• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    ধর্ষকদের আইনের আওতায় আনা জরুরি

    ইঞ্জিনিয়ার এম এম আবুল হোসেন | ০২ জুন ২০১৭ | ১০:০৪ অপরাহ্ণ

    ধর্ষকদের আইনের আওতায় আনা জরুরি

    ধর্ষণ একটি ঘৃণ্য অপরাধ। অথচ বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচারে কারও সাজা হওয়া একটি বিরল ঘটনা। দেশে ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে তার বড় জোর পাঁচ শতাংশ আইন আদালত পর্যন্ত পৌঁছে। সমাজে মানসম্মান হারানোর ভয়ে সিংহভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা গোপন রাখা হয়। ধর্ষণের যে গুটিকয়েক মামলা আদালত পর্যন্ত যায় তার পরিণামও খুব সুখকর হয় না। প্রতিবছর ধর্ষণের যে সব মামলা হয় তার মাত্র চার শতাংশের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। সে নিষ্পত্তিও ধর্ষিতার পক্ষে যায় না বললেই চলে। প্রতি এক হাজার মামলার বিচারে মাত্র চার ধর্ষকের সাজা হয়।
    বলা যায়, দৈহিকভাবে ধর্ষণের শিকার কোনো নারী প্রতিকারের জন্য মামলা করতে গেলে ঘাটে ঘাটে তাকে মানসিক ধর্ষণের শিকার হতে হয়। পুরুষ শাসিত সমাজ এবং দেশের প্রচলিত আইন এতটাই অনুদার যে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গায় একজন নারীকেই প্রমাণ করতে হয় যে তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। এটা প্রমাণ করতে গিয়ে ওই নারীকে যা যা করতে হয়, তা বারবার ‘ধর্ষিত’ হওয়ার শামিল। এ বৈরী পরিস্থিতিতে নারী বেশি দিন তার মনোবল ধরে রাখতে পারেন না। ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার বিচারে এ অকাম্য অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আইনে এমন বিধান থাকতে হবে যাতে আসামিই প্রমাণ করবে যে সে নির্দোষ।
    এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিমাসে ৩০০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। প্রকৃত অর্থে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে সংগত কারণে যে, গ্রাম-গঞ্জ এমনকি শহরেও অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের কথা প্রকাশ করতে চান না। যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারীটির ওপরই সামাজিকভাবে ঘৃণা বর্ষিত হয় বেশি। এমনকি এজন্য ধর্ষিতার পরিবার-পরিজন কিংবা তার অভিভাবকদেরও সুনজরে দেখা হয় না বললেই চলে। তাই অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়েও থানায় মামলা করেন না। আর থানায় মামলা দিতে গেলেও অনেক অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতাকেই। এরপর সাহস করে যারা ধর্ষণের মামলা থানায় বা আদালতে করেন তার সিংহভাগই রাজনৈতিক কারণে রেহাই পেয়ে যায়। এছাড়া ধর্ষণের মামলা তদন্ত করতে গিয়েও একশ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষিতাকেই নানাভাবে হেনস্তা করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
    আসলে ধর্ষণ কোনও সাধারণ অপরাধ নয়। এটি একটি গর্হিত ও অমার্জনীয় অপরাধ। আমাদের প্রচলিত আইনে এ অপরাধের কঠোর শাস্তি রয়েছে। শরীয়া আইনেও ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদ-ের মতো কঠিন শাস্তির বিধান বিদ্যমান। এই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের মাত্রা আমাদের সমাজে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর একটি মাত্র কারণ, ধর্ষকরা শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে নানাভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষমাহীন যে কারণটি হচ্ছে তা রাজনৈতিক।
    এ কারণে খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও অনেকে বেঁচে যায়। ফলে এমন অপরাধ আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে। ধর্ষণের অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াতে একশ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার মানুষ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে মেয়েদের ইজ্জত-সম্ভ্রম লুটে নেবার দুঃসাহস করে।
    অথচ অপরাধীরা এটা ভাবে না যে, সমাজে তাদেরও মা-বোন-কন্যাদের চলাফেরা করতে হয়। স্কুল-কলেজ বা কর্মস্থলে যেতে হয় তাদের পরিবারের কোনও কোনও নারী সদস্যকে। তারা যদি ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুর ও নির্মম ঘটনার শিকারে পরিণত হয়, তাহলে তাদের কেমন মানসিক পরিস্থিতি হতে পারে। আসলে এমনটি যদি কোনও ধর্ষক কখনও চিন্তা করে তাহলে হয়তো ধর্ষণের মতো এমন মারাত্মক অপরাধ সংঘটনের চিন্তাও তারা করতো না।
    আমরা জানি না, অপরাধীচক্রের এমন মানসিকতা কখনও সৃষ্টি হবে কিনা! যারা ধর্ষণ বা খুনের মতো মারাত্মক অপরাধ করে তাদের বিবেকের মৃত্যু ঘটে। তারা মানুষ থাকে না। পশুতে পরিণত হয়। আর এদের প্রতিহত এবং নিরপরাধ নারীদের রক্ষা করতেই তৈরি হয়েছে কঠোর আইন। শরীয়া আইনেরও একই উদ্দেশ্য। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যদি ধর্ষকদের বিচারের মুখোমুখি না করা যায়, তাহলে এমন অপরাধ দিন দিন বাড়বে বই কমবে না কখনই।
    আমাদের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি এমনিতেই নারীদের অনুকূলে নয়। নারী অধিকারের কথা তথাকথিত প্রগতিবাদীদের তরফ থেকে ফলাও করে প্রচার করা হলেও নারীসসমাজ যাতে ধর্ষণের মতো অমানবিক পরিস্থিতির শিকার না হয়, সে ব্যাপারে সোচ্চার হতে তাদের দেখা যায় না।
    আমরা মনে করি, ধর্ষকদের আইনানুগভাবে বিচারের মুখোমুখি করতে পারলেই আমাদের মেয়েরা সমাজে নিরাপদে নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনই অপরাধের সংঘটকরাও অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। বিশেষত ধর্ষণ বা খুন এমন অপরাধীদের যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া হয় সে বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ থেকে তাদের আইনের হাতে তুলে দেবার ব্যাপারে যত্নবান থাকতে হবে সবাইকে।
    নারী নির্যাতনের যে ক্রমবর্ধমান উন্মত্ততায় সমাজদেহ থরথর করে কাঁপছে, এর কঠোর প্রতিকার জরুরি। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি। একই সঙ্গে দরকার সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। মনে রাখা দরকার, সময় সমাজকে এগিয়ে দেয়। আর সমাজের হাত ধরেই এগিয়ে যায় দেশ।
    এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয় জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র চারজনের সাজা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মামলায় ত্রুটি-বিচ্যুতি, আইনের ফাঁকফোকর এবং অপব্যবহারের কারণে সঠিক বিচার পান না ভুক্তভোগীরা। পুলিশি তদন্তে ত্রুটি এবং অবহেলা ছাড়াও এর পেছনে কাজ করছে নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। বিচারহীনতার কারণে ধর্ষণের সংখ্যা আরও বাড়ছে। আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার কথা। বিশেষ ক্ষেত্রে কারণ দেখিয়ে বাড়তি সময় নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো মামলা শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ধর্ষণের মামলায় ভিকটিমদের হয়রানি ও বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতার অবসান হওয়া উচিত। নিজেদের সভ্য সমাজের মানুষ বলে পরিচয় দিতে হলে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।
    লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ


    Facebook Comments Box


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    কবিতা মিষ্টি হাসি

    ২৭ আগস্ট ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757