বৃহস্পতিবার ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ছাত্রলীগের এই চেহারাই আমরা চাই

আহমেদ আল আমীন   |   মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২০ | প্রিন্ট  

ছাত্রলীগের এই চেহারাই আমরা চাই

ছাত্রলীগের সমালোচনার শেষ নেই। ক্যাম্পাসে অস্ত্রের ঝনঝনানি। টেন্ডারবাজি, রক্তপাত, মাদক ও সন্ত্রাস। হত্যা, ধর্ষণ আর ছিনতাই। গত দুই বা আড়াই দশকে এসব মুখস্ত অপকর্মেই ছাত্রলীগের নাম জড়িয়েছে বেশি।
আধিপত্য বিস্তারের কথিত লড়াইয়ের ফলে অস্ত্রের শব্দে ক্যাম্পাসে পাখিদের কলরব শোনা যায়নি বহুদিন। শিক্ষালয়ে ঠাসঠুস গোলাগুলি। হলে হলে, রুমে রুমে দেশীয় অস্ত্র, রড ও লাঠি। হল ও সিট দখল এবং ভাঙচুর। কতদিন মনে হয়েছে আধুনিক স্টাইলে চর দখলে নেমেছে সবুজ, অবুঝ, কিছু কাঁচা প্রাণ। ভ্রাতৃপ্রতীম ও বন্ধুপ্রতীম সংগঠনের সাথে, কখনোবা অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে কত মায়ের বুক হয়েছে খালি; আহাজারি ও রোনাজারি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।
এভাবেই নিত্য নিরস খবরের শিরোনাম হয়েছে ছাত্রলীগ। আর আলোচনায় এসে নিষ্ঠুর সমালোচনার শিকার হয়েছে সংগঠনটি। দাদাগিরি ফলানো, বেয়াদবি, উচ্ছৃঙ্খলতা ও বখাটেপনার পাশাপাশি হোটেলে বাকি ও ফাও খাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ছাত্রলীগের এই রূপটিই ক্যাম্পাসে দেখে এসেছে আমাদের প্রজন্ম। ফলে মনে হতে পারে, ছাত্রলীগের শরীরে রক্ত নেই, মাংস নেই, হৃদয় নেই, কিংবা ভালোবাসা। অনুভূতি ও সহানুভূতিহীন পোড়া কাষ্ঠ এক।
এই ছাত্রলীগের ধূলোর আস্তরণে কালিমায়, ধূলোময় হয়ে পড়ে ছাত্রলীগ নামের বৃক্ষটির গোড়া। আসল ছাত্রলীগ। পুরনো ছাত্রলীগ। এই কদর্য রূপের আড়ালে পড়ে গিয়েছিলো এক সময়কার স্বর্ণময়, বর্ণময় ও গৌরবোজ্জ্বল সেই ছাত্রলীগ। এই ছাত্রলীগের কুৎসিত চেহারায় যেন কালো হয়ে গিয়েছিলো আয়নাটাই। এই ছাত্রলীগের মধ্যে আমি পঁচা নর্দমা দেখি।
কিন্তু, এই ছাত্রলীগই আসল ছাত্রলীগ নয়। কিংবা বায়ান্ন বা ঊনসত্তরের ছাত্রলীগও নয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথ কাঁপানো ছাত্রলীগকেও এর মাঝে খুঁজে পাই না। মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ সংগঠনের কর্মীদের উত্তরসূরিও এরা হতে পারে না। বুকের রক্ত ঢেলে দেশের পতাকা বানানো হাজারো শহিদের গর্বিত উত্তরাধিকার এরা নয়।
কিন্তু, এই দুর্যোগে ছাত্রলীগের নতুন চেহারা দেখে মন ভরে গেছে। অবশ্য নতুন বলছি কেন, এটাই তো ছাত্রলীগ। পূর্বোল্লিখিত ছাত্রলীগ আসল ছাত্রলীগ নয়, তা আগেই বলেছি। এটাই তো নতুন করে আসল চেহারায় ফিরে আসা। ধুয়ে মুছে আয়নার সামনে এবার ছাত্রলীগ।
আমরা দেখছি, ছাত্রলীগ এখন ত্রাণ দিচ্ছে, ফ্রি বাজার-সদাই দিচ্ছে, মানুষকে দুর্যোগে সচেতন করে তুলছে। কৃষকের পাকা ধানও কেটে দিচ্ছে ছাত্রলীগ।
বৈশাখের এই রৌদ্রতাপে, কাঁচা আম পেড়ে, কলা পাতায় ছেঁচে রসালো বানানো। সাথে মরিচ পোড়া, পিঁয়াজ, সরিষার তেল ও চিনি। একটুখানি তেঁতুল হলে ভালো হয়। রোদ ঝলমলে গাছতলায় ছমছমে খসখস দুপুরে আলো-ছায়ার মাঝেই তো স্বাভাবিক ছিলো অবস্থান।
কিন্তু না, দুষ্টু দুপুরের হাতছানি উপেক্ষা করে এই দাবদাহে ওরা হাতে তুলে নিয়েছে কাস্তে। মাথায় কিংবা কোমরে গামছা বেঁধে নেমে পড়েছে মাঠে। সে সময় নিশ্চয়ই ওদের তেষ্টা পেয়েছিলো বুকের ছাতিতে। দরদর করে ঘাম ঝরে পড়েছিলো মাথা থেকে পায়ে। সে সবে দৃষ্টিপাত না করে, পাক্কা কৃষকের মতোই মাঠে থেকে গিয়েছে, কাস্তে চালিয়ে ধান কেটে, মাথায় বয়ে, ঘাড়ে করে পৌঁছে দিয়েছে কৃষকের ঘরে। পুরো চিত্রকল্পটি ভেবে এক অদ্ভূত ভালোলাগায় ভরে গেছে হৃদপিণ্ডের চারপাশটা।
মনে করতে চাই, বিশ্বাস রাখতে চাই, লোক দেখাতে নয় বরং স্বভাবগতভাবেই এই কাজটি করছে ছাত্রলীগ। এই ছাত্রলীগই আমাদের পরিচিত, এই চেহারাই তো আমরা চাই। কিন্তু এই চেহারায় ধূলোর আস্তরণ পড়ে, একদা কালিমায় কুৎসিত হয়ে গিয়েছিলো। ধূলো অপসারণ করতে হবে এভাবেই। এই ছাত্রলীগের মাঝে আমি বাংলাদেশকে দেখি। এই ছাত্রলীগকে যারা নিজ কর্মে বিতর্কিত করেছে, তারা ছাত্রলীগের কর্মী হতে পারে না। তারা হয় অনুপ্রবেশকারী, নয়তো সুবিধাভোগী; তারা সংগঠনের আদর্শকে ধারণ করতে পারে নি। তারা না ছাত্রলীগ, না মানুষ। তারা এসেছিলো আখের গোছাতে। যে ফল মাতৃগাছের অনুরূপ স্বাদ বহন করে না; তারে কি আদৌ ওই গাছের ফল বলা যায়?
ছাত্রলীগের ব্যাপারে পূর্বের ধারণাই পাল্টেট দিতে হবে। বায়ান্ন্, একাত্তর কিংবা নব্বইয়ের ভূমিকায় ফিরতে হবে তাকে।
আহমেদ আল আমীন: প্রতিশ্রুতিশীল লেখক

Facebook Comments Box


Posted ৭:২০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১