• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    গৃহবধূ থেকে শিল্পপতি

    অগ্রবাণী ডেস্ক | ২২ এপ্রিল ২০১৭ | ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

    গৃহবধূ থেকে শিল্পপতি

    হেলেনা জাহাঙ্গীর। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ের মাধ্যমে সংসার জীবনে পা রাখেন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর মানসিক শক্তির কারণে সম্পন্ন করেন লেখাপড়া। সচ্ছলতার মধ্যে বড় হয়েছেন। কিন্তু পারিবারিক অর্জনেই আবদ্ধ থাকতে চাননি। চেয়েছেন নিজে কিছু করতে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যে নারীরা যেখানে ঘর-সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, হেলেনা জাহাঙ্গীর সেখানে ব্যতিক্রম। ছোট্ট একটি কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করে নিজ উদ্যোগে আধা ডজন কারখানা গড়ে তুলেছেন। হয়েছেন শিল্পপতি। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার কর্মী। সমাজসেবার পাশাপাশি ব্যবসায়ী রাজনীতিতে অংশ নিতে যাচ্ছেন তিনি। তার ভাষায় বিভিন্ন ব্যবসায় উদ্যোগে সফলের পর এখন সংগঠনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চান। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সংক্ষেপে এফবিসিসিআইয়ের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। বহুমুখী কর্মোদ্যোগী এই মানুষটি জানিয়েছেন তার স্বপ্নের কথা। দেশ ও মানুষকে নিয়ে ভাবনার কথা। তার ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার কথা।

    হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, আমাদের দেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদসহ অনেক পদে নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলক চিত্র দেখলে দেখবেন সংখ্যায় নারীরা খুবই কম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজেও চান নারীরা যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উঠে আসে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উৎসাহ থেকেই নির্বাচনে এসেছি।


    জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন নাসিব (ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ) থেকে এবারের ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই)-এর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। দীর্ঘ ২৪ বছর ব্যবসা করছি। আমাদের দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা কম। তাই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ যেসব উদ্যোগে নারীরা যুক্ত আছেন তাদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি অনেকদিন থেকেই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সদস্য। প্রথমবার এফবিসিসিআইতে এসেছি। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু করতে চাই। শীর্ষ এই ব্যবসায়ী সংগঠনের আমার অনেক শুভাকাক্সক্ষী আছেন, বড় ভাইয়েরা আছেন তাদের কাছ থেকে উৎসাহ পাচ্ছি।

    তার মতে নারীরা যে কাজ করেন তা অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে করেন। নারীদের মধ্যে কাজের একাগ্রতা, গতি এবং স্পৃহা আছে তা কাজে লাগানো জরুরি। তাছাড়া রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। বিভিন্ন কাজে নারীরা পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের টিকিয়ে রাখছেন। যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু নেতৃত্বের জায়গায় এখনো অনেক গ্যাপ আছে। আমরা এগিয়ে না এলে সেটা পূরণ হবে না।

    এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘোষণা দিয়েও থাকেননি। তবে রাজনীতির মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা মনে পুষে রেখেছেন। নির্দিষ্ট দলের ব্যানারে তাকে দেখা না গেলেও বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তার সরব উপস্থিতি। ২৪ বছরের ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতা থেকে এবার ব্যবসায় রাজনীতিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। এফবিসিসিআই নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন।

    রাজনীতি প্রসঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, রাজনীতিতে থাকব না, এমন কোনো ঘোষণা আমি দিইনি। আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। রাজনীতিবিদরা যেভাবে কাজ করেন আমিও সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে, একটু সময় হয়তো লাগবে। রাজনীতি করতে গেলে সুষ্ঠু সুন্দর প্ল্যাটফর্ম দরকার। আশা করি সামনের দিনে তেমন পরিবেশ আসবে।

    তিনি বলেন, আমার নিজস্ব কোনো দল নেই। কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হইনি। স্বতন্ত্র হয়েও থাকব না। আমি মনে করি এই সরকারের কার্যক্রম খুব ভালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। ঢাকায় আনিসুল হক ভালো কাজ করছেন। সব মিলিয়ে দেখা যায় আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে। রাজনীতিতে দেশ এবং দেশের মানুষের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে যারা কাজ করবেন আমি তাদের সঙ্গে আছি।

    একজন নারী হিসেবে গৃহবধূ থেকে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে গেলে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। আমি নিজেও অনেক প্রতিবন্ধকতা পার করে আজকের পর্যায়ে এসেছি। এতে আমার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ব্যবসায় উদ্যোগে সফলের পর এখন সংগঠনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করছি। এটা এক ধরনের যুদ্ধ। নারী কিংবা পুরুষ যার কথাই বলেন না কেন, প্রথমেই মনস্থির করতে হবে আপনি কী করতে চান। এরপর আপনার কাজই গোল নির্ধারণ করে দেবে। আমি দীর্ঘদিন ব্যবসায় যুক্ত থাকার পর এখন সময় এসেছে নেতৃত্বের আসনে বসে আমার মতো উদ্যোমী নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন তাদের উৎসাহ দেওয়ার, সহযোগিতা করার। দেশের ব্যবসায়িক উন্নযনে ভ‚মিকা রাখার। এজন্যই এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। অতীতের অর্জনগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগবে বলে আশা করি।

    তিনি বলেন, উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রথমেই বাধা আসবে নারীর পরিবার থেকে। আমি নিজেও এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। এরপর সমাজ, রাষ্ট্র তো আছেই। অনেকে অনেক ধরনের কথা বলেন কিন্তু যিনি উদ্যোক্তা হয়ে নিজের পথে হাঁটেন তিনি জানেন সমস্যাটা কত বড়। আমার কথা হচ্ছে এসব অজানা বাধার কথা মেনে নিয়েই আমি মাঠে নেমেছি। ফলে আমার সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, আমার মনস্থির করেছি কাজ করবই। আর তা করতে গেলে যত বাধাই আসুক সেটাও উতরিয়ে যাব।
    সমালোচনাকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। বলেন, আমি খুব শক্ত মনের মানুষ। কেউ সমালোচনা করলে আমি আরও বেশি জেদ নিয়ে কাজ করি। সমালোচনা থেকে নিজের ভুল-ত্রুটি থাকলে শুধরে নেয়ার চেষ্টা করি। আসলে মনটাই আসল। আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি আমার স্বকীয়ত্বে বিশ্বাসী। অন্য পাঁচজন কী সমালোচনা করলো তা শুনে চললে আজকে এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না।

    হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, প্রাথমিকভাবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিটা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে চেয়েছিলাম। সেখানে আমাদেরই ব্যবসায়ী সমাজের বড় ভাই আনিসুল হক নির্বাচনে আসায় আমি সরে যাই। আনিস ভাইয়ের ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে আমি অনেক কাজ করেছি। তাছাড়া তার প্রতি সরকারি দলের সরাসরি সমর্থন ছিল। এসব বিষয় চিন্তা করে নির্বাচন করিনি। পরে ভাবলাম নির্বাচিত না হয়েওতো সমাজসেবা করা যায়। আমি আমার ভাবনার জায়গা থেকেই কাজ করতে পারি। সেখান থেকেই ‘মানব কল্যাণে জয়যাত্রা’ – স্লোগানে ‘জয়যাত্রা’ ফাউন্ডেশন গড়ে তুলি। অবশ্য এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সফর করে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সাধারণ মানুষ কী চায়, কেন চায়, কীভাবে চায় এসব বিষয় বোঝার চেষ্টা করেছি।

    নিজের ব্যবসা ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে হেলেনা জাহাঙ্গীর বলেন, মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছে। এরপর পড়াশোনা শেষ করে উদ্যোক্তা হওয়া। প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি যুক্ত। সম্প্রতি গ্রিন ফ্যাক্টরি করার উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি এটা করতে পারব। বর্তমানে আমার সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে পাঁচ-ছয় হাজার কর্মী আছে। ওই যে আগেই বললাম ছোট থেকেই আমি প্রচণ্ড জেদি। আমার ইচ্ছে ছিল মাস্টার্স পাস করব, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া সেটা করতে পেরেছি। আব্বার চাকরি সূত্রে দেশের বিভিন্ন জেলার অনেক স্কুলে আমাকে পড়তে হয়েছে। ফলে অনেক সময় পড়াশোনায় সমস্যাও হয়েছে। একসময় আব্বা চাকরি নিয়ে রাশিয়া চলে যান। তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন বিয়ের অনেক প্রস্তাবও আসছিল। আম্মা সিদ্ধান্ত নিয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় আমি বিভিন্ন জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছিলাম। তখন ভাবলাম আমার স্বামীর কাছ থেকেও সহযোগিতা নেওয়া যায়। তাকে বললাম কিছু একটা করে দিতে। তখন মিরপুরে একটি ফ্যাক্টরি দিয়ে আমার যাত্রা শুরু। এখন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছি।
    এফবিসিসিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, প্রথম প্রথম নির্বাচন করতে এসে এত সাড়া পাব ভাবিনি। অনেককে আমি ফোন দেওয়ার আগে আমাকে ফোন দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছেন। তারা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন। এসব বিষয় খুব ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু, শেষ ভালোর দিকে আমি তাকাতে চাই। যদি শেষ পর্যন্ত ফল ভালো না হয় তাহলে প্রথম ভালোর মূল্য নেই। আমি শেষ ভালোর জন্য কাজ করছি।

    এবারের নির্বাচনে নারী হিসেবে আমরা মাত্র দুইজনই আছি। আমি ও শমী কায়সার। যদিও আমি নিজেকে নারী হিসেবে প্রার্থী ভাবি না। কারণ আমি রাত-দিন কাজ করি। পুরুষদের চেয়ে কম কাজ করি না। তাই আমি আমার ব্যবসায়ী কমিউনিটির কাছে আবেদন রাখব, আপনারা আমাকে আপনাদের পাশে রাখুন। যদি আমাকে দেশের সবচেয়ে বড় এই ব্যবসায়ী সংগঠনে নির্বাচিত করেন তাহলে যোগ্যতা দিয়ে কাজ করে দেখাতে পারব। নারী হিসেবে নয়, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। [LS]

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী