• শিরোনাম

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    কুরবানী

    নিলয় নীল | ০৭ আগস্ট ২০১৯ | ১:১৬ অপরাহ্ণ

    কুরবানী

    ভাই মেজাজ টা ভারি খারাপ হচ্ছে আমার। গাড়ি কেউ এমনে চালায়? মনে হচ্ছে ড্রাইভার টারে গুতা দেই।
    -হ আমিও একটু চোখ বুজে ঘুমাইতে চাচ্ছিলাম। পারতেছি না।তবে ড্রাইভার এর কি দোষ? দোষ তো এই দেশের হর্তাকর্তাদের ভালো রাস্তা বানায় না।খাল খন্দ হয়ে যায় দ্রুত।
    -ভাই, আমাগো কোথায় নিচ্ছে বাইন্ধা বুইন্ধা? ৫ঘন্টা হইলো শরীর ডা ব্যাথা করতেছে। দড়ির দাগ বসে যাবে তো এত সুন্দর তেলতেলে লাল শরীর।
    -হ তুই দেখতে ভালো। মাঠে তো দেখি সব গাভী গুলো তোর কাছে ঘেঁষাঘেঁষি করত। আমার মনে হয় আমাদের শহরে নিচ্ছে।গতবার তোর গবু ভাইরে নাকি নিয়ে গেছিলো লোকজন নাকি তারে নেয় নাই। এইবার খামারে ফেরত আইসে গল্প করল কি কি হইছিলো। যা বলছিলো তা সব মিলে যাচ্ছে।
    -ক্যান ক্যান কি মিলতেছে ভাই।গবু ভাই এখন কোথায়?
    -জানি নারে তবে দেখছিলাম ১মাস পরে এলাকার চেয়ারম্যান আসছিলো গবু, গলু গছু এই তিনটারে নিয়ে গেলো।
    -চলো একটু ঘুমাই।দুইজন দুইজন এর গলায় গলা লাগায় ঘুমাই।

    সকালে গটু আর গপু সহ সব গরুকে ট্রাক হতে নামানো হলো। হাজারিবাগ হাটে আনা হয়েছে তাদের। রাস্তার দুপাশ জুড়ে হাটে পাশে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইন্সটিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং & টেকনোলজি। এখানকার শিক্ষার্থীরা এই হাট নিয়ে খুবই বিরক্ত সে যাই হোক এই বিরক্তিতে গটু আর গপু এর কিছু যায় আসে না।
    -গটু ভাই দেখছ নাকি কি অবস্থা। কত বাহার এর ভাই ব্রাদার্স। কিন্তু কোন আপুনি তো নাই। বুঝলাম না কিছু।
    -হাহাহা।গবুও আমারে বলছিলো।
    “উফ এত জোরে মারে কেন যাচ্ছি তো সামনে”। মনে হয় গুতা দেই শালারে কিন্তু পারি নারে। দুইবছর ধরে কতকিছু খাওয়াইলো পেলে পুষে বড় করলো।
    -চলো আস্তে আস্তে যাই। বুঝছি এখন আমাদের ও বাশের সাথে বাধবে সবাইরে যেভাবে বাধছে।
    -কিচ্ছু করার নাই, মালিক যা করে তাই মানতে হয়। খাবারের অভাব নাই দেখতেছি। খড় আর ভুষির গন্ধ পাচ্ছি।
    -গটু ভাই আমার কিন্তু কাচা ঘাষের উপরে আর কিছু ভালো লাগে না। আমি তো কম্পিটিশন কইরা ঘাষ খাই। সেদিন গনুর সাথে বাজি ধরছিলাম।যে হারবে সে জিহ্বা দিয়ে শরীরে চুলকায় দিবে ৩০মি।
    -হাহাহা ছি ছি। এই বয়সে এমন।? মা কে দেখতাম ছোট বেলায় শরীর চেটে দিতো ভিজে গেলে।
    -আরে গটু ভাই এভাবে দেখো কেনো।দৃষ্টি ভংগী বদলাও।আমরা তো আর মানুষের মতো হাত দিয়ে আদর করতে পারি না।

    গটু আর গপু কে পাশাপাশি বাধা হয় তাদের দুপাশে আরো ২০০/৩০০ গরু বাধা।
    এক একজন দেখতে আলাদা।কেউ সাদা কেউ কালো কেউ লাল। কারো সিনা মোটা, কারো সিনা সরু। কারো পশ্চাদদেশ ছড়ানো কারো সংকীর্ণ। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই তাদের গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড।
    -গপুরে আয় এখন একটু বসি।সারা রাত দাঁড়ায় ছিলাম। সকালের খাবার দিবে মনে হয়।
    -হ গটু ভাই। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।খেয়েই ঘুমাই কি বলো।
    – হ খেয়েই ঘুমা। গপু একটু কান টা চেটে দিবি।চুলকাচ্ছে খুব।
    -কেন চুলকাবো তুমিই না হাইসা দিলা তখন গল্প শুইনা। দেখছে নিজ প্রয়োজনে সবই জায়েজ।মাথা আগাও চুলকায় দেই।

    গটু চুপ হয়ে যায় মাথা এগিয়ে দেয়।

    বেপারি খড় কুচি করে ভুষির সাথে মিশিয়ে দুজনের
    সামনে দিলো। বালতি তে মাথা ঢুকিয়ে বেশ শান্ত ভাবে খাওয়া শেষ করল গটু এরপর খেলো গপু। এখন তাদের একটু ঘুম দরকার। কিন্তু বর্ষার বৃষ্টি। দুজনই ভিজে গেলো তখনো পর্দা টানানো হয় নি উপরে।
    -ধুর গটু ভাই ভিজে গেলাম।তুমিও তো ভিজে গেছ। শরীর ডা ম্যাজম্যাজ করতেছে। আমাদের এলাকার বৃষ্টি কত সুন্দর। দেখতাম কলার পাতা বেয়ে পানি পড়ত, ব্যাঙ ডাকতো। মিউজিক এর মত একদম।
    -সে কথা মনে করে কি আর কোন লাভ আছে। সমস্যা নাই আমাদের মালিক ভালো। গা মুছে দিবে।

    এতক্ষনে হাটে জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। বিশেষ করে অনেক ছোট বাচ্চা পাকনা পোলাপান। ওরা গরুর স্পর্শকাতর অংশে ছুয়ে দিয়ে মজা নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
    বৃষ্টি থেমেছে ৩০মি হলো। দুইটা বাচ্চা এসে গপুর লেজ ধরে টান মারে। গপু মাথা ঝাকিয়ে উঠে পড়ে। একটু দাপাতে থাকে। পাশ হতে গরুটি বলে উঠে
    -আরে মিয়া। চেতলা কেন? খোচা দিছে?
    -হ মিয়া। লেজা ধইরা মোচড় দিছে। মনে হচ্ছে বাশ ভাইঙ্গা দুইটারে গুতা দিয়ে আসি।
    -আরে এইটা খুব কমন। ফান ভাবেই নাও মিয়া। লাভ নাই খোচা আদর দুইটা ই পাবা।
    গপু খেয়াল করে গটুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে এক কিশোর। গলায় চুলকিয়ে দিচ্ছে আর গটু ভাই আরামে চোখ বুজে ঘুমাচ্ছে।
    কিছুক্ষণ এর মাঝে গপু ও ঘুমিয়ে যায়। ঘুম ভাংগে ২ঘন্টা পরে ওপর সারীর দুই গরুর ঝগড়ায়।
    গরু ১: এই বেটা এই চোখা মোটা শিং ঢুকাই দিবো পেটে। চিনিস আমারে তুই? আমার ওজন কত জানিস?
    গরু ২: শিং কি তোর একার আছে? চোখের মধ্যে ঢুকাই দিবো। আমার মালিক এলাকার ডন।
    গরু ১: ডন ফন বুঝিনা। যায়গা ছাইড়া দিয়ে বস।
    গুঁতোগুঁতি শুরু হয়ে যায়। মালিকের মধ্যস্ততায় মারামারি থামে ।
    দুপুরের খাবার এর সময় হয়েছে। গটু আর গপু এর জন্য সকালের একই খাবার।তবে গপু খেয়াল করে পাশের গরুর জন্য মালিক একটু কাচা ঘাসের ব্যবস্থা করেছে। গপুর খুব লোভ লাগছে। চেয়ে খেতে ইচ্ছে করছে।
    -গটু ভাই ঘাস খেতে মন চাচ্ছে।চাইবো নাকি পাশের ভাইয়ের কাছে। কচি ঘাস কচকচ করতেছে।
    -আগে পরে কথা হইছে? নাহলে চাইস না।এটা অসৌজন্যতা।
    -না আলাপ হইছে এলাকার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। তোমারে যখন গলায় আদর করে দিচ্ছিলো একটা পোলা।
    -ওহ আচ্ছা তাহলে তো পরিচিত। চেয়ে দেখ। আমারে ও একটু দিস যদি পারিস আর কি।
    -আচ্ছা গটু ভাই।
    গপু পাশের গরুটাকে ডাকে
    -মিয়া ভাই একটু ঘাস দিবেন। অনেক দিন খাই না।
    -এমনি ই অল্প আছে, আচ্ছা নেন ভাই। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং।এই কথা টা আমাকে আমার এলাকার প্রেমিকা শিখিয়েছিলো।
    -বলেন কি। নাম কি উনার?
    -ওর নাম। গানু,তবে একবছর মাঠে আসে না আর ঘাস খেতে। শেষ দেখেছিলাম পেটে বাচ্চা।
    -আপনার দেওয়া বীজ?
    -আরে না, মালিক নাকি কোন খামার থেকে দেওয়ায় ছিলো। খুব মন খারাপ হয়েছিলো দেখে । কি করব আমরা হচ্ছি দাসের মত।
    -ঘাস টা তেমন মজার না। কেমিকেল এর গন্ধ কেন মিয়া ভাই।
    -আরে মিয়া এই এলাকার আশ পাশের মনে হয়। খাটি জিনিস কি আর শহরে পাওয়া যায়?
    -না আমি আর খাবো না। কিছু মনে না করলে গটু ভাইকে দেই।ওহ আসেন পরিচয় করিয়ে দেই। গটু ভাই, এদিকে ফেরো। ওহ আপনার নাম তো আমিও জানি না।হাহাহা বলুন বলুন।
    – আমি গফু। কুমিল্লা থেকে আসছি।আপনারা?
    -আমি গটু ও গপু আমরা আসছি রাজশাহী হতে। আপনার ওখানকার গাভীরা তো তাদের দুধের জন্য নাম করা তাই না?
    -না বিষয়টা তেমন না আসলে ওখানকার রসমালাই টা তাদের দুগ্ধ কে মূল্যায়ন করেছে । আচ্ছা রাজশাহী এর আম কি আপনারা খেতে পারেন?
    – আমি একবার ছুটে পুরো গাছ ই খেয়ে দিছালাম। হাহাহা। ছোট বেলায় বুঝেন ই তো দুষ্টু ছিলাম। খোয়াড়ে ছিলাম একরাত।আরে মশার কামড়।
    -মশার কামড় এর কথা বলে মনে করায় দিলেন। শহরে সবার মুখে মুখে এখন এডিস মশা কিন্তু।ডেঙ্গু জ্বর আর ডেঙ্গু জ্বর।
    -আরে মিয়া ভাই এই শহরের যে অবস্থা মশা মাছি তো হবেই। এই দুই জিনিস রে এত বিরক্তিকর লাগে আমার। ঘুমাইতে দেয় না শালার ঠিকমত। ভনভন আর প্যানপ্যান আওয়াজ।
    কথার মাঝেই গটু হিসু করে দেয়।ছিটা এসে লাগে গটুর পাশের গরুর। সে রেগে মেগে আগুন।
    -আরে মিয়া এভাবে কেউ মাখায়? কোথা থেকে যে আসে গেয়ো গুলো।
    -আমরা গেয়ো তাই না।তা আপনি কোন শহরে। হ্যা?
    -কেরানীগঞ্জ এ হাইফাই খামারে বড় হইছি।ময়লা আবর্জনা কখনো টাচ করে নি। তোমরা তো মিয়া মাঠে ঘাটে বড় হইছো। কাদাপানি মাখায় বেড়াইছ।
    – হাহাহাহা।শরীরে তো তোমাগো খালি গোস্ত ই হইছে শক্তি আছে কতটুক।শালা ফার্মের গরু।
    -এই কথা বার্তা ঠিক করে । ম্যানার জানে না।
    -আরে গটু ভাই কি শুরু করছ। চুপ করো চুপ করো।
    -আরে দেখ শালা শহরের শিং ছাড়া মাস্তান এর কি ভাব।ইংলিশ ও কয়। মনে হয় গুতা দিয়ে ভুড়ি বার করে দেই।
    -আরে আপনারা চুপ করেন। আরো দুই তিন দিন এখানে থাকা লাগতে পারে আমাদের। আমরাও যদি মানুষের মত এত ঝগড়া বিবাদ করি। আসেন মানুষ গুলোর ভণ্ডামি দেখি।
    -মানুষ কিভাবে ভণ্ডামি করে মিয়া ভাই?
    – আরে অনেক ভাবে করে । ধরেন ওই যে ওইটারে দেখেন। বেচারা কি চুপচাপ কিন্তু কি বিশাল শরীর এইটা ওষুধ খাওয়ায় বানাইছে মানুষ। তার আগে বলেন তো, আপনারে আমারে এখানে আনছে কেন?
    – গটু ভাই কি জন্য আনছে। তুমি তো পরিষ্কার করো নাই। গফু ভাই জিগাইলো বলে দাও তো।
    -আমাদের বিক্রি করার জন্য আনা হইছে। আমরা হয়ত আর আমাদের বাড়ি ফিরবো না।
    -বলো কি । কোথায় যাবো আমরা?
    -মানুষের ভণ্ডামি, তাদের পশুত্ব কে শুদ্ধ করতে নিজেদের কুরবানী করতে।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী