শনিবার ২৪শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পুঁজিবাজারে আবার অনিশ্চয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক:   |   সোমবার, ২১ জুন ২০২১ | প্রিন্ট  

পুঁজিবাজারে আবার অনিশ্চয়তা

অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় আর্থিকখাতের যখন নাজুক অবস্থা তখন একমাত্র আশার আলো শেয়ারবাজার। আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতার অভাবে গত ১০ বছরেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ এর মাধ্যমে আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করায় পুঁজিবাজারে ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন থেকে পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী। টানা ৯ সপ্তাহ ঊর্ধ্বমুখী ছিল পুঁজিবাজার। গত ৯ জুন ২৭শ’ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। যা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গত সাড়ে ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন। বাজারের ধারাবাহিক উত্থানে গত মে মাসে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে ছিল দেশের পুঁজিবাজার। এরই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে ফিরতে শুরু করেছেন। দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজার নিয়ে সবাই খুশি। গত শনিবারও প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, গত এক বছর ধরে পুঁজিবাজারে নতুন ধরন দেখছি। বিএসইসি চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন অনেকগুলো ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। এখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে। সালমান এফ রহমান বলেন, গত এক বছর পুঁজিবাজারে লেনদেন ও বাজার মূলধন বেড়েছে। একইসঙ্গে বেসিক সমস্যা ইক্যুইটিভিত্তিক মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ ভালো দেখছি। এর আগে দেশের পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে দীর্ঘদিন থেকে প্রচেষ্টা চালানো অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একাধিকবার বর্তমান কমিশনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা রাখতে বলেছেন। অবশেষে তার প্রতিফলন দেখছে বিনিয়োগকারীরা।
আর এ অবস্থায় নিজেদের কাজ সঠিকভাবে না করে বিএসইসি’র কাজে হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিকখাতের তদারকি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, অথচ শেয়ারাবাজারে ছড়ি ঘোড়ানের চেষ্টা। ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার ও নানা অনিয়মে জর্জরিত দেশের ব্যাংকিং খাতের এসব অনিয়ম রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা খুব একটা চোখে পড়ে না। এমনকি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজে ক্ষোভ জানিয়েছেন উচ্চ আদালত। আর তখন নিজেদের স্বাভাবিক কাজ বাদ দিয়ে দীর্ঘদিন পর উড়তে থাকা শেয়ারবাজারে নজর পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে গত ১৬ জুন দেশের সকল তফসিলি ব্যাংককে বিএসইসি জারিকৃত করপোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮-এ বর্ণিত নমিনেশন ও রেমুনারেশন কমিটি গঠনসহ এই কোডের অন্যান্য নির্দেশনা বাতিল করেছে। এখন থেকে ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক নির্দেশনাসমূহ ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর সংশোধন এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জারিকৃত নির্দেশনা ব্যতীত ব্যাংক কোম্পানির পরিপালনের সুযোগ নেই।
সূত্র মতে, কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড, ২০১৮ সালের ১০ জুন প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়। এর মাধ্যমে এতদিন পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ড গঠন, স্বাধীন পরিচালক নির্বাচন, অডিট কমিটি, নমিনেশন ও রেমুনারেশন কমিটি, টপ ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা, অডিট কমিটির ভূমিকা, নমিনেশন ও রেমুনারেশন কমিটির ভূমিকা পরিচালিত হতো। এর আওতায় এতদিন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল। যে কারণে দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারে সুশাসন ফিরে আসে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় পরিণত হয়েছে।
অর্থনীতিবীদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। তাই এটা রাখা যেতে পারে। তবে এক আইনের সঙ্গে অন্য আইন যাতে সাংঘর্ষিক না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে কারো স্বার্থের বিরুদ্ধে যাতে না যায়। তাই দুই আইনেরই সমন্বয়ের তাগিদ দেন সংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর আবু আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, দুই আইনের সমন্বয় দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারিকর যায়গা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেদিক থেকে তারা প্রথম তদারকি প্রতিষ্ঠান। তাদের অবস্থান ঠিক আছে। তবে শেয়ারবাজারের স্বার্থের বিরুদ্ধে যদি কিছু যায় সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখা উচিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাথে আলোচনা করে সমন্বয় করা উচিত। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি যতদিন উন্নতি না হবে, ততদিন মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবে। তবে বাজারে যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়, সে ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার একদিন শক্তিশালী বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার ড. মিজানুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, বিএসইসি পুঁজিবাজারের সকল তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পরিষদ ও ব্যাবস্থাপনায় কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড, ২০১৮, বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) বিভিন্ন প্রবিধানের সাথে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডের কিছু পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যগুলো ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। যেমন- ব্যাংকের বোর্ডে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির ভূমিকা এবং অডিট কমিটির বিশদ কার্যাবলি ব্যাংকিং আইন বা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধানে নেই কিন্তু কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখন থেকে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডের নতুন বিধামালা প্রযোজ্য নয় বলে যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে তাতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অস্বচ্ছতা এবং সুশাসনের অভাব গভীরতর হবে। ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ কমিশনের কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড, ২০১৮ এর বিধিবিধান সঠিকভাবে কার্যকর করা গেলে বোর্ডের গঠন, স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার সাথে বোর্ডের সেপারেশন এবং ডিপোজিটরদের স্বার্থ সমুন্নত থাকবে।
সূত্র মতে, জবাবদিহিতার অভাবে গত ১০ বছরেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এবং কমিশনাররা দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। বাজারের বর্তমান চিত্রও তাই বলছে। দীর্ঘদিন পর বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে ফিরছে।
অথচ ২০২০ সালের শুরুতেও পুঁজিবাজার ছিল হতাশার। সেই বাজার এখন শুধু ঘুরে দাঁড়াতেই শুরু করেনি, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। গত মে মাসে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে ছিল দেশের পুঁজিবাজার। ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে এই বাজারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে প্রায় এক বছর ধরে। দুর্বলতাগুলোও ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। শেয়ারবাজার যে শক্ত ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রমাণ মেলে বিএসইসির সর্বশেষ নেয়া সিদ্ধান্তেও। গত বৃহস্পতিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের বেঁধে দেয়া সর্বনিম্ন দাম বা ফ্লোর প্রাইস তুলে নেয়া হয়েছে। অথচ শেয়ারের দামের ভয়াবহ পতন ঠেকাতে গত বছরের ১৯ মার্চ তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। যাতে বেঁধে দেয়া ওই সীমার নিচে কোনো শেয়ার নামতে না পারে। এভাবে গত বছরের মার্চে শেয়ার বাজারের ভয়াবহ পতন থামিয়েছিল বিএসইসি।
গত বছরের ১৪ মে বিএসইসি’র চেয়ারম্যান প্রফেসর এম খায়রুল হোসেনের মেয়াদ শেষ হয়। আর তার স্থলাভিষিক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডীন প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। করোনা মহামারির মধ্যে যোগদান করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং গতিশীলতা আনতে নানামুখী পদক্ষেপ নেন। তার গতিশীল নেতৃত্বে ও নানামুখী পদক্ষেপে ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় পরিণত হচ্ছে পুঁজিবাজার। মহামারি প্রকোপ চললেও আতঙ্ক দূরে ঠেলে ইতোমধ্যে স্বাভাবিক হয়েছে দেশের জনজীবন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। দেখা মিলছে বড় উত্থানের। একই সঙ্গে গতি বাড়ছে লেনদেনেও।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য ব্রোকারেজ হাউজের মালিকদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী ইনকিলাবকে বলেন, বাজার বর্তমানে অনেকটাই স্বাভাবিক গতিতে আছে। তার মতে, সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর বাজার এখন স্বাভাবিক আচরণ করছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলো চালাবে এ জন্যই হয়তো নির্দেশনা দিয়েছে। তবে এ নিয়ে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক দু’পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে এর সহজ সমাধান করতে পারে। তবে এটি ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেছেন, পুঁজিবাজারকে ভাইব্রেন্ট করতে ইতোমধ্যে কিছু ভালো কোম্পানিকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিএসইসি পুঁজিবাজারে সুশাসনের বিষয়টি বিশেষ জোর দিয়েছে। আর তাতেই বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরেছে।

Facebook Comments Box


Posted ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২১ জুন ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১