• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন আমি একজন ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

    আর কে চৌধুরী | ০৭ মে ২০২১ | ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ

    জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন আমি একজন ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

    আমার জন্ম ১৯৪১ সালের ৭ মে। সেই হিসেবে ৭ মে আমার ৮০ তম জন্মদিন। এই ৮০ বছরের জীবনে আমার সবচেয়ে বড় যে অর্জন তা হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন।


    ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আমি পুরান ঢাকার কে এল জুবলি স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তখন আমাদের ক্লাশ শিক্ষক ছিলেন কামরুজ্জামান স্যার। তিনি পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হয়েছিলেন। হয়েছিলেন কে এল জুবলি স্কুলের প্রিন্সিপাল। পরবর্তীতে কে এল জুবলি স্কুল কলেজে রূপান্তরিত হলে তিনি কলেজেরও প্রিন্সিপাল হন। তিনি সারা দেশের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। কামরুজ্জামান স্যার ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে আমাদের উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন। আমি ক্লাশ ক্যাপ্টেন হওয়ায় স্যারের সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিলো ভালো। স্যারের নেতৃত্বে আমরা একাধিকবার মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমরা মিছিল সহকারের ভাষা আন্দোলনের জনসভায় যোগ দিয়েছিলাম। ওই দিন বর্তমান যেখানে শহীদ মিনার সেখানের দেওয়াল টপকাতে গিয়ে আমার পরনের শার্ট ও প্যান্ট ছিড়ে যায়। হাত পা ছুলে গিয়ে সামান্য আহতও হই।

    ajkerograbani.com

    এরপর ৬০ এর দশকে আমি সর্বপ্রথম কায়েদ-ই-আজম কলেজ (বর্তমানে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ) এ ছাত্রলীগ থেকে জিএস নির্বাচিত হই। তখন থেকেই আমার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক ও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার নেতা, আমার রাজনীতির হাতে খড়ি তার হাতে। আজীবন তার আদর্শে রাজনীতি করে এখন প্রায় ৮০ বছর বয়সে আমার ভাবনায় শুধু তিনি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার অজস্র স্মৃতি। তার আমৃত্যু সংগ্রাম, অমিত সাহস, অতুলনীয় অর্জন ও উদাহরণযোগ্য ত্যাগের কথা আমাকে সর্বদা ভাবায়।

    বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমি ছিলাম ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কেমন চলছে? কিভাবে করলে ভালো হবে? কোথায় কি সমস্যা আছে? সেসব বিষয় নিয়ে আমরা (তৎকালিন নগর সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক সুলতান, কোষাধক্ষ আমি আর কে চৌধুরীসহ অনেকে) নিয়মিত সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করতাম। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের
    ৭ মার্চ সকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি বাড়ির চারপাশে লোকে লোকারণ্য। আমরা নগর আওয়ামী লীগের নেতারাই বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় নিয়ে আসি। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দেন তখন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফার সঙ্গে আমি মঞ্চের কোনায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই ঐতিহাসিক দিনে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে সর্বদা ধণ্য মনে করি।

    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে সর্বশেষ ২৫ তারিখ ও আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে বললাম, লিডার একটু ক্যান্টনম্যান্ট যাবো। এখানে বলে রাখি ক্যান্টম্যান্টের সঙ্গে আমার ফার্নিচারের ব্যবসা ছিলো। ইস্টার্ন ফার্নিচার নামে আমার একটি ফার্নিচারের প্রতিষ্ঠান ছিলো। আমি ক্যান্টনম্যান্ট গিয়েছিলাম ফার্নিচারের বিল আনতে। আমি ওই দিন ক্যান্টনম্যান্টের পরিস্থিতি একটু অন্যরকম মনে হলো। ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে সংবাদটি পৌছেছিলাম। এর পর শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এই নয়টি মাস। এই নয় মাসকে কেন্দ্র করেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দ বেদনার স্মৃতি। আমি প্রত্যক্ষ করেছি একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়, দেখেছি সহযোদ্ধার লাশ আর আপন সন্তানের নিথর দেহ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার অবর্তমানে বিনা চিকিৎসায় আমার দুটি সন্তানের মৃত্যু হয়।

    যৌবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ঢাকা শহরের গণআন্দোলনের অনেক কর্মকাণ্ডেই ছিল আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল। ২৫ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পর ২৭ মার্চ হেঁটে, রিকশা এবং নৌকায় অনেক কষ্টে নরসিংদী পৌঁছালাম। চলতে লাগলো মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।
    নরসিংদীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্ততি নিলাম ভারত যাওয়ার। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকামীদের প্রথম এবং সহজতম আশ্রয়স্থল ছিল ত্রিপুরার আগরতলা। আগরতলা পৌঁছালাম। পেলাম পরিচিত মুখ মেজর নূরুজ্জামানসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও ঢাকার অনেক সংগঠকদের। আগরতলা মুখরিত হলো মুক্তিকামী বাঙালিদের পদভারে। বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা- যে মামলাকে কেন্দ্র করেই ফাঁসিতে ঝোলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল জাতির পিতাকে। বিস্ময়করভাবে সেই আগরতলাই হয়ে উঠল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ডেডলাইন।

    ’৭১-এর এপ্রিল মাসে আমি আগরতলা যাই। মূলত সেখানেই সর্বজনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ জামাল, আবদুস সামাদ আজাদ, গাজী গোলাম মোস্তফা, কর্নেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যুদ্ধ বিষয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টার। সে দায়িত্ব থেকেই ২৫ এপ্রিল আমি খালেদ মোশাররফ ও কুমিল্লার হোমনার এমপি মোজাফফর আলী প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করি। তার নির্দেশনা গ্রহণ করে কলকাতা থেকে আগরতলায় ফিরে আসি। সংগঠক হিসাবে সে সময়ে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পসহ ত্রিপুরার অনেক ক্যাম্পেই প্রতিনিয়তই যেতে হত আমাকে। সূর্যমনিনগর হাসপাতাল যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা হলো আমার স্কুল জীবনের বন্ধু ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে সে বর্তমানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি। এ সময়ে অর্থাৎ ২৮ মে তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিং এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কথা বলারও সুযোগ হয় আমার।

    মুক্তিযুদ্ধে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন শেষে দেশে এলাম ১৪ ডিসেম্বর মেজর হায়দারসহ হেলিকপ্টারে কুমিল্লায়। পরে নরসিংদী হয়ে ঢাকায় এলাম ১৫ ডিসেম্বর বিকালে। যাত্রাবাড়ীতে সেদিনই বিজয় উল্লাস। সে স্মৃতি সারাজীবন মনে রাখবার মতো- জনতা মেজর হায়দার ও আমাকে মাথায় নিয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় নাচতে থাকে। ১৫ ডিসেম্বর কাটলো আনন্দ আর উৎকণ্ঠায়। অবশেষে এল জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিন ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকা ক্লাব থেকে আনা হলো চেয়ার টেবিল- যে টেবিলে স্বাক্ষরিত হলো বাঙালির বিজয়ের দলিল। ১৬ ডিসেম্বরের সেই দৃশ্য সুখ-স্বপ্ন হয়ে আছে এখনো।

    দেশ স্বাধীন হলো, নেমে পড়লাম স্বাধীন দেশের উন্নয়নের কাজে। নির্বাচিত হলাম যাত্রাবাড়ী ও ধানমন্ডি থেকে কাউন্সিলর। পরবর্তীতে আমাকে করা হলো ঢাকা সিটি কর্পোরেশন প্লানিং ডেভেলপমেন্ট উপ-কমিটির চেয়ারম্যান। সেখানে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে দায়িত্ব পেলাম সাবেক ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) এর চেয়ারম্যান হিসেবে। আমি আমার দায়িত্বকে ইবাদত মনে করেছি এবং রাজধানীর উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছি। সব সময় ছায়ার মতো বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছি। কখনই ভানিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন করা বাংলাদেশে তাকে ঘাতকরা হত্যা করবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ঘাতকরা তার ঘনিষ্টজনদের উপর নির্যাতন চালায়। আমাকে হত্যা করার জন্য কয়েকবার আমার বাড়িতে আক্রমন চালায়। তাদের অর্ত্যাচার থেকে বাঁচতে আমাকে ৬ মাস আত্মগোপনে থাকতে হয়। অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। এভাবেই চলতে থাকে আমার জীবন। লেখা আর না বাড়িয়ে এখানেই শেষ করছি। পরিশেষে, আমার জন্মদিন উপলক্ষে আমি দেশবাসীর দোয়া কামনা করছি।

    আমি একজন ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যেমনি ভাষা আন্দোলনে ও মুক্তিযুদ্ধে যেমনি অবদান রেখেছি তেমনি এই করোনা সংক্রমণের সময়েও করোনা যোদ্ধা হিসেবে সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছি। নিজের সামথ্য অনুযায়ী বাড়িয়ে দিয়েছি সাহায্যের হাত। সেই সঙ্গে সর্ব শক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন বিশ্বকে করোনামুক্ত করে দেন।

    লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সভাপতি বাংলাদেশ ম্যাচ ম্যানুফ্যাকচারার এসোসিয়েশন, সদস্য এফবিসিসিআই এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757