• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম আমাদের জাতীয় সম্পদ

    উপাধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ২:৫৩ অপরাহ্ণ

    ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম আমাদের জাতীয় সম্পদ

    ড. কর্নেল অলি আহমদ, বীর বিক্রম ১৯৩৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার বিখ্যাত ‘কুতুব’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ৷ পিতা মরহুম আমানত ছফা এবং মাতা মরহুমা বদরুননেছা৷ তিনি ১৯৫৭ সালে নিজ উপজেলার গাছবাড়িয়া এন. জি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি. পাস করেন এবং ১৯৬৪ সালে ন্যাশনাল কলেজ, করাচী থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন ৷ বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তিনি একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব ৷ তাঁর মধ্যে রয়েছে অসাধারণ জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং নিজেকে উন্নত করার অতৃপ্ত প্রয়াস ৷ জাতীয় নেতা হিসেবে অনেক ব্যসততা সত্ত্বেও ড. অলি আহমদ ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, “রেভ্যুলিউশন, মিলিটারি পারসোনেল এন্ড দি ওয়ার অফ লিবারেশন ইন বাংলাদেশ” শিরোনামে একটি গবেষণার উপর যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি থেকে পি.এইচ. ডি ডিগ্রি অর্জণ এবং পরবর্তিতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেলোশিপ অর্জন করেন ৷


    এল.এল.বি. অধ্যয়নের সময় তিনি পাকিস্তান আর্মি একাডেমীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে কমিশন লাভ করেন ৷ তিনি ১৯৬৭ সালে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং ১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিযুক্ত হন ৷ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ক্রান্তিলগ্নে তত্কালীন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, লেঃ কর্নেল এম. আর. চৌধুরী এবং মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহন করেন ৷ ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চের রাতে ঢাকায় পাকিস্তান সামরিক জান্তার নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সংবাদ পাওয়ার পর, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সাথে নিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহ করেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হন ৷ মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই যুদ্ধের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয় ৷ জিয়াউর রহমান ছিলেন চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থানরত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সহ-অধিনায়ক এবং ক্যাপ্টেন অলি ছিলেন প্রথম কোয়ার্টার মাস্টার ৷


    ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার ফুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি সেনা বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ হেডকোর্য়াটার স্থাপন করেন ৷ তত্কালীন মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে বৃহত্তর চট্টগ্রামে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন ৷ তিনি সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা, চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং এলাকা, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকা, চকবাজার,কক্সবাজার এবং কালুরঘাট রেডিও ষ্টেশন এলাকায় মেজর জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিভিন্ন অফিসারের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনা জন্য সেনাদল মোতায়ন করেন ৷ বস্তুতঃ তারাই ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে ঐ বিদ্রোহের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং বর্তমান আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর ভীত রচনা করেন ৷ ২৭শে মার্চ ১৯৭১ তিনি মেজর জিয়াউর রহমানকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেন৷

    যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি কালুরঘাট, মীরেরসরাই, মসত্মাননগর, করেরহাট, তুলাতুলী, হেয়াকু, চিকনছড়া, রামগড় এবং বেলুনিয়ার প্রসিদ্ধ যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন ৷ পরবরতী পর্যায়ে এপ্রিল মাসেই তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের (বেলুনিয়া, ফেনী নদী থেকে করেরহাট, চট্রগ্রাম পর্যনত্ম এলাকার) সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন ৷ ঐ অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা তাকে প্রদান করা হয় এবং তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সাব-সেক্টর কমান্ডার ৷ স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনিই সর্বপ্রথম সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে “বীর বিক্রম” খেতাবে ভূষিত হন ৷ ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে প্রসিদ্ধ ‘জেড ফোর্সের’ প্রথম বিগ্রেড মেজর হিসেবে তিনি নিয়োগ প্রাপ্ত হন এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাঙ্গালী অফিসারদের মধ্যে একমাত্র “ব্রিগেড মেজর” হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷

    ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন ৷ সহ-অধিনায়ক হিসাবে তিনি ১৯, ৯, ১০ এবং ৬ষ্ঠ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন ৷ চাকুরী জীবনে বিশিষ্ট অবদানের জন্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বি.ইউ, পিএসসি এবং লেঃ জেঃ মীর শওকত আলী, বি.ইউ, পিএসসি ক্যাপ্টেন অলি আহমদের বাত্সরিক গোপন প্রতিবেদনে একাধিকবার “অনন্য অসাধারণ অফিসার” এবং “সেনাবাহিনীর একজন উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ সম্পদ” হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেন৷

    অলি আহমদ ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লে. কর্নেল হিসাবে পদোন্নতি পান এবং সৈয়দপুরে অবস্থানরত ২৪তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম অধিনায়ক হিসাবে তাকে নিযুক্ত করা হয় ৷ অতঃপর তিনি সেনা সদর দপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার-১ (অপারেশন) হিসাবে নিযুক্ত হন ৷ পরবর্তীকালে তিনি সেনাপ্রধানের অফিসে, ডি.সি.এম.এল.এ. সশস্ত্রবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডারের অফিস, সি.এম.এল.এ. এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় পদায়িত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন ৷ ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে অলি আহমদ কর্নেল পদে উন্নীত হন ৷ ১৯৭৫ সাল হইতে ১৯৭৭ সাল পর্যনত্ম সামরিক বাহিনীতে ১৯টি বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ৷ কর্নেল অলি এই বিদ্রোহ দমনে এবং দেশে শানত্মি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন৷

    শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দীর্ঘ দিনের সহযোগী এবং বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বঙ্গভবনে থাকা অবস্থায় পর্দার আড়ালে থেকে ড. অলি আহমদ নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, যা পরবর্তীতে বি.এন.পি. হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ৷ সমগ্র দেশে বিএনপিকে সুসংগঠিত করার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন ৷ তিনি পার্টির অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা ৷ কর্নেল অলি আহমদ রাজনীতিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে সামরিক বাহিনী হতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে অবসর গ্রহণ করেন যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বিএনপিতে যোগদান করেন । ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কর্নেল অলি আহমদ যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পান এবং সামরিক আইন জারী হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল ছিলেন৷

    তিনি প্রথম ১৯৮০ সালের মার্চে, দ্বিতীয়বার ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয়বার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী, চতুর্থবার ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, পঞ্চমবার ২০০১ সালের ১ অক্টোবর এবং ৬ষ্ঠবার ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ৷ ১৯৮১-১৯৮২ সালে লেঃ জেঃ এইচ.এম. এরশাদ এর স্বৈরশাসনের সময় বি.এন.পির অধিকাংশ প্রবীন নেতা দল ত্যাগ করে এরশাদের সাথে যোগ দেন ৷ কিন্তু ড. অলি আহমদকে কোন মূল্যেই স্বৈরশাসকদের দলে যোগদান করানো সম্ভব হয় নাই৷ তিনি সবসময় তার আত্মমর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন ৷ তিনি রাজনৈতিক জীবনে সর্বদা নিজস্ব নীতিতে অবিচল থেকেছেন এবং কখনও চাপের মুখে মাথা নত বা অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি ৷ ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যনত্ম স্বৈরশাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিবাদের কারণে তিনি দুইবার কারাবরণ করেন ৷ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বি.এন.পি’কে ঐক্যবদ্ধ রাখার ব্যাপারে, তিনি রাতদিন পরিশ্রম করেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বেগম খালেদা জিয়াকে বি.এন.পি.’র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ৷ দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ফলে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পথ প্রশসত্ম হয় ৷ সুদীর্ঘ নয় বত্সর স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব, তার আনত্মরিকতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বি.এন.পি-র একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন৷ তিনি ১৯৮৪ সালে দলের বিএনপি’র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন৷

    ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বি.এন.পি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করার পর অলি আহমদ পূর্ণ মন্ত্রী হিসাবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৬ সালের মার্চ পর্যনত্ম তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন৷ যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে তিনি অনেক যুগান্তকারী পদপে গ্রহণ করেন, সফলতা এবং দক্ষতার সাথে মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন ৷ প্রকৃতপক্ষে তিনিই বাংলাদেশে আধুনিক সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের রূপকার৷ ঢাকা মহানগর হতে দেশের প্রতিটি জেলার সাথে হাইওয়ে নির্মান এবং উপজেলার সাথে সংযোগ স্থাপনকারী৷ তাঁর সময়ে দেশের বড় বড় সেতুগুলি নির্মিত হয় বা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যেমন- যমুনা সেতু, (যার প্রায় ষাট শতাংশ কাজ তার সময় সম্পন্ন হয়,) দাউদখান্দি সেতু, রূপসা সেতু এবং ভৈরব সেতুর নাম উল্লেখযোগ্য৷ ঐ সময়ে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংক এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের প্রবল চাপ উপো করেন৷ পানত্মরে, তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসি, বিআরটিএ\’তে নতুন নতুন সংস্কারের মাধ্যমে মৃত প্রায় সংস্থাগুলির লোকসান হ্রাস করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপানত্মরিত করেন৷ এর মাধ্যমে কর্নেল অলি আহমদ একজন প্রশাসক হিসেবে তার দক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিনত্মাধারা প্রদর্শন করেছেন৷

    ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের পর তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন ৷ ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ১০ দিন ছিল পুনর্বাসনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐ সময় প্রায় এক ল পঁচিশ হাজার পুরুষ ও মহিলা প্রাণ হারান৷ চট্টগ্রামের সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সর্বপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল৷ বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছিল লন্ডভন্ড অবস্থায়৷ সমুদ্র উপকূল এলাকায় প্রায় ২০-৩০ ফুট উচ্চ জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল৷ এমনকি কেউ কারো খোঁজ নেওয়ার মত মানসিক অবস্থায় ছিলেন না৷

    মৃতদেহগুলিকে দাফনের জন্য কাউকে পাওয়া যায় নাই৷ কারো ঘরে খাবার ছিল না, ছিল না বিদু্যত্, ছিল না বিশুদ্ধ পানি৷ ৩০শে এপ্রিল তিনি নিজে সারা রাত্রি চট্টগ্রাম বন্দর এবং রেলওয়ে ষ্টোর পাহারা দেন৷ অবশ্য পরে সামরিক বাহিনী এবং পুলিশের সদস্যরা এই দায়িত্ব পালন করেন৷ এমত অবস্থায়, তিনি আনসার এবং গ্রাম্য পুলিশের মাধ্যমে প্রথমে মৃতদেহগুলির দাফন এবং সত্কারের ব্যবস্থা নেন৷ একই সাথে ঐ কঠিন সময়ে তিনি একাকি চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত অন্যান্য অফিসার এবং কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে অত্যনত্ম দতার সাথে রাত দিন পরিশ্রম করে ৭ দিনের মধ্যে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনেন৷ তাকে সর্বোতোভাবে সাহায্য করেন স্ব-স্ব এলাকার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন সত্মরের জনপ্রতিনিধি এবং চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত জনদরদী বিত্তবান ব্যক্তিরা ৷ পরবর্তীতে ঢাকা থেকে কয়েকজন মন্ত্রী এবং সরকারী কর্মকর্তা বিভিন্ন উপজেলায়/থানায় রিলিফ সামগ্রী বিতরণের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন৷ প্রায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার পর বৈদেশিক সাহায্য আসতে শুরু হয়৷ তাঁর কাজ দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়৷

    ১৯৯৩ সালে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা শরণার্থী সমস্যার সমাধান এবং সশস্ত্র শান্তি বাহিনীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন৷ তাঁর দায়িত্ব প্রাপ্তির কয়েকদিনের মধ্যেই শান্তি বাহিনী স্ব-উদ্যোগে একতরফাভাবে বিনাশর্তে অস্ত্র বিরতির ঘোষণা দেন৷ ড. অলি আহমদ এবং তার কমিটির সদস্যবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বসত্মরের জনগনের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপায়গুলি খুঁজে বের করেন ৷ পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতামতও গুরুত্বসহকারে গ্রহন করা হয়৷ পরবর্তীতে ড. অলি আহমদ ১৯৯৩ সালের ২রা হতে ৯ই মে পর্যনত্ম ভারতীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর আমন্ত্রণে ভারত সফর করেন৷ সফরকালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, রেলওয়ে মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রী এবং পানি সম্পদ মন্ত্রীর সাথে পৃথক পৃথক বৈঠক করেন৷ তিনি ভারত রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও পরিদর্শন করেন৷ সফরের শেষের দিকে তিনি পৃথকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী এবং ত্রিপুরা ও রাজস্থানের গভর্নরের সাথে বৈঠকে মিলিত হন৷ পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহীদের ব্যাপারে তিনি ভারত সরকারকে, বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এবং ত্রিপুরায় অবস্থানরত চাকমা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে ভারত সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন৷

    ১৯৯৫ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২রা ফেব্রুয়ারি ড. অলি আহমদ চাকমা শরণার্থী সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেন ৷ তিনি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরও পরিদর্শন করেন এবং ত্রিপুরার গভর্নরের সাথে সাক্ষাত করেন ৷ এছাড়াও তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে সর্বসত্মরের জনগণের সাথে মত বিনিময়ের মাধ্যমে শানত্মি শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেন, অস্ত্র পরিত্যাগ করার পক্ষে জনমত গঠন করেন৷ ভারত সরকারের সাথে চাকমা শরণার্থী ও সশস্ত্র শান্তি বাহিনীকে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে ফলপ্রসু আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়৷ অতঃপর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্প হতে প্রায় দশ হাজার চাকমা শরনার্থীদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয়৷ বস্তুতঃ তিনিই সর্বপ্রথম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে “শান্তির ভীত” রচনা করেন, যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের শাসনামলে শান্তি বাহিনীর সাথে আরেকটি নতুন চুক্তির মাধ্যমে এর পুর্ণাঙ্গতা লাভ করে৷

    ১৯৯৩ সালে ড. অলি আহমদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে মায়ানমার সফর করেন ৷ সফরকালে তিনি মায়ানমারের রাষ্ট্র প্রধান, ল-এন্ড অর্ডার রেসটোরেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠকে মিলিত হন৷ এছাড়াও তিনি ঐ দেশের পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, সীমানত্ম এলাকা উন্নয়ন, জাতীয় পরিকল্পনা ও অর্থনীতি এবং স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রীর সাথে পৃথক পৃথকভাবে বৈঠকে মিলিত হন৷ এ সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যকার অনিষ্পন্ন সমস্যার সমাধান হয় এবং প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত হয়৷ মায়ানমারে অভ্যনত্মরে ইউ.এন.এইচ.সি.আর এর অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়, যা এর পূর্বে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না৷

    ১৯৯৬ সালের মার্চে গঠিত নতুন মন্ত্রী সভায় শপথ নেয়ার পর তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন ৷ কিন্তু একদিন পর পুনরায় তাকে বিদু্যত্, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পন করা হয়৷ ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বি.এন.পি সরকার পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ঐ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন ৷ ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বি.এন.পি’র দুই তৃতীয়াংশ মন্ত্রী এবং বড় বড় নেতারা নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেন, অন্যদিকে ড. অলি আহমদ চট্টগ্রামের ২টি আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন।

    ড. অলি আহমদ ২০০১ সাল হইতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কিছু কিছু দূর্নীতিবাজ , চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজ, মন্ত্রী, এম.পি. এবং সিনিয়র দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখেন৷ দেশের সকল স্তরের জনগণের মধ্যে এই ধরণের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন৷

    বি.এন.পিকে দূর্নীতিবাজদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য অপরিসীম চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি বিফল হন ৷ পরবর্তীতে ২৬শে অক্টোবর ২০০৬ সালে এর প্রতিবাদে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে নতুন পার্টি এল.ডি.পি গঠন করেন৷ এ পার্টি গঠনের মূল লক্ষ্যই হল দূর্ণীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গঠন, প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নিরপেতা, ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ এবং দেশে সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা৷ উল্লেখ্য যে, ড. অলি আহমদ সমগ্র জীবনে তার সততা এবং ন্যায়নীতি অুন্ন রেখেছেন৷ ১৯৭১ সাল থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সরকার পরিচালনায় তিনি সংস্কার এবং শাসন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অকান্ত পরিশ্রম করেন৷

    তিনি রাজনৈতিক জীবনে ২৯টি কেবিনেট / সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি//আহ্বায়ক এবং সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ তিনি ২৫ টি প্রতিষ্ঠান, এসোসিয়েশান, পেশাজীবী সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন এবং ১৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ৷ তিনি সমাজ সেবা , বিশ্বস্ততার সাথে দ্বায়িত্ব পালন এবং বীরত্বের জন্য ১৩ টি পদক লাভ করেন৷

    মুক্তিযুদ্ধের এই বীর বাহাদুর জীবনের বেশিরভাগ সময় শুধুমাত্র দেশ ও দেশের মানুষের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থানের নেপথ্যে তিনি শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, বন্ধু ও একান্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। বিদেশে জনশক্তি রফতানির ধারা সৃষ্টি করে সমগ্র দেশের বেকার যুবকদের ভবিষ্যত্কে উজ্জ্বল করতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন। এখন তিনি বেঁচে থাকা বর্ষীয়ান, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বাকী জীবন দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেকে উৎস্বর্গ করার প্রত্যয় নিয়ে লক্ষ লক্ষ ভক্ত, অনুরাগী ও তার প্রতিষ্ঠিত রেজিস্টার্ড রাজনৈতিক দল এলডিপি’র হাজার হাজার নেতা কর্মীদের সংগে নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ । আশাকরি অদূর ভবিষ্যতে এই দেশের মানুষ তাঁর অবদান স্বীকার করে তাঁকে উপযুক্ত সন্মানে সম্মানিত করবে এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4669