• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    গোপালগঞ্জের নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি ও একজন ময়েন স্যার’

    সংগৃহীত | ২৫ জুন ২০১৮ | ৩:০৮ অপরাহ্ণ

    গোপালগঞ্জের নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি ও একজন ময়েন স্যার’

    পায়ে আর জোর নেই, তবুও হেঁটেই চলাফেরা করেন এখনো গোপালগঞ্জ নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির সাত দশকের অবৈতনিক গ্রন্থাগারিক মঈন উদ্দিন (ময়েন স্যার)।
    এখনো প্রতিদিন সকালে পাঠাগারের তালা খোলেন মঈন উদ্দিন। সদস্যদের বই দেওয়া থেকে শুরু করে পাঠাগার পরিচ্ছন্ন করেনও তিনি।
    এই পাঠাগারকে ধ্যানজ্ঞান করেই তরুণ বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সও পার করছেন। পরিবারের চেয়ে বেশি সময় তিনি দিয়েছেন এই পাঠাগারে। বই পড়ার অভ্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান এই মনুষটি।
    ১৯৫৬ সাল থেকে তাঁর হাত ধরেই বেড়েছে এই পাঠাগারের কলেবর। শহরে গড়ে উঠেছে একটি পাঠক সমাজ। আলোর পরশ পেয়েছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সবার চোখেই নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি আর ‘ময়েন স্যার’ অভিন্ন সত্তা। গোপালগঞ্জের এস এম মডেল স্কুল থেকে ১৯৯০ সালে অবসর নেন মঈন উদ্দিন। কিন্তু পাঠাগারের প্রতি দায়িত্ব শেষ করেননি এই বৃদ্ধ বয়সেও। তিনি বেঁচে থাকতে চান এই পাঠাগারের মধ্যে, মানুষের পাঠাভ্যাসের মধ্যে।
    এই লাইব্রেরির আদি নাম ছিল করোনেশন লাইব্রেরি। ১৯২০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষে ভারতজুড়ে উৎসব উদ্যাপনের আয়োজন করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। এ জন্য ভারতের সব জেলা এমনকি মহকুমা শহরে অর্থ পাঠানো হয়। গোপালগঞ্জের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক তখন স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করেন। নাট্যামোদী ১২ সদস্যের আগ্রহে সিদ্ধান্ত হয় একটি থিয়েটার ক্লাব গড়ে তোলার। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন থিয়েটার ক্লাব। সেখানে শহরের সুশীল সমাজের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ একটি পাঠাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ক্লাব পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় করোনেশন পাবলিক লাইব্রেরি। শুরু থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পাঠাগারটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন প্রতাপ বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তি। এরপর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এসময় পাঠাগারের মায়ায় জড়ান ময়েন স্যার। নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির নামকরণেও ছিল মঈন উদ্দিনের বিশেষ ভূমিকা।
    পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগে শহরে মুসলিম লীগ নেতাদের দাপট ছিল। তাঁরা করোনেশন পাবলিক লাইব্রেরির নাম বদলে পাকিস্তানের বিশিষ্ট কবি ইকবালের নামে নামকরণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হতে দেননি মঈন উদ্দিন। তিনি বাংলা ভাষার কোনো কবির নামে পাঠাগারের নামকরণের দাবি তোলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করা হয়। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে পাঠাগারের নতুন নাম হয় নজরুল পাবলিক লাইব্রেরি।
    এই পাঠাগার প্রেমীহয়ে ত্যাগ করেছেন বিলাসী জীবনের হাতছানি। কলকাতা থেকে এসেছিল বাহারি চাকরির আহ্বান। ‘দ্য ক্যাভেন্ডার্স’ নামে একটি ব্রিটিশ বিপণন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব পেলেও পাঠাগারের প্রেমে তা উপেক্ষা করেছিলেন মঈন উদ্দিন।
    ফলে জীবন-বাস্তবতা তাঁকে ঠেলে দেয় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে। শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তখন এগিয়ে এসে মঈন উদ্দিনের চাকরির ব্যবস্থা করেন এসএম মডেল স্কুলে। মাত্র ১০০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। বাকি সময় কাটিয়েছেন পাঠাগারে।
    এই পাঠাগার টিকেয়ে রাখতেও তার অবদানের কমতি ছিলনা। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে এক ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় করোনেশন থিয়েটার ক্লাব ও পাঠাগার। তখন পাঠাগারটি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করা হয় মডেল স্কুল সড়কের একটি টিনের ঘরে। এটি ছিল মঈন উদ্দিনের তৎকালীন বাসস্থানের একটি অংশ। বই ও আসবাবের স্থান সংকুলানের অভাবে পাঠাগারটি সরানো হয় ভাষাসৈনিক পরেশ বিশ্বাসের বাড়িতে। কয়েক বছর এভাবেই চলে পাঠাগারের কার্যক্রম। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? স্বপ্নের পাঠাগারের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মঈন উদ্দিন। এ ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শহীদ হামিদ খান। স্থায়ী পাঠাগার স্থাপনের জন্য মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ জমির ব্যবস্থা করেন তিনি। মঈন উদ্দিনের সম্বল তখন মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা। ওই টাকায় তিনি একটি টিনের ঘর তৈরির পরিকল্পনা নেন। কিন্তু বাধা দেন মহকুমা প্রশাসক। তিনি সেখানে একতলা ভবন তৈরির পরিকল্পনা করেন। বাজেট ৬০ হাজার টাকা। মঈন উদ্দিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এত টাকা কোথায় পাবেন? তখন তাঁকে অভয় দেন হামিদ খান। সরকারি কোষাগার থেকে কিছু টাকার সংস্থান হয়। তৎকালীন ঠিকাদার ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সাইদ আলী খানকে এই ভবন নির্মাণকাজের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন হামিদ খান। সাইদ আলী খান রাজি হয়ে যান। এভাবেই নির্মিত হয় নজরুল পাবলিক লাইব্রেরির বর্তমান ভবন।
    পরিবারের সদস্যদের গর্বের কমতি নেই এই মানুষটিকে নিয়ে। স্ত্রীর জাহান জেব বানু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্বামীকে নিয়ে গর্বিত। চার ছেলের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বাবাকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই সন্তানদেরও। শহরের মধ্যপাড়ার এই পরিবারটির বাস।
    শেষ জীবনে এসে মঈন উদ্দিন এখন খুঁজে ফিরছেন একজন মানুষকে, যিনি তার স্বপ্নের পাঠাগারটিকে মনে-প্রাণে ভালোবাসবেন। যাঁর হাত ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এমন একজনকে পাঠাগারের দায়িত্ব দেবার প্রত্যাশা নিয়ে রয়েছেন তিনি।


    Facebook Comments


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673