• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    দুর্নীতি দমন করতে না পারলে বিপন্ন হবে ভবিষ্যৎ

    ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ৩১ মে ২০১৭ | ১০:০১ অপরাহ্ণ

    দুর্নীতি দমন করতে না পারলে বিপন্ন হবে ভবিষ্যৎ

    ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার এতকাল পরও অর্জিত হয়নি অর্থনৈতিক মুক্তি। আর এজন্য দুর্নীতিই প্রধান কারণ। তাই অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ভবিষতে অবশ্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন নৈতিকতার আদর্শের বাইরে। আর এ কারণে ছাত্র ও যুবসমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত। তাদের মধ্যে নৈতিক ও দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে পারলে ভবিষতে দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে।
    দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান অন্তরায় দুর্নীতি। দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি, স্বাধীনতা, ভূখণ্ড ও পতাকা পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তি পুরোপুরি পাইনি। আমাদের মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান অন্তরায় হচ্ছে দুর্নীতি। তিনি আরও বলেন, আর্থ-সামাজিক মুক্তির জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। দুদক এ ক্ষেত্রে প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। তিনি দেশব্যাপী বাস্তবায়িত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বৃদ্ধির অনুরোধ জানিয়ে আরও বলেন, সাধারণ মানুষ সম্পৃক্ত থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
    খাদ্যখাতের দুর্নীতি প্রসঙ্গে টিআইবির অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের কোনো উদ্যোগই ফলপ্রসূ হয়নি। এটা সত্য, যেকোনো পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করে তার সফল বাস্তবায়নের ওপর। আর এটি করতে না পারলে ফল হয় উল্টো। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু দেশের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া অতীব দুঃখের। খাদ্যখাতে দুর্নীতির একটি বড় কারণ শনাক্ত করা হয়েছে, এ খাতের বিশেষ স্বার্থান্বেষীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারা এবং সংশ্লিষ্টরা জড়িত থাকা। আইনি ফাঁকফোকড়ের কারণেই দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রভাবশালী আমদানিকারক ও উৎপাদকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এটা ভেবে অবাক হতে হয়, দেশের প্রতি জেলায় খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার আইন করে এ বাধ্যবাধকতা রোধ করেছে। সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের অন্তরায় বলে মনে হওয়াটাই যৌক্তিক।
    ঘুষ দুর্নীতি অসততা জনজীবনে দুষ্ট গ্রহ হয়ে দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় সরকার চলে। সরকারি কর্মচারীরা যে বেতন-ভাতা পান তা আসে জনগণের দেওয়া ট্যাক্স থেকে। এর বিনিময়ে সাধারণ মানুষ পায় রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। পায় সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার। কিন্তু সে সেবা পেতেও দিতে হয় ঘুষ।
    ঘুষ-দুর্নীতির দৌরাত্ম্য এতটাই সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে যে বলা হয়, এক মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় পেতে অন্য মন্ত্রণালয়কে ঘুষ দিয়েছে এমন নজিরও নাকি আছে। দুর্নীতির বরপুত্ররা কতটা নীতিহীন হতে পারে তার প্রমাণ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন মঞ্জুরের ঘটনা। অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন সহকর্মীকেও তারা নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায় উেকাচ পাওয়ার জন্য। দুর্নীতিবাজরা কতটা মানবিক চেতনাহীন হতে পারে গরিব-দুঃখীদের নামে সরকারি ত্রাণের ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দের সময়ও ঘুষ গ্রহণের ঘটনা তারই প্রমাণ।
    বলা হয়, এমন কোনো মন্ত্রণালয় নেই যেখানে ঘুষ নেই। ঘুষ দুর্নীতি রোধের দায়িত্ব যাদের, দুর্নীতির দিক থেকে তারা সবার চেয়ে এগিয়ে। আদালত প্রাঙ্গণেও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য। বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে জামিন দেওয়াসহ অসংখ্য ঘটনায় তা প্রমাণিত। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সব পূর্বশর্ত অনুকূলে থাকা সত্তে¡ও বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর‌্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না লালফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে। এ দেশে ফুয়েল অর্থাৎ উৎকাচ না দিলে কোনো ফাইলই নড়ে না। উন্নত দেশের মানুষ এই নোংরা খেলায় অভ্যস্ত নয় বলেই তারা বিনিয়োগ করতে এসেও ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে। বলা হয়, ঘুষ না দিলে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশও কার্যকর হয় না। চলতি শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব শিরোপা অর্জন করেছিল। দুর্নীতির কবল থেকে রেহাই পেতে হলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, যে অপ-অভ্যাস তাদের এক বড় অংশের মধ্যে বাসা বেঁধেছে তার অবসান ঘটাতে হবে। দুর্নীতি রোধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। সর্বাত্মক নজরদারির উদ্যোগও নিতে হবে।
    আর দেশে ভূমি খাতে দুর্নীতির বিষয়টি সর্বজনবিদিত। যার সামান্য এক টুকরো জমি আছে, তিনি ওই জমিসংক্রান্ত কাগজপত্র বিধিসঙ্গত করাতে গিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হননি- এমন নজির বিরল। জমি নিবন্ধন, নামজারি, জরিপ ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে জমির মালিককে দুর্নীতির শিকার হতে হয়ে। আমরা মনে করি, ভূমি খাতের গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকারের উচিত এসব সুপারিশ আমলে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দেশে জনসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ সীমিত। তাই জমি নিয়ে বিরোধ, সংঘর্ষ ও দুর্নীতিও এখানে বেশি। এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে আগামীতে এসব আরও বাড়বে। তাই এ ব্যাপারে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায় ততই মঙ্গল। পরিশেষে বলছি, দুর্নীতি দমন করতে না পারলে ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে।
    ব্যাংকিং খাতে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় দুর্নীতির চিত্র নতুন নয়। আশির দশক থেকেই এই দুর্নীতি ব্যাপকতা পেতে শুরু করে। ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে দুর্নীতির জন্য লজ্জাবোধ তো দূরের কথা, সাধারণ ভয়ভীতিও অবশিষ্ট থাকেনি। বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে এমন অনেকেই পরবর্তীকালে বড় রাজনীতিবিদ বা আইন প্রণেতা বনে গেছেন। সমাজে একেকজন প্রভাবশালী হয়েছেন। এসব কারণে তখন থেকেই ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বর্তমান সরকারের আমলে সেই চুরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে এমন সব ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে, যা দেখে বা শুনে মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। উঠে আসতে থাকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের নাটকীয় সব ঘটনা।
    সাম্প্রতিক সময়ে নানা খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। বৈশ্বিক নানা সূচকেও বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, আরো অনেক খাতেই দুর্নীতি তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে রীতিমতো মহীরুহের রূপ নিয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, দুর্নীতি প্রতিরোধে অতীতে কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। দুদককে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান বানিয়ে রাখা হয়েছিল। তার ফলেই আজ দুর্নীতি এমন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে হলে ক্রমবর্ধমান এই দুর্নীতি আমাদের রুখতেই হবে। এ জন্য প্রয়োজনে দুদককে আরো শক্তিশালী করতে হবে। এর জনবল বাড়াতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তাদের সক্ষম করে তুলতে হবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, দুদককে শক্তিশালী করার জন্য যে ব্যয় হবে, দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে রাষ্ট্র তার চেয়ে বহুগুণে লাভবান হবে।
    ব্যাংকিং খাতের ব্যবসা অনেকাংশেই নির্ভর করে মানুষের আস্থার ওপর। সেই আস্থায় ক্রমেই চিড় ধরছে। ঋণ জালিয়াতি, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিসহ অনেক রকম জালিয়াতির কথাই শোনা যাচ্ছে। এগুলো ঠেকাতেই হবে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জালিয়াতি রোধ করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ লোকসানি এই ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে আবার জনগণের ট্যাক্সের পয়সা থেকে ভর্তুকি দিতে হয়। আমরা দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের এই উদ্যোগের প্রশংসা করছি, পাশাপাশি তাদের আরো বেশি সাফল্য কামনা করছি।
    লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী। e-mail: advahmed@outlook.com


    Facebook Comments Box


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757