শনিবার ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পরিপূর্ণ নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তোলাই হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার

অধ্যক্ষ সুমনা ইয়াসমিন   |   শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

পরিপূর্ণ নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তোলাই হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯১০ সালে ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত নারীদের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার পর থেকে দিনটি ঘটা করে পালন করা হতো সমাজতন্ত্রী শিবিরে। সোভিয়েত বিপ্লবের পর নারী দিবস সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রত্যয়দীপ্ত দিন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের স্বীকৃতি দেয় এবং তার পর থেকে জাতিসংঘভুক্ত প্রায় সব দেশেই দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়।
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মানবসমাজ কতটা এগোলো সে বিশ্লেষণও করা হয় এই দিনে। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়নের পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারীর উন্নয়ন ছাড়া যে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়, এটি অনুধাবন করে বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে প্রতিটি সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে যেমন নারীরা দ্রুত স্থান করে নিতে সক্ষম হচ্ছে তেমন জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর ভূমিকা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকশিল্পে যে ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত তার সিংহভাগই নারী।
নারী-পুরুষ নিজ নিজ অবস্থানে সমুজ্জ্বল। পরিবার ও সমাজে কন্যা-জায়া-জননী হিসেবে নারীর ভূমিকা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একই সঙ্গে নারীর মানবিক মর্যাদা ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। আসলে একটি আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের আলাদা আলাদা ভূমিকার কথা চিন্তাও করা যায় না। নারী-পুরুষ কেউ কারও প্রতিপক্ষ তো নয়ই, বরং একে অপরের পরিপূরক। সমকালীন বিশ্বে নারী নেতৃত্ব অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কথা আরও সত্যি। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের সরকারপ্রধান এবং বিরোধীদলীয় প্রধানের পদ নারী রাজনীতিকদের দখলে। এ মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার ও সংসদ উপনেতা পদে যারা আছেন তারা নারী। বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এ দেশের নারীরা। অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নারীর ভূমিকা অগ্রসর দেশগুলোর তুলনায় খুব বেশি পিছিয়ে না থাকলেও এখনো সামাজিক অনাচারের শিকার। অভিযোগ করা হয়, দেশের ৮০ ভাগ নারীই কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার।
জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম পূর্ব শর্ত হচ্ছে নারী উন্নয়ন। বর্তমান সরকার নারীর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অতীতে আমাদের সমাজে নারীশিক্ষার বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। কিন্তু নারী উন্নয়নে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার ফলে আমাদের দেশে নারী শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই চিহ্নিত করে।
নারী-পুরুষ নিজ অবস্থানে সমুজ্জ্বল। পরিবার ও সমাজে কন্যা-জায়া-জননী হিসেবে নারীর ভূমিকা বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। একই সঙ্গে নারীর মানবিক মর্যাদা ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। আসলে একটি আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষের আলাদা আলাদা ভূমিকার কথা চিন্তাও করা যায় না। নারী-পুরুষ কেউ কারও প্রতিপক্ষ তো নয়ই, বরং একে অপরের পরিপূরক। সমকালীন বিশ্বে নারী নেতৃত্ব অনেকটাই সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কথা আরও সত্যি। এ দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, বিরোধীদলীয় নেত্রীও নারী। সরকার, প্রশাসনসহ বিভিন্ন পেশায় নারীদের অবস্থান সুদৃঢ়। নারীরা পুরুষের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নারীরা অগ্রগণ্য। কিন্তু তারপরও কোন কোন ক্ষেত্রে নারী এখনও বৈষম্যের শিকার। নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেলেও দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীসমাজ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। যৌতুকসহ নানাবিধ কারণে এখনও অনেক নারীকে নির্যাতিত হতে হয়, কখনও কখনও জীবনও দিতে হয়। কর্মক্ষেত্রেও নারীর বৈষম্য সেভাবে কমেনি। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকারও নারী, এমন অভিযোগ প্রায়শই ওঠে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অন্যতম গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী। আর কৃষিক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ তো সেই অতীত থেকে। কর্মজীবী নারীকে অনেক ক্ষেত্রে পোহাতে হয় নানা ভার।
এদেশে এখনো নারীদের সমস্যা বহুবিধ। পরিবার, সমাজ, বাইরের কর্ম জগৎ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিকার আদায়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মান্ধতা এবং অশিক্ষার কারণেও নারী তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নারীর মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈষম্য আমরা দেখছি। এছাড়া যৌতুক, বাল্যবিবাহ, একাধিক কন্যাসন্তানের জন্মদান নিয়ে স্ত্রী তালাক, পারিবারিক সহিংসতা, এসিড নিক্ষেপ বা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার ঘটনাক্রমেই বাড়ছে। আমি মনে করি নারীর সত্যিকার উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।
পরিশেষে বলছি, নারী সমাজের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কোন অবস্থায়ই একটি সুষম সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সময় এসেছে সব অন্যায়-অবিচার দূর করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার। একটি পরিপূর্ণ নারীবান্ধব সমাজ গড়ে তোলাই হোক এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক: অধ্যক্ষ, উত্তরা ইউনাইটেড কলেজ ও সভাপতি স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ ঢাকা মহানগর উত্তর।

Facebook Comments Box


Posted ৭:৪২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১