের দূরত্ব কম রাখা অর্থাৎ স্পেস ম্যানেজমেন্ট। বলের গতি প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করা, বল নির্ভুলভাবে পাস করা এবং কাউন্টার এটাকে দলকে সহায়তা করা।

এছাড়া ডিফেন্ডিং সেট পিসে গোল রক্ষার ক্ষেত্রে একটু বেশি উপরে থাকা। যাতে বল এর ধরন অনুযায়ী প্রতিপক্ষ বল নেয়ার আগেই গোলরক্ষক সেই বলটাকে নিয়ে নিতে পারে। প্রতিটা ম্যাচে গোল কিপিং এর ব্যাক পাসের সাফল্য কমপক্ষে শতকরা ৮০ ভাগ হওয়া উচিত।

বার্সেলোনার গোলকিপার স্টেগেন লা লিগায় মালোর্কার বিপক্ষে ৯০ মিনিটের ম্যাচে মোট ৬৮ টি পাস করেন। তার মধ্যে ৬৪ টি পাস সঠিক হয়। যার মানে হচ্ছে শতকরা ৯৪ ভাগ সঠিক পাস হয়। এটি আধুনিক গোলকিপিংয়ের একটা বড় উদাহরণ হতে পারে। একজন আধুনিক গোলরক্ষক একটা ৯০ মিনিটের ম্যাচে গড়ে ৪ থেকে ৬ কিলোমিটার দৌড়ায়।

আধুনিক গোলকিপিং শুরু হয় ১৯৫০ সালে হাঙ্গেরির গোলরক্ষক জুলা গ্রশিচ এর মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে এটি লিভারপুলের কিংবদন্তি গোলকিপার ব্রস রুবেলের মধ্যে দেখা যায়। বর্তমানে আধুনিক গোলরক্ষকের কথা বললে যার নাম আসে তিনি “ম্যানুয়েল নয়্যার”। যাকে আমরা ২০১৪ বিশ্বকাপে প্রথম দেখতে পাই।

এই বিশ্বকাপে ম্যানুয়েল নয়্যার কোন এক ম্যাচে ৯০ মিনিটে ৬.৯ কিলোমিটার দৌড়ান। যা পৃথিবীর গোলরক্ষকদের মধ্যে বিরল ঘটনা। ম্যানুয়েল নয়্যার এত বেশি আত্মবিশ্বাসী যে তাকে জার্মানির তৃতীয় বিভাগে দলে যদি ডিফেন্স হিসেবে খেলানো হয় তাহলে সে আত্মবিশ্বাসের সাথে খেলতে পারবে বলে দাবি করে।

আধুনিক গোলকিপিং এর ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছেন ব্রাজিল এবং লিভারপুলের আলিসন বেকার। একজন আধুনিক গোলকিপারের যতগুলো গুণ থাকা দরকার তার সবগুলোই তার মধ্যে আছে। বর্তমান সময়ে তাকেই পৃথিবীর এক নম্বর আধুনিক গোলকিপার বলা হয়। বর্তমান বিশ্বে আধুনিক গোলকিপিংয়ে অন্যদের মাঝে ব্রাজিলের এডারসন, স্লোভেনিয়ার জন অবলাক, ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড এবং জার্মানির স্টেগেন উল্লেখযোগ্য।

সময়ের সাথে সাথে ফুটবলের ট্যাকটিকস বদলেছে অনেক। বর্তমান আধুনিক ফুটবলে বিশ্বসেরা কোচদের মধ্যে অনেকেরই ট্যাকটিকসের অন্যতম হাতিয়ার তার দলের গোলকিপার। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে এই পজিশন আরো নান্দনিক ও সৃজনশীল হবে। আমরা সেই সময়ের প্রতীক্ষা করছি।

লেখক: নুরুজ্জামান নয়ন
গোলকিপিং কোচ
বসুন্ধরা কিংস

Facebook Comments Box

Posted ৩:০৩ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০