• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    জানতে চাই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা ও বধ্যভূমি-গণকবরের সংখ্যা

    আর কে চৌধুরী | ১৯ ডিসেম্বর ২০২০ | ৮:২৭ অপরাহ্ণ

    জানতে চাই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা ও বধ্যভূমি-গণকবরের সংখ্যা

    মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার ও তাদের দোসররা বাঙালিদের গণহত্যার পর চিহ্ন মুছে ফেলতেলাশ গুম করেছে। বাংলাদেশে অধিকাংশ গণহত্যা ঘটেছে নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের ধারে। ফলে হত্যার চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য নদী বা খালে লাশ ফেলে দেওয়া ঘাতকদের কাছে সহজ ও সর্বোত্তম উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। একাত্তরের নয় মাস দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা এভাবেই গণহত্যার চিহ্ন অনেকটাই মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।


    ইতোমধ্যেই বহু গণকবরের নাম-নিশানা মুছে ফেলে সেখানে দালানকোঠা তোলা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লতাগুল্ম-বনজঙ্গলে ঢাকা পড়ে অযত্ন-অবহেলায় অনেক গণকবর আজ লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আলশামস ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা নির্যাতন ও হত্যার জন্য বিশেষ বিশেষ স্থানও বেছে নিয়েছিল। পাকিস্তানিরা বাঙালি হত্যায় সবসময় বুলেটও ব্যয় করেনি। তারা কখনো বেয়োনেট দিয়ে, আবার কখনো বা ধারালো ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে মানুষ জবাই করেছে। ময়লার ডিপোতে স্থান পেয়েছে মানবসন্তানের লাশ। হত্যার পর হতভাগ্য মানুষের মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে খালে বিলে-নদীতে। যেখানে নদ-নদী ছিল না সেখানে তারা মৃতদেহগুলো মাটিচাপা দিয়েছে। অথবা হতভাগ্যদের যেসব স্থানে মৃতদেহ মাটিচাপা দিয়েছিল, ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই সেসব বধ্যভ‚মি ও গণকবর শনাক্ত করা জরুরি। জেলাভিত্তিক এসব বধ্যভূমি ও গণকবর শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মমতা, নৃশংসতা, নির্যাতন ও হত্যার বহুমাত্রিকতা সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা লাভ সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।


    ১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতিকে মেধাশূন্য করার চক্রান্ত করা হয়। রাজাকার, আলবদর ও শান্তিবাহিনীর সুস্পষ্ট প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের। এ ছাড়া অগণিত বাঙালিকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায় নরপশুরা। রচিত হয় বধ্যভূমি, গণকবর। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো জাতি জানে না শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত তালিকা। ঠিক কতজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল সে সময়। জানা নেই বধ্যভূমি-গণকবরের প্রকৃত সংখ্যা।

    পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা যখন বুঝে গিয়েছিলো তাদের পরাজয় আসন্ন তখন তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা শুরু করেন। কারণ বুদ্ধিজীবীরা হলেন জাতির বিবেক। তাঁরা অন্ধকারে আলো জ্বালান। একটি জাতিকে মেধাগত দিক থেকে এগিয়ে নেন। পাকিস্তানিরা ও তাদের বশংবদরা এটিকে অপরাধ বলে ভেবেছিল। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন তাদের প্রতিহিংসার শিকার। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোয় যখন পাকিস্তানিদের পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে তখনো জোরেশোরে চলে বুদ্ধিজীবী হত্যা। এমনকি পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দুই দিন আগেও বেশ কজন বুদ্ধিজীবীকে চোখ বেঁধে তাঁদের বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর সদস্যরা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁদের চোখ ও হাত বাঁধা ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়।
    পরাধীনতার গ্লানি মুছে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন এ দেশের বুদ্ধিজীবীরা। মুক্তির সংগ্রাম আর বিজয় অর্জনের পথেও বুদ্ধিজীবীদের অবদান ছিল অসামান্য। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তাঁরা পাকিস্তানিদের মুখোশ খুলে দিতে শুরু করেন এবং পাকিস্তানিদের সীমাহীন শোষণ ও বৈষম্যের নানা দিক তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। তাই তাঁরা পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। ৯ মাস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও খুনিরা যখন বুঝে যায় পরাজয় আসন্ন তখন তারা বাঙালি জাতিকে মেধা ও মননে পঙ্গু করে দেওয়ার শেষ অপচেষ্টায় নামে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের ওপর।

    এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব বধ্যভূমি ও গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভও স্থাপন করা হয়নি। শ্রদ্ধা জানানো হয়নি সেখানে প্রাণ উৎসর্গ করা দেশের কৃতী সন্তানদের প্রতি, যা আমাদের জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এর পাশাপাশি অযত্ন, অবহেলা ও সংরক্ষণের অভাবে অনেক বধ্যভূমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। কোথাও স্মৃতিস্তম্ভ করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে সেগুলোর বেহাল অবস্থা। অনেক স্থানে ভেঙে ফেলা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। প্রায় নিশ্চিত করা হয়েছে তার নিদর্শন।

    মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দেশে যে গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল তার প্রমাণ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো। এগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরের প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে উদ্যোগী হবেন তখন তাদের জন্য এসব গণকবর ও বধ্যভূমি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, এতে সন্দেহ নেই। সর্বোপরি দেশের জন্য যারা সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখা জাতি হিসেবেই আমাদের অনিবার্য কর্তব্য।

    বড়ই পরিতাপের বিষয়, এই কর্তব্যটি আমরা যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারিনি। এখনো দেশের সবগুলো গণকবর ও বধ্যভূমি শনাক্ত করা যায়নি। যেগুলো শনাক্ত করা হয়েছে তার সবগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। যেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে তার অনেক গুলোর অবস্থা প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকায় বেহাল। ফলে দেশের গণকবর ও বধ্যভূমির সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। জনবসতির সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও ভূমিদখলের প্রবণতায় দেশের বহু গণকবর ও বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এছাড়া অনেক জায়গায় গণকবর ও বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মাণ বা সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিয়ে শুধু জায়গাটি শনাক্ত করে এ বিষয়ে নির্দেশিকা দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে অনেক জায়গা বেদখল হয়েছে বা দখলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই এখন সময় এসেছে বধ্যভূমি গুলো সংস্কারের।

    লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সভাপতি বাংলাদেশ ম্যাচ ম্যানুফ্যাকচারার এসোসিয়েশন, সদস্য এফবিসিসিআই, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

     

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673