• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    ছোট গল্পঃ যে গল্পের নাম নেই

    মাহবুব হাসান বাবর | ০৪ জুলাই ২০১৭ | ৪:১২ অপরাহ্ণ

    ছোট গল্পঃ যে গল্পের নাম নেই

    তখন আমার বয়স তেরো। এইটের ছাত্র। আই লাভ ইউ চিঠি লেখা কিংবা বলার সময় তখন। একথা এজন্যই বললাম, এখন যেমন ক্লাস এইট- নাইনের ছেলে মেয়েরা এই বয়সে ভালবেসে নির্জন কুটির খোঁজে। আর আমাদের সময় খুজতাম আই লাভ ইউ চিঠি কিংবা বানী। যাহোক রানুদি তখন ম্যাট্রিক দেবে দেবে ভাব। ওনি প্রায়ই আমাদের বাড়ী আসতেন। এসেই মাকে বলতেন,
    ঃ কইগো কাকীমা আমার জামাই কই! আজতো সারাদিনই দেখলামনা।
    আর এই জামাইটা ছিলাম আমি।
    রানুদির কন্ঠ শুনেই খাটের নিচে গিয়ে লুকাতাম। যতক্ষন রানুদি আর মা গল্প করতেন ততক্ষণ খাটের নিচেই লুকিয়ে থাকতাম। দিদি চলে গেলে মুখ লাল করে বের হতাম। মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে ভাবতাম, রানুদি সত্যিই আমাকে জামাই বানাবে নাকি? কেমন একটা রোমান্স অনুভব করতাম। মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম তাকে। প্রেম কিংবা প্রেমের সংঙা আমি আজও জানিনা। কিন্তু দিনদিন তার প্রতি কেমন যেন একটা ভাললাগা সৃষ্টি হতে থাকলো। কোন এক ঈদে রানুদি আমার হাত ধরে বলেছিল,
    ঃচলনা কিশোর আমরা নদীর পাড়ে ঘুরে আসি! আমার অমত থাকায় যাওয়া হয়নি। মনে মনে ভাবলাম হয়তো যাওয়া হবেওনা কোনদিন। কেন যেন সেদিন নিজেকে প্রেমিক মনে হয়েছিলো। দিন যত গড়াতে থাকলো আমাদের সম্পর্কটা কেমন যেন গাঢ় হচ্ছিল।
    রানুদি ম্যাট্রিক পাশ করে তখন কলেজে পড়ে। বাহারী জামা আর সৌন্দর্যে তাকে চমৎকার লাগতো। শ্যাম বর্নের মেয়েরাও যে এতো সুন্দর হয় তা রানুদিকে না দেখলে বোঝা যাবেনা। চোখ দুটিতে কেমন যেন একটা মায়াবী টান ছিল।
    আমি তখন টেন- এ পড়ি। রানুদি অনার্সে। আমি অংকে বরাবরই ভীষন কাঁচা। মা একদিন বললেন,
    ঃ কিরে তুই রানুর কাছে অংকটা নিয়ে গেলেতো পারিস। ম্যাট্রিক পাশ করবি কিভাবে বল? আমি ওকে বলে দেবো, কাল সকাল থেকে তুই ওদের বাড়ী যাবি।
    আমি চুপচাপ শুধু শুনলাম। কিছু বললাম না। রানুদি কমার্সের স্টুডেন্ট। অংক টংক ভালই পারে। মার কথাটা মনে ধরেছে। মন্দ বলেনি। কিন্তু রানুদির সামনে গেলে কেমন যেন একটা শিহরন জাগে। নিজেকে প্রেমিক প্রেমিক মনে হয়।
    পরদিন মা ঠিকই ঠেলে পড়তে পাঠালেন। রানুদির বাড়ীতে গিয়ে ডাক দিতেই কাকীমা রান্না ঘর থেকে বলে উঠলো,
    ঃআয়রে কিশোর। রানু ঘরেই আছে, যা ভেতরে যা।
    ঃকাকীমা রান্না করছো বুঝি? কী রান্না করছো?
    ঃ হ্যারে বাবা। রুটি আর ভাজি। তোকে খেতে দেবো?
    ঃনা কাকীমা খেয়েই বের হয়েছি।
    কিশোর এবার ঘরে ঢুকলো। পড়ার ঘরে।
    রানুদির ঘরে ঢুকলে সিনেমা হল মনে হয়। সারা ঘর জুড়ে সিনেমার পোস্টার। নায়ক- নায়িকা আর সিনেমার আর্টিস্টদের নানা ভঙ্গিমায় জোড়া নান্দনিকতায় দেয়ালটা জলজল করছে। কিছু ভিউকার্ডও লাগানো।
    ঃ কিরে কিশোর এসেছিস। কাকিমা কাল এসে বলে গেলো। ভাবলাম তুই আসবিনা। তোরযে লজ্জা।
    ঃ না দিদি, অংকটা মাথায় ধরেনা। আমার বুঝি আর ম্যাট্রক পাশ করা হবেনা। তাই ভাবছি পড়াশুনা বাদ দিয়ে সার্কাস দলে চলে যাবো।
    ঃ কি বলিস এসব। আমার জামাই সার্কাসে যাবে কেন? আমার জামাই হবে মস্ত বড় অফিসার। রানুর কথা শুনে কিশোর লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলো।
    ঃ আচ্ছা বই বের কর
    কিশোর বই বের করে অংক করতে থাকে। পাশে রানু নিজের পড়া করে আর মাঝে মাঝে কিশোরকে অংক বলে দেয়, কোনটা আবার পুরোপুরি বুঝিয়ে কিশোরকে করতে দেয়।
    কিশোর অংক করার ফাঁকে চুপিচুপি রানুর দিকে তাকায়। কেনযে তাকায় তা কিশোরই ভাল জানে। একদিন রানু বললো,
    ঃ কিরে কিশোর তুই বারবার আমার দিকে তাকাস কেন? আমার মুখে কি চাঁদ নেমে এসেছে নাকি? কিশোরের মুখটা লাল হয়ে ওঠলো।
    ঃনা দিদি, তুমি চাদের চেয়েও সুন্দর
    ঃ ওরে আমার নাগররে এদেখি কথাও শিখে গেছে। দুজনেই কাচভাঙ্গা শব্দের মতো খিলখিল হেসে ওঠলো।
    কিশোরের ম্যাট্রিক পরীক্ষা চলে এলো, রানুর কাছে পড়াতে বেশ ভালই লাভ হলো। অংকটা মোটামুটি পার পেয়ে যাবে মনে হয়।
    ওরা ততদিনে খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেছে। জড়তাও কমেছে কিশোরের। বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে দুজন একসাথেই থাকে অনেকটা সময় । ইদানিং বড় রাস্তা ধরে হাটতেও যায় কখনও কখনও। একদিন হাটতে হাটতে কিশোর রানুকে বললো
    ঃ রানুদি একটা কথা বলবো কিছু মনে করবানাতো?
    ঃ না মনে করবোনা বল!
    ঃ আচ্ছা তুমি কি কারো সাথে প্রেম করো?
    রানু হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বললো,
    ঃআমি কালো। মা কালির মতো দেখতে। আমাকে আবার কে ভালবাসবেরে?
    ঃ না দিদি সত্যি আমাকে বলো। আর তুমিতো কালো নও। অনার্সে পড়লেতো সবাই প্রেম করে।
    ঃ কে শিখিয়েছে এসব তোকে। অনার্সে পড়লে প্রেম করে? আচ্ছা তুই সত্যি করে বলতো, তুই কি কাউকে ভালবাসিস?
    কিশোর চুপচাপ। অনেকক্ষণ চুপচাপ।
    ঃ কিরে কিশোর কথা বলিস না ক্যান? সত্যি করে বল!
    ঃ হ্যা দিদি আমি ভালবাসি। কিশোর খুব আস্তে উত্তর দিলো।
    ঃ কাকে, কি পড়ে সে? ও তাহলে এই ঘটনা। সাবাস কিশোর! তুইতো তাহলে খুব সিরিয়াস হয়ে গেছিস।
    এবার কিশোর বলে ওঠলো,
    ঃআমিতো তোমাকে ভালবাসি। বলেই রানুর হাত ধরে ফেললো।
    ঃ এ কি বলছিস কিশোর। আমিযে তোর বড়। তুই আমার বেশ ছোট। এগুলো আমাদের সমাজে হয়না! দুজনই থমকে যায়। কিছু সময়ের জন্য স্তব্দ হয়ে যায় ওদের পৃথিবী।
    একসময় রানু বললো,
    ঃশোন এগুলো পরে দেখা যাবে। এগুলো ভেবে এখন তোর কাজ নেই। তোর পরীক্ষা কিশোর। ঠিকমতো পড়- ঠিকমতো পরীক্ষা দে।
    দুজনে বড় রাস্তা হয়ে নদীর পাড় পর্যন্ত হেটে গিয়েছিল। সূর্যাস্তের লাল অাভা এসে লাগছিলো রানুর মুখে। চোখ দুটি কেমন জলজল করছিলো কিশোরের।কোন কথা নেই দুজনের। নীরবে নিস্তব্দে বিপরীতমুখী হয়ে দাড়িয়ে রইলো অনেকক্ষন।
    রানু বললো,
    ঃচল সন্ধা হয়ে আসছে বাড়ি ফিরি
    ঐ বিকেলটা রানু এবং কিশোরকে খুব আপন করেছিল, করেছিল পরও।
    আসলেই কখনও কখনও প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য জীবনকে বদলে দেয়। বদলে যায় মানুষের প্রকৃতিও। কিশোর আর রানু দুজনই বদলে গেলো। কিশোর হয়ে ওঠলো প্রেমিক আর রানু প্রেমিকা।
    ম্যাট্রিক পরীক্ষা চলছে কিশোরের। আর তিনটে পরীক্ষা শেষ হলেই কিশোরের আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নগুলো হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। রাতের পড়া শেষে বিছানায় গিয়ে কত স্বপ্ন নিয়ে ঘুমায় কিশোর। মা বাবার আশা পূরন করবে। বৃদ্ধ বাবার ভয়ংকর এ্যাজমা। মাঝেমাঝে এমন শ্বাসকষ্ট হয়যে দম বন্ধ হয়ে যাবার যোগাঢ়। মুদি দোকানের বেচাকেনাটাও ভাল। কিন্তু দুদিন দোকানে যায়- দুদিন যেতে পারেনা। বড় ভাই বৌ বাচ্চা নিয়ে শহরে থাকে। বাবার অমতে বিয়ে তাই সম্পর্কটা ভাল নয়।
    তাই কিশোর ভাবে পড়াশুনা শেষ করে ভাল চাকরী করলেই সংসারের দায়িত্ব সে বুঝে নেবে। এসব ভাবতে ভাবতে রানুদির মুখ ভেসে ওঠে। তাকে সে ভালবাসে। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব! সমাজ- সংসারের যাতাকলে এটা আদৌ হয়ে ওঠবেনা। কিন্তু কিশোরের ভালবাসা কিংবা প্রেম সংক্রান্ত প্রথম নারীটির নাম রানুদি। কৈশর এবং যৌবনে যে নারিটি তাকে শিখিয়েছিল জীবনের হিসেব নিকেশ। সে আর কেউ নয়- রানুদিই।
    সকাল থেকে রানুদির বাড়ীতে বেশ লোকজনের আনাগোনা। পরীক্ষা দিতে যাবার সময় প্রতিদিনই তাকে সে বলে যায়।
    ঃমা! আজ রানুদির বাড়ী এতো মানুষ কেন?
    ঃআজ রানুকে দেখতে আসবে
    ঃ কেন রানুদির কি হয়েছ? কাল বিকেলেইতো কথা হলো।
    ঃ আরে ওর বিয়ের জন্য লোক আসবে। তুই তাড়াতাড়ি রেডি হ। তোর পরীক্ষার সময় হয়ে যাচ্ছে।
    কিশোরের বুকটা কেমন যেন হুহু করে ওঠলো। রানুদি চলে যাবে? বুকটা ভারী হয়ে ওঠলো। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।
    একসময় নিজেকে সামলে নিয়ে রেডি হয়ে পরীক্ষা দিতে গেলো। আজ আর যাবার সময় রানুদিকে বলে যাওয়া হলোনা। সারা রাস্তায় রানুর কথা ভাবতে থাকলো।পরীক্ষার হলে বারবার রানুদির মুখ ভাসছিল। কত স্মৃতি তার সাথে।বুক ফেটে কান্না আসছে।
    পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে এসে দেখে রানুদের বাড়ীতে অনেক মেহমান। খাবার হাড়িতে টুংটাং টুংটাং আওয়াজ।
    ঃ কিরে বাবা পরীক্ষা কেমন হলো?
    ঃ ভালো মা। আচ্ছা মা রানুদির কি বিয়ে হয়ে গেছে?
    ঃ না। তবে ছেলে পক্ষের লোকজন এসেছে। ওকে পছন্দ করেছে তারা। বিয়ের দিন তারিখও ঠিক। ছেলের শহরে বিশাল ব্যাবসা আছে। আগামী মাসে বিয়ে।
    তুই হাত মুখ ধুয়ে আয় আমি খাবার দিচ্ছি। কিশোরের চোখ ছলছল করছে। বুকটা ভারী হয়ে আসছে। রানুদি চলে যাবে! ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে।
    ততক্ষনে মা ডাকছে খেতে। কিশোর খাবার ঘরে যেতে থাকলো। ওর খুব রানুদিকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। ইচ্ছে করছিলো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে।
    খাওয়া শেষ করে কিশোর তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। বিছানায় শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লো।
    বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধা নামছে ঠিক তখন রানু কিশোরদের বাড়িতে এলো
    ঃ কাকিমা ও কাকিমা……
    ঃ কে রে রানু। আয় মা, মেহমান কি চলে গেছে?
    রানু চুপচাপ। কিছুক্ষন পরে বললো, হ্যা কাকিমা চলে গেছে।
    ঃ ভাল বরইতো পেলি মা। বিরাট ব্যাবসা শহরে। অনেক সুখেইতো থাকবি। আল্লাহ তোর মঙ্গল করুক।
    ঃ আচ্ছা কাকিমা কিশোর কোথায়? ওর পরিক্ষা কেমন হলো? আজতো বলেও গেলনা!
    ঃ বললোতো ভাল। এসে তোর কথা জিজ্ঞেস করলো। তারপর খেয়ে ওর রুমে সম্ভবত ঘুমিয়েছে। সন্ধা হয়ে গেলো দাড়া ডেকে দিচ্ছি।
    কিশোরের রুমের সামনে গিয়ে মা ডাকলেন
    ঃ কিশোর। এই কিশোর দরজা খোল। সন্ধা হয়ে গেছে। আর দেখ কে এসেছে?
    আচ্ছা মা, কিশোর দরজা খুললে বসে গল্প করো, আমি রান্নাঘরের কাজটা সেরে আসি।
    কিছুক্ষন পর কিশোর দরজা খুলে রানুদিকে দেখে তার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলো। রানুদিও। দুজনেরই চোখের জল পড়তে থাকে। সামলে নিতে না পেরে কিশোরকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে ফেলে রানুদি।
    কি অসম্ভব মানুষের হৃদয় যাতনা। যা নিঃশব্দ বেদনায় নীল হয়ে ওঠে কোনসে পরান! অগ্নিগিরির মতো পুড়ে লাল হয় কোন সে সুখ!
    রানু বাড়ী চলে যায়। কিশোরও আবার দরজায় খিল আটে। দুজনের অব্যাক্ত ভাষা দুজনই জানলো। আর জানলো ঈশ্বর।
    মাস খানেক বাদে রানুদির বিয়ের আয়োজনে শুরু হলো। আতসবাজি আর রঙ্গীন লাইটে ঝকঝক করছে চারদিক। হিন্দি বাংলা গানের সাথে উদোম নৃত্যে মাতোয়ারা আত্মিয় স্বজন। ছেলে বুড়োরা সবাই আনন্দে মাতছে।
    কিশোরের চোখেও জ্বলজ্বল করছে নীল আলো। সানাইয়ের সুরে অপ্রাপ্ত বয়সের একজন কিশোর ক্রমে ক্রমে বয়োঃপ্রাপ্ত প্রেমিক হয়ে ওঠেছে।
    রানুদি চলে যায়। জীবন সংসারের জলে ভেসে যায়।
    আর নিঃশব্দে জলের প্রার্থনা করে কিশোর।
    কিশোর তার নিজের মতো আজন্ম একা হয়ে যায়।


    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী