বৃহস্পতিবার ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নয়া বিশ্বযুদ্ধ

আহমেদ আল আমীন   |   মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

নয়া বিশ্বযুদ্ধ

মানুষ মারা পড়ছে। মশা-মাছি কিংবা কুকুর-বিড়ালের মতো যেখানে সেখানে। কে যেন জাম গাছের ডালে চড়ে কষে নাড়া দিয়েছে! আর কালো, পাকা জামগুলো ঝরে পড়ছে একে একে। গাছে কি জাম আর অবশিষ্ট থাকবে দুচারটে! কাঁচা, পাকা, আধা পাকা। বৃষ্টি কিংবা গাছের পাতার মতো ঝরে পড়ছে মানুষ। টুপটাপ। দুহাজার বিশ সালে টোটাল বিশ্বে টোয়েন্টি টোয়েন্টি ম্যাচ। মানুষ বনাম ভাইরাস। উইকেট কিংবা চার, ছক্কা।
লাশের সারি বেশুমার। রাস্তাঘাটে, বনে-বাদাড়ে, সাগর-পাহাড়ে কিংবা ঘরের ফ্লোরে, পঁচা ড্রেনে। কে, কাকে টেনে তুলবে, আশ্রয় দেবে আর ভরসা দেবে! সবাই ভয়ে অস্থির, তটস্থ। পালিয়ে বেড়াচ্ছে জীবন কিংবা মৃত্যু থেকে। কিন্তু, মৃত্যু বা জীবন থেকে পালিয়ে থাকা যায় না।
কারও মৃত্যু এখন কাউকে স্পর্শ করে না। লাশ তো নয়ই। লাশের কাছেও কেউ যায় না। নেই কোনো বন্ধু বা স্বজন। সমাজ, সংসার থেকে মানবের এমন অসম্মানের বিদায় এখন যত কঠিন তত বাস্তব। আইছো একা, যাওগো একা। সঙ্গে কেহ যাবো না। মানুষ এখন আবেগ, বিবেক বিসর্জন দিয়ে মনুষ্যত্বহীন। কখনো দায়িত্বহীন। ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। এ কী! কেয়ামতের ময়দানের রিহার্সেল বিশ্বজুড়ে। কেউ কারও না।
হাসপাতালে মেয়ের লাশ রেখে পালিয়ে যায় দম্পতি। প্রবাসী স্বামীর আগমনে রাঙাবধূ পালিয়ে গেলো বাপের বাড়ি। বৃদ্ধের লাশটি পড়েছিলো রাস্তার ধারে, এগিয়ে আসেনি কেউ। শহর থেকে ছেলেটি কেবল গ্রামে গিয়েছিলো, প্রতিবেশিরা মেরে তাড়িয়েছে তাকে। একদা সম্পদশালী বাবার লাশেরও জায়গা হয়নি পারিবারিক গোরস্থানে। জানাজায় কেউ আসে না। দাফনেও না। মানুষ আজ বড় বাস্তববাদী ও স্বার্থপর। কারণ রোগটা কিন্তু ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে। ভয়ানক মহামারি।
মাঝে মাঝে গভীরভাবে ভাবি, নিজে বেঁচে আছি কিনা! এখন বেঁচে থাকাটাই বড় অর্জন। চাক্ষুষ দেখছি সম্পদ, সামর্থ্য কিংবা শক্তি কাজে আসে না।
হায় রে, এ কোন বিশ্ব ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছি! বিশ্বযুদ্ধে? আকালে না অকালে? নাকি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী আড়াই বিশ্বযুদ্ধে! নয়া কিসিমের বিশ্বযুদ্ধ। আচ্ছা, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোমটা কি খুলে গেছে? দেশে দেশে অস্ফুট ক্রন্দনের আড়ালেই কি বেজে উঠছে দামামা?
ভয়ানক ভাইরাস করোনা। করুণা সে করে না। করতেও জানে না। মানুষের অস্তিত্ব ধরেই টান দিয়েছে। ভয়ে কারাগারের দুয়ার খুলে গেছে। বিশ্বটাই আজ কারাগার। ঘরে ঘরে বন্দি মানুষ। শাটডাউন, লকডাউন। দুনিয়াজুড়ে তালা।
সীমানাগুলো বন্ধ। রাস্তাঘাট ফাঁকা। কলের চাকা ঘোরে না। কারখানা বন্ধ। ইঞ্জিন চলে না। সভ্যতা যেন স্থবির আসলেই। বিশ্বের এমন চেহারা কে দেখেছে কবে? এ গ্রহে সর্ববৃহৎ, সর্বব্যাপী ও সর্বাত্মক সংকট আর স্থবিরতা। মহাযুদ্ধের চেয়েও ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
এ যুদ্ধে বোমা পড়েনি কোনো দেশে। বনজ, ফলদ ও জলজ ক্ষতি নেই। ওরা ভালো আছে এখন। খেলায় মেতে উঠেছে। মানে ছন্দ ফিরে এসেছে অন্য প্রাণিদের জীবনে। পৃথিবীর তাপমাত্রাও বাড়েনি। ভারসাম্য আসছে জীবন ও খাদ্যচক্রে, বাস্তুসংস্থানে। ওরা যেন বলছে, তোমরা এখানে থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছো। অন্য কোথাও চলে যাও, হে মানুষ। এ সাজানো পৃথিবী তোমাদের মতো দৈত্যের জন্য না।
আগের দুটি মহাযুদ্ধের ফলভোগী মানুষ নতুন কিসিমের বিশ্বযুদ্ধ থেকে কি শিক্ষা নেবে? নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘স্বাদ’ নেবে? ইতিহাসের আক্ষেপ, তার থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আর ফলশ্রুতিতে ইতিহাস ফিরে আসে বারবার। এবারে ইতিহাসের ফিরে আসার ফল কতটা তেতো ও বিস্বাদের হবে তা কি আন্দাজ করা যায় না?
আহমেদ আল আমীন: লেখক ও সাংবাদিক

Facebook Comments Box


Posted ৯:৩৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১