• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    কালোই সুন্দর : কালো মেয়েদের পক্ষে অভিনব আন্দোলন

    | ০২ মার্চ ২০২১ | ৮:৪২ অপরাহ্ণ

    কালোই সুন্দর : কালো মেয়েদের পক্ষে অভিনব আন্দোলন

    আপনি একজন ভালো পাত্র খুঁজছেন, বন্ধুত্ব করতে চান, কর্মক্ষেত্রে নিজেকে সাবলীলভাবে এগিয়ে নিতে চান? তাহলে আপনার প্রথম যোগ্যতাই হচ্ছে আপনাকে ফর্সা হতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলেও এটাই সত্যি যে, গোটা ভারতের বর্তমান চিত্রই এটা। শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশেও একই পরিস্থিতি। আর এই চিত্রকে পাল্টে দেয়ার জন্য ভারতীয় অভিনেত্রী নন্দিতা দাশ শুরু করেছেন এক অভিনব লড়াই।


     


    নন্দিতা দাশ সম্প্রতি ‘কালোই সুন্দর’ শিরোনামে একটি পোস্টার ছাপিয়েছেন। কালো আর ফসার্র প্রতি বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহবান সম্বলিত এই পোস্টার ভারতের সর্বত্র সেঁটে দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে প্রচারভিযান শুরু করেছেন। তিনি মনে করেন, গায়ের রং নিয়ে হীনমন্ম্যতার কারণে অনেক মেয়ে আত্মহত্যার মতো কাজে প্ররোচিত হচ্ছে।

    ajkerograbani.com

    নন্দিতা বলেন, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন, সবখানেই প্রচার করা হচ্ছে ফর্সা মুখ মানেই সুন্দরী। এখানে সৌন্দর্যকে এমনভাবে উপস্হাপন করা হচ্ছে যেন, ফর্সার বিপরীত শব্দ ‘কালো’। অর্থাত্‍ সৌন্দর্য এবং কালো পরস্পর বিপরীত শব্দ। দেখা যাচ্ছে, একজন নারী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বয়স ৪৩ হলেও জায়গা করে নিতে পারেন শুধু মাত্র ফর্সা গায়ের রঙের কারণে। শরীরের রঙের কারণে অন্যান্য যোগ্যতা গৌণ হয়ে যায়।

    রঙ কালো হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে আত্মবিশ্বাসী থাকবেন? নন্দিতা সব জায়গাতেই এই প্রশ্নটির উত্তর তুলে ধরেন। দেখা যায়, কালো রঙের মেয়েরা বিষয় ভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোতে অগতানুগতিক ও শুধু চরিত্রের প্রয়োজনে কাজ করার সুযোগ পায়। ধরা হয় এগুলোতেই তারা মানানসই। কিন্তু মূলধারার বলিউডি চলচ্চিত্রে কাজ করতে হলে তাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।

     

    ‘রঙের উর্ধ্বে সৌন্দর্য’

    নন্দিতা দাশ ২০০৯ সালের মে মাসে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং এই সংগঠন থেকে ‘কালো মুখই সুন্দর’ শীর্ষক প্রচারণা শুরু করেন। ‘রঙের উর্ধ্বে সৌন্দর্য’ এই স্লোগান নিয়ে তারা তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেও সক্ষম হয়েছে। ফর্সা ত্বকের প্রতি বদ্ধমূল আগ্রহ বিলোপ করার জন্য এতে সমাজের উঁচু শ্রেণীকে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস চালান তিনি।

    নন্দিতা বলেন, সম্প্রতি আমার কাছে হাজার হাজার তরুণীর হৃদয় নিংড়ানো মেইল আসতে শরু করেছে। তারা প্রত্যেকেই জানতে চায়, এই বর্ণবৈষম্য থেকে কিভাবে তারা পরিত্রাণ পেতে পারেন। অনেকে সুস্পষ্টভাবে আত্মহত্যার শপথ করে মেইল পাঠিয়েছে এবং এর কারণ হিসেবে তারা আক্ষেপের সাথে জানিয়েছে তারা ফর্সা নয়।

    পত্র-পত্রিকায় নন্দিতা তার নিজের ছবিই প্রচারণার জন্য ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। তিনি সামনের সকল প্রচারভিযানেও এটা চালিয়ে যেতে চান । তিনি কালো হলেও বলেন, ‘এটা উজ্জ্বল শ্যামল, এটাই সুন্দর’

    ইউরো মনিটর ইন্টারন্যাশনালের এক বাজার সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে গত চারবছরে ভারতের রং ফর্সাকারী ক্রিমের বাজার ৩৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৬৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গতবছর সৌন্দর্য বর্ধনকারী প্রসাধনের মধ্যে শতকরা ৮৪ ভাগই ছিল রঙ ফর্সাকারী ক্রিম।

    সম্প্রতি ভারতীয় বংশোদ্ভূদ মেয়ে নিনা দালুভারি ‘মিস আমেরিকা’ নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতে বৈষম্যের শিকার কালো গাত্রবর্ণের মেয়েরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেন। কারন নিনা দালুভারি একজন কালো গাত্রবর্ণের মেয়ে।

    এই ব্যাপারে দ্য হিন্দু পত্রিকায় একটা সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে নিনা যদি ভারতীয় সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠতেন আর ভারতে এই ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন তাহলে কালো গাত্রবর্ণের কারণে অবশ্যই তাকে উপেক্ষিত হতে হত। এমনকি তীর্যক মন্তব্যও শুনতে হত।

    নন্দিতা এখন বাজারে প্রচলিত বেশ কয়েক ধরনের রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনচিত্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

    গতবছর দেখা গেছে বাজারে এসেছে নিম্নাঙ্গ ফর্সাকারী ক্রিম। বিজ্ঞাপনচিত্রে দেখা যায়, তরুণীরা ক্রিম ব্যবহার করে নিম্নাঙ্গ ফর্সা করছে। আর এর ফলে প্রেমিকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপন এখন অহরহ চোখে পড়ছে। বিয়ে ও সমন্ধ তৈরিতে সহায়তাকারী ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় নারীদের ফর্সা, সুন্দর মুখচ্ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। সর্বোপরি এ কথা প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে যে ‘একটি সুন্দর মুখ’ই স্বামীকে ধরে রাখতে পারে।’ মাঝে মাঝে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছেলেরা পাত্রীর জন্য সরাসরি ফর্সা মেয়েই চেয়ে বসছে। যথারীতি মেয়েরা তাদের কাছে নিজেদের উপস্হাপন করছে এবং যে মেয়েরা তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল ফর্সা তারাই এগিয়ে যাচ্ছে।

    মুম্বাইয়ের বিয়ের পোশাক ডিজাইনার একতা ঘোষ জানান, পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবেই ছেলেরা এখন ফর্সা মেয়েই কামনা করে। তিনি বলেন, এ কথা ভেবেই বাবা-মা আত্মীয়স্বজন মেয়েদের মুখ উজ্জ্বল করার তাগিদ দেন।

    ভারতের খোলাবাজারে রং ফর্সা করা ক্রিমগুলোর পথিকৃত্‍ ফেয়ার এন্ড লাভলি ১৯৭৫ সালে নিয়ে আসে হিন্দুস্তান লিভার। এই ক্রিম এখন বিবর্ণ মুখে মুখশ্রী ফিরিয়ে আনার প্রচারণা চালিয়ে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে বিক্রির তালিকায় শীর্ষে চলে এসেছে। আরেকটি ভারতীয় ভোগ্যপণ্য কোম্পানি অনেক পরে মেয়েদের জন্য ‘ফেয়ার এন্ড টিন’ এবং ছেলেদের জন্য ‘ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম’ দুটি রঙ ফর্সাকারী বাজারে নিয়ে আসে। এই পন্যকে বলিউড অভিনেতা শাহরুখ বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে সকলের নিকট পরিচিত করে তোলেন। তার সর্বশেষ বিজ্ঞাপনচিত্রটি ছিল এমন- শাহরুখ খান লালগালিচায় হেঁটে যেতে যেতে ক্রিমটি আলতো তার এক মেয়ে ভক্তের দিকে ছুঁড়ে দেন।

    এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে নন্দিতা দাশের ‘কালোই সুন্দর’ গোষ্ঠী প্রতিবাদ জানায়। এ জন্য তারা গণস্বাক্ষর কার্যক্রম শুরু করেন। এই কর্মসূচিতে ১৫ হাজারেরও মানুষ সাক্ষর করেছেন। কিন্তু শাহরুখ এ ব্যাপারে সাড়া দেননি। নন্দিতা বলেন, মানুষকে এসব বোঝানোই যথেষ্ঠ নয়। রঙ ফর্সাকারী ক্রিম একজন মানুষের জন্য লজ্জাজনকও বটে।

    রঙ ফর্সাকারী ক্রিম উত্‍পাদনকারীরা পরামর্শ দেন যে, উঠতি বয়সীদের এটা আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কিন্তু ইমামি এবং হিন্দুস্তান লিভার কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজী হয়নি।

    ভারতের একটি প্রতিষ্ঠানে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত প্রাচী চৌহান বলেন, গত তিনবছর ধরে তিনি ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্যবহার করে আসছেন যা তার নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো পরির্বতন দেখতে পান নি। তিনি বলেন, এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই ঠিক কিন্তু এর কোনো কার্যকারিতাও নেই।

    নন্দিতা বিশ্বাস করেন, রঙ ফর্সাকারী কোম্পানিগুলো ভারতে বর্ণবৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার কারণ হতে চায় না। কিন্তু এটা না চাইলেও হচ্ছে। কলংকজনক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

    এই অভিনেত্রী বলেন, একদিক থেকে যেমন পুরুষের ত্বক ফর্সাকারী প্রসাধনীগুলো বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে, অপরদিকে নারীরা তাদের গায়ের রং নিয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। যেটাকে তারা অসম্মান এবং অসমতার প্রতীক বলেই মনে করেন।

    যতক্ষণ আমরা নারীদের সমকক্ষ ভাবতে পারবো না, নারীদের মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে পারবো না ততদিন এই বৈষম্য চলতেই থাকবে। 

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    বিয়ে করাই তার নেশা!

    ২১ জুলাই ২০১৭

    কে এই নারী, তার বাবা কে?

    ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757