• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলা

    মো. আবু সালেহ সেকেন্দার | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ | ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ চলা

    মো. আবু সালেহ সেকেন্দার

    জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম-সাময়িক অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এদেশে। তবে অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই এত অল্প সময়ে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্থান করে নিতে পারেনি। একঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষক; আর জীবনের নানা বাঁকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ডালা সাজিয়ে বসা প্রায় অর্ধশতাধিক অধ্যাপকের পদভারেও মুখরিত এই বিদ্যাপীঠ অল্পসময়েই ভর্তিচ্ছুদের প্রথমদিকের পছন্দের তালিকায় নাম লিখিয়েছে। তাই প্রতিবছরই বাড়ছে ভর্তি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। প্রতিযোগিতার শতকরা হারে গত কয়েক বছর ধরে যা হার মানাচ্ছে দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এগিয়ে যাচ্ছে জ্যামিতিকহারে। এই বিদ্যাপীঠের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করেও স্নাতক সম্মান শেষেই চাকরির বাজারের অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায়ও তাদের সাফল্যের হার ঈর্ষণীয়।

    ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে পাসকৃত ২৮ নং আইনবলে কলেজ থেকে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে। তবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শূন্য থেকেই পথ চলা শুরু করেনি। এর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। পাঠশালা থেকেই যার যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ১৮৬৮ সালে। বর্তমান জগন্নাথ ক্যাম্পাস যেখানে অবস্থিত সেই জায়গাতেই এই পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বালিয়াটির জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরী। জগবাবুর পাঠশালাকে ১৮৮৪ সালে কলেজে রূপান্তরিত করেন জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরীর সুযোগ্য পুত্র জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। এবার বিট্রিশ সরকারের নেক-নজর পড়ল এই বিদ্যাপীঠের উপর। ওই বছরই এই বিদ্যাপীঠকে ‘ঢাকা জগন্নাথ কলেজে’ উন্নীত করে। অচিরেই ভারতে খ্যাতিমান বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে এই কলেজ নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। ১৮৮৭ সালে স্কুল ও কলেজ শাখাকে পৃথক করা হয়। তখন স্কুলের নাম হয় ‘কিশোরীলাল জুবিলী স্কুল’। শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে ১৯২০ সালে ইণ্ডিয়ান লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ‘জগন্নাথ কলেজ আইন’ পাস করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘর পুড়েছিল ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে। ১৯২১ সালে জগন্নাথ কলেজকে অবনমন করা হয় ভারতীয় লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ‘জগন্নাথ কলেজ এ্যাক্ট’ পাস করে। এই আইনের ফলে এই বিদ্যাপীঠকে ‘জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ নামকরণ করে এর স্নাতক পর্যায়ে পাঠদানের ক্ষমতা রহিত করা হয়। এই বন্ধ দুয়ার খুলেছিল ওই ঘটনার ২৮ বছর পর। ১৯৪৯ সালে এই বিদ্যাপীঠে পুনরায় স্নাতক পর্যায়ে পাঠদান শুরু হয়।


    ‘৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এই বিদ্যাপীঠের ছাত্র-শিক্ষকরা ছিল আন্দোলন সংগ্রামের পরিচিত মুখ। পাকিস্তানী জেনারেলদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে ঢাকা কলেজ থেকে যেসব ছাত্রকে বিতাড়িত করেছিল এই বিদ্যাপীঠ তাদেরকে আশ্রয় দিতে কুণ্ঠিত করেনি। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল: নূর এ আলম সিদ্দিকী, সৈয়দ শামসুল আলম হাসু, আল মুজাহিদী, রাজিউদ্দিন আহমদ রাজু, কাজী ফিরোজ রশিদ, কে এম সাইফুদ্দিন আহমদ, এম এ রেজা, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাইফুর রহমান, আখতারুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম জিন্নাহ, ফজলে এলাহি মোহন, হুমায়ুন কবির শেলী, মুরাদ আলী, শরীফ, আবুল হাসনাত সারু প্রমুখ। এই তেজোদ্দীপ্ত ছাত্রনেতাদের পেয়ে জগন্নাথ আরো আন্দোলন সংগ্রামে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

    খ্যাতিমান অধ্যাপকরাও জগবাবুর পাঠশালাতে পড়িয়েছেন। একুশের প্রথম সংকলন গ্রন্থ ও মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সম্পাদনা করে যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন সেই হাসান হাফিজুর রহমানও ছিলেন এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষক। সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ইতিহাসবিদ ড. মাহমুদুল হাসান, সাংবাদিক রাহাত খান, আরবীর আ.ন.ম বজলুর রহমান, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, সংগীত শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, ড. শামসুজ্জামান খান, হায়াত্ মাহমুদ, বিক্রমপুরের ইতিহাসখ্যাত লেখক শ্রী যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, গবেষক গোলাম মুরশিদ, মির্জা হারুন-অর-রশিদ প্রমুখ। তবে এই বিদ্যাপীঠকে অনেক শিক্ষকই সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে পাড়ি জমিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে: শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহীদ অধ্যাপক গিয়াসুদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, অধ্যাপক আব্দুস সামাদ, অধ্যাপক দুর্গাদাস ভট্টাচার্য প্রমুখ। মজার বিষয় হচ্ছে, জগন্নাথকে যারা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা পরবর্তীতে প্রায় সবাই খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন। আজও এই ধারা অব্যাহত আছে। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পরও থামে জগবাবুর পাঠশালা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমানো। এই পাড়ি জমানো হয়তো ভবিষ্যতে থামবে যখন জগন্নাথের ছাত্ররাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবে।

    লেখক: শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী