• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই

    অ্যাডভোকেট শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ২২ আগস্ট ২০১৯ | ১১:২৩ অপরাহ্ণ

    ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই

    পরিবর্তনের হাত ধরে উন্নয়নের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। কিন্তু সব জায়গায় কি সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের দেখা মেলে? নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি এর ভিন্ন রূপ। বিগত বছরের তুলনায় এ বছর নারী নির্যাতনের হার ছিল বেশি। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বহু। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে শিশু নির্যাতনের বিষয়টিও। কন্যাশিশু ধর্ষণ এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেছে।
    পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অত্যন্ত লজ্জাকর খবরগুলো। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই যেন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলো। শিশু থেকে মাঝবয়সী নারী, স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী- কেউ বাদ যাচ্ছে না নরপশুদের হাত থেকে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।


    সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে নানা কারণকে দায়ী করলেও সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারাকে। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তের গাফিলতি ও তদন্ত প্রতিবেদনের বিকৃতি, তথ্য-প্রমাণের অভাব, সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে অনীহাসহ নানাবিধ কারণে অধিকাংশ অপরাধী বিচারে খালাস পেয়ে যায়। অথচ প্রকৃত হিসাব পেলে দেখা যাবে, অপমান সইতে না পেরে ধর্ষণের শিকার নারীরা আত্মহত্যা করেছে তার চেয়েও বেশি।
    ধর্ষণ এমন এক সমস্যা, যা শুধু নারীদের নয়, দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ এই সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সীমাহীন উদাসীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত পীড়িত করছে। ধর্ষণ মামলার বহু আসামি ধরা পড়ে না। আবার যারা ধরা পড়ে তাদেরও অধিকাংশ জামিনে বেরিয়ে যায় এবং মামলার বাদীকে চাপ দিয়ে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে। সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকায় অধিকাংশ সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। প্রভাবশালীদের চাপে এবং ঘুষ নেওয়ার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন বিকৃত করা হয় বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আবার ধর্ষণের শিকার নারীদের পরিবার আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে পারে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুততম সময়ে এসব মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রের সব রকম সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
    আধুনিকতার সাথে পাল্লা দিয়ে দিন দিন ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অফিস, রাস্তা-ঘাট, বাস কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। সুযোগ পেলেই বিকারগ্রস্ত পুরুষদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে নারী। ধর্ষণের শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কিশোর বয়সের মেয়েরা। এরপরেই রয়েছে অল্পবয়সী মেয়ে শিশুরা যাদের প্রতিরোধের শক্তি-সাহস কোনটাই নেই।


    প্রতিদিন কত মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই। যারা সামনে এসে বিচার চায় আর যারা হত্যার শিকার হন তাদের খবরই আমরা শুধু জানতে পারি। লোকচক্ষুর অন্তরালে এমন হাজারো ঘটনা হয়তো আমারা জানতে পারিনা। বিগত কয়েক বছর যাবত ধর্ষণ হত্যা এসব এখন দেশে প্রতিদিনের সংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ হত্যার পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। গত কয়েক বছরে সারা দেশে ধর্ষণ সংখ্যা অকল্পনীয়।
    বিগত পাঁচ বছরের ধর্ষণের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৪ সালে মোট ধর্ষণ ৭০৭টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৩৮৭টি, গণধর্ষণ ২০৮, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১৩ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৮১টি। ২০১৫ সালে মোট ধর্ষণ ৮৪৬টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৮৪টি, গণধর্ষণ ২৪৫, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬০, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ২ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৯৪টি।
    ২০১৬ সালে মোট ধর্ষণ ৭২৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৪৪৪টি, গণধর্ষণ ১৯৭, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৩৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৮ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৬৫টি। ২০১৭ সালে মোট ধর্ষণ ৮১৮টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫৯০টি, গণধর্ষণ ২০৬, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৪৭, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ১১ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৪টি। ২০১৮ সালে মোট ধর্ষণ ৭৩২টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ৫০২টি, গণধর্ষণ ২০৩, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ৬৩, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৭ আর ধর্ষণ চেষ্টা ১০৩টি। আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মোট ধর্ষণ ৩৫৪টি। এর মধ্যে একক ধর্ষণের সংখ্যা ২৫৬টি, গণধর্ষণ ৯৪, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ১৮, ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা ৬ আর ধর্ষণ চেষ্টা ৫৫টি।
    এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিমাসে ৩০০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। প্রকৃত অর্থে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে সংগত কারণে যে, গ্রাম-গঞ্জ এমনকি শহরেও অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের কথা প্রকাশ করতে চান না। যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারীটির ওপরই সামাজিকভাবে ঘৃণা বর্ষিত হয় বেশি। এমনকি এজন্য ধর্ষিতার পরিবার-পরিজন কিংবা তার অভিভাবকদেরও সুনজরে দেখা হয় না বললেই চলে। তাই অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়েও থানায় মামলা করেন না। আর থানায় মামলা দিতে গেলেও অনেক অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় ধর্ষিতাকেই। এরপর সাহস করে যারা ধর্ষণের মামলা থানায় বা আদালতে করেন তার সিংহভাগই রাজনৈতিক কারণে রেহাই পেয়ে যায়। এছাড়া ধর্ষণের মামলা তদন্ত করতে গিয়েও একশ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষিতাকেই নানাভাবে হেনস্তা করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
    আসলে ধর্ষণ কোনও সাধারণ অপরাধ নয়। এটি একটি গর্হিত ও অমার্জনীয় অপরাধ। আমাদের প্রচলিত আইনে এ অপরাধের কঠোর শাস্তি রয়েছে। শরীয়া আইনেও ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তির বিধান বিদ্যমান। এই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা সত্বেও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের মাত্রা আমাদের সমাজে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর একটি মাত্র কারণ, ধর্ষকরা শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে নানাভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষমাহীন যে কারণটি হচ্ছে তা রাজনৈতিক।

    এ কারণে খুন বা ধর্ষণের মতো অপরাধ করেও অনেকে বেঁচে যায়। ফলে এমন অপরাধ আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে। ধর্ষণের অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াতে একশ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার মানুষ প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে মেয়েদের ইজ্জত-সম্ভ্রম লুটে নেবার দুঃসাহস করে।
    অথচ অপরাধীরা এটা ভাবে না যে, সমাজে তাদেরও মা-বোন-কন্যাদের চলাফেরা করতে হয়। স্কুল-কলেজ বা কর্মস্থলে যেতে হয় তাদের পরিবারের কোনও কোনও নারী সদস্যকে। তারা যদি ধর্ষণের মতো নিষ্ঠুর ও নির্মম ঘটনার শিকারে পরিণত হয়, তাহলে তাদের কেমন মানসিক পরিস্থিতি হতে পারে। আসলে এমনটি যদি কোনও ধর্ষক কখনও চিন্তা করে তাহলে হয়তো ধর্ষণের মতো এমন মারাত্মক অপরাধ সংঘটনের চিন্তাও তারা করতো না।
    আমরা জানি না, অপরাধীচক্রের এমন মানসিকতা কখনও সৃষ্টি হবে কিনা! যারা ধর্ষণ বা খুনের মতো মারাত্মক অপরাধ করে তাদের বিবেকের মৃত্যু ঘটে। তারা মানুষ থাকে না। পশুতে পরিণত হয়। আর এদের প্রতিহত এবং নিরপরাধ নারীদের রক্ষা করতেই তৈরি হয়েছে কঠোর আইন। শরীয়া আইনেরও একই উদ্দেশ্য। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যদি ধর্ষকদের বিচারের মুখোমুখি না করা যায়, তাহলে এমন অপরাধ দিন দিন বাড়বে বই কমবে না কখনই।
    এখানে বলে রাখা ভালো বিশ্বের প্রথম ১০টি ধর্ষণকারী দেশের মধ্যে বাংলঅদেশ নেই। ধর্ষণ অপরাধে গোটা বিশ্বে প্রথম ১০ দেশ হচ্ছে; ১. আমেরিকা : আমেরিকার ব্যুরো অব জাসটিস স্ট্যাটিস্টিক অনুযায়ী আমেরিকায় ধর্ষণের শিকার নারীর পরিসংখ্যান ৯১% এবং ৮% পুরুষ।
    ন্যাশনাল ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইম্যানের সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার প্রতি ৬ জন মহিলার মধ্যে ১ জন ধর্ষণের শিকার। পুরুষদের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানটা ৩৩ জনে ১ জন ধর্ষণের শিকার। এই দেশে ১৪ বছর বয়স থেকেই ধর্ষণের মত অপরাধের প্রবণতা তৈরি হয় শিশু মননে।
    ২. দক্ষিণ আফ্রিকা: সন্তান এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গোটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়। এই দেশে একজন ধর্ষকের শাস্তি মাত্র ২ বছরের কারাবাস। দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় ‘রেপ ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।
    ৩. সুইডেন : ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে সুইডেনেই সবথেকে বেশি ধর্ষণ হয়। প্রতি বছরই প্রায় ৫৮% হারে যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়ে সুইডেনে।
    ৪. ভারত : ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো অনুযায়ী ২০১২ সালে ভারতের মত উন্নতশীল দেশে ধর্ষণের অভিযোগ জমা হয়েছে ২৪ হাজার ৯২৩টি। ভারতে ধর্ষণের শিকার হওয়া ১০০ জন নারীর মধ্যে ৯৮ জনই আত্মহত্যা করেন। প্রতি ২২ মিনিটে ভারতে একটি করে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়।
    ৫. ব্রিটেন : ৪ লাখ মানুষ প্রতিবছর ধর্ষণের মত ঘটনার শিকার হন ব্রিটেনে। প্রতি ৫ জন মহিলার (১৬-৫৯ বছর বয়সী) মধ্যে একজন করে ধর্ষণের শিকার হন।
    ৬. জার্মানি : এখনও পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়ে ২ লাখ ৪০ হাজার নারীর মৃত্যু হয়েছে জার্মানিতে। প্রতি বছর জার্মানিতে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয় ৬৫ লাখ ৭ হাজার, ৩৯৪।
    ৭. ফ্রান্স : ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের মত ঘটনা ফ্রান্সে অপরাধ বলেই মানা হত না। ফ্রান্সের সরকারী গবেষোণায় দেখা গেছে প্রতি বছরে এই দেশে ধর্ষণের শিকার হন অন্তত ৭৫ হাজার নারী।
    ৮. কানাডা : এই দেশে এখনও পর্যন্ত লিখিত অভিযোগের (ধর্ষণ) সংখ্যা ২৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১৮টি (এই সময় পর্যন্ত)। প্রতি ১৭ জন মহিলার মধ্যে ১ জন করে মহিলা এই দেশে ধর্ষিতা হন। যাদের মধ্যে ৬২% শারীরিকভাবে আহত হন।
    ৯. শ্রীলঙ্কা : এই দেশে অপরাধের শতাংশের বিচারে ১৪.৫ শতাংশ অপরাধ সংগঠিত হয় ধর্ষণে। ধর্ষণে অভিযুক্তদের ৬৫.৮% ধর্ষণের মত নারকীয় কর্মকান্ডে লিপ্ত থেকেও কোনও প্রকার অনুশোচনা তাদের মধ্যে হয় না। ১০. ইথিওপিয়া : এই দেশের ৬০% নারী ধর্ষণের শিকার।

    আমি মনে করি, ধর্ষকদের আইনানুগভাবে বিচারের মুখোমুখি করতে পারলেই আমাদের মেয়েরা সমাজে নিরাপদে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনই অপরাধের সংঘটকরাও অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। বিশেষত ধর্ষণ বা খুন এমন অপরাধীদের যেন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া হয় সে বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ থেকে তাদের আইনের হাতে তুলে দেবার ব্যাপারে যত্নবান থাকতে হবে সবাইকে।
    নারী নির্যাতনের যে ক্রমবর্ধমান উন্মত্ততায় সমাজদেহ থরথর করে কাঁপছে, এর কঠোর প্রতিকার জরুরি। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি। একই সঙ্গে দরকার সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। মনে রাখা দরকার, সময় সমাজকে এগিয়ে দেয়। আর সমাজের হাত ধরেই এগিয়ে যায় দেশ।
    আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব, সে ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে পুলিশ। জনগণের বন্ধু ও সেবক হিসেবে কাজ করে তারা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুলিশের এই ভূমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞাত কারণে ধর্ষিতাকে সহযোগিতার বদলে তারা নানাভাবে ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে থাকে। পুলিশের বিরুদ্ধে থাকা এ অভিযোগ কঠোরভাবে মোকাবিলা না করলে ধর্ষণ কেন, সমাজে সব ধরনের অপরাধই ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তার আগেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

    একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবেন এটাই যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে শুধু শিকার হচ্ছেন এমন নয় বরং রাজধানী ঢাকাতেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে! আমরা মনে করি, এই বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কার। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যেখানে নারীরা ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতা অর্জন করছে। এমনকি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকারও নারী। দেশের দুটো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নারী। অথচ সেই দেশের এই চিত্র! আমরা মনে করি, ব্যাপকভাবে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণপূর্বক এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে এটা মনে রাখা দরকার, নারী নির্যাতন রোধ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে হয়তো নির্যাতনের হার একদিনেই নেমে আসবে না, কিন্তু এই হার ধীরে ধীরে কমে আসবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
    এটা বলা প্রাসঙ্গিক যে, এই পরিস্থিতি নিরসনের জন্য ব্যাপকভাবে মানসিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে চিহ্নিত সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার বিকল্প নেই। আর তার জন্য পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। মানবাধিকার সংস্থার এক গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের হার ঊর্ধ্বমুখী। আর এই হার র্ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার মূল কারণই হলো দারিদ্র্য, যৌতুক, বহুবিবাহ এবং অশিক্ষা। এছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, ঢাকায় অবৈধ বস্তি গড়ে উঠেছে যেখানে উঠতি বয়সী মেয়েদের মা-বাবারা যখন কর্মস্থলে চলে যান, তখন তাদের কিশোরী মেয়েরা অনেকটাই অরক্ষিত থাকে। আর নিম্ন আয়ের বাবা-মা সন্তানদের ফেলে রেখেই যেতে বাধ্য হন জীবিকার প্রয়োজনে। ফলে এটা স্পষ্ট, নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে, তা র্র্নিমূল করতে আন্তরিক ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

    মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার নারী নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য প্রবণতাকে দমন করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানে কোনোরকম পিছপা হবে না। আমি চাই, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হোক এবং নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।
    লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673