• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ

    প্রকৃতির আচরণ বদলে যাচ্ছে

    অনলাইন ডেস্ক | ২২ এপ্রিল ২০১৭ | ২:০০ অপরাহ্ণ

    প্রকৃতির আচরণ বদলে যাচ্ছে

    সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছে, এপ্রিলের শেষ কিংবা মে-র প্রথম সপ্তাহে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল নামে। কৃষকদের প্রস্তুতিও থাকে ওই সময়কে ধরে। অথচ এবার মার্চের শেষের দিকে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বোরোর কাঁচা ধান তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছে, স্বাধীনতার পর গত ৪৬ বছরে তারা চৈত্র মাসে এমন বন্যা ও পাহাড়ি ঢল দেখেনি। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও বলেছেন, হাওরাঞ্চলে অতীতে এভাবে বৃষ্টি ও ফসলহানি হতে তিনি দেখেননি।


    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবার আগাম অতিবৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালি আগামী দিনে আরো বাড়বে।

    ajkerograbani.com

    লবণাক্ত পানি আগে উঠে আসত সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরার নদ-নদী পর্যন্ত। সেই লবণাক্ততা এখন গোপালগঞ্জের মধুমতী নদীতে এসে ঠেকেছে। ফলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে এখন সুপেয় পানির সংকট। এ বছর চৈত্র মাস চলে গেছে; কিন্তু দেখা মেলেনি চিরায়ত সেই কাঠফাটা রোদের। মাঠ-ঘাট, খাল-বিল-প্রান্তর ফেটে চৌচির হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। শীতের স্থায়িত্বও এবার ছিল খুব কম। তেমন শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এ বছর মার্চে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৫২ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে। এ ছাড়া দিনের তাপমাত্রাও ছিল গত বছরের চেয়ে অনেক কম। শিলাবৃষ্টি হয়েছে অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার এমন নাটকীয় পরিবর্তন বিষয়ে মানুষ ততটা সচেতন নয়। এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না, বুঝতেও চান না। মাত্র চার দিনে কানাডায় হারিয়ে গেল একটি প্রাচীন নদী। গ্রিনল্যান্ডের পিটারম্যান হিমবাহের কেন্দ্রে বড় ফাটল ধরা পড়েছে নাসার ছবিতে। পৃথিবীর এক প্রান্ত যখন বন্যায় ভাসছে, আরেক অংশ পুড়ছে খরায়। আফ্রিকা মহাদেশের বিরাট অংশজুড়ে তো দুর্ভিক্ষাবস্থা চলছে। বিশ্বের অনেক এলাকা যখন তুষারে চাপা পড়ছে, তখন দাবানলে পুড়ছে বনভূমি অধ্যুষিত অনেক দেশ। জলবায়ুর এমন খামখেয়ালিপনার মধ্যে আজ একযোগে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কে সঠিক শিক্ষণ বা জ্ঞান অর্জন’। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর গেলরেড নেলসন ১৯৭০ সালে প্রথম জলবায়ু সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ শুরু করেন। তিনিই ধরিত্রী দিবস পালনের উদ্যোক্তা। তাঁর আন্দোলনের হাত ধরে সারা বিশ্বে ২২ এপ্রিল একযোগে দিনটি পালিত হয়।

    জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারের নীতিনির্ধারক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা সবার জানা জরুরি। কিন্তু কতজন বিষয়টি জানেন?’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, মনুষ্যসৃষ্ট আরো অনেক দুর্যোগ ধেয়ে আসছে। বন কেটে উজাড় করা হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করে ড্যাম বসানো হচ্ছে। হাজারীবাগের ট্যানারির বর্জ্য গিয়ে পড়ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এখন সাভারের বর্জ্য গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। এতে ক্ষতি হচ্ছে আমাদেরই। পরিবেশের এই দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে ব্যবসায়ী, সংসদ সদস্যসহ সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা জরুরি। ’

    এবারের বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে দাবি থাকবে বিশ্বকে সবুজ করে তোলা। যেখানে যেখানে গাছ লাগানো জরুরি, সেখানে গাছ লাগাতে হবে। যত বেশি করে সম্ভব বনায়ন করা উচিত। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রত্যেককে কিছু না কিছু করতে হবে। সেটা হতে পারে, পাখির বাসস্থান নিশ্চিত করা, প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার কমাতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা, পানির দূষণ রোধ করা, রাস্তা থেকে বর্জ্য সরিয়ে যথাযথ স্থানে রাখা, পরিবহন দূষণ কমানো ইত্যাদি। ’

    জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আবহাওয়ার যে নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেটি ভেঙে পড়েছে। আবহাওয়ার মতিগতি ভালো নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মণিরামপুরে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ফসল ও মত্স্য সম্পদের ভবিষ্যৎ হুমকিতে পড়ছে। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রাজিল, ভারত, রাশিয়া তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছে না, বরং বাড়াচ্ছে। তাদের ভোগ-বিলাসের বলি হচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়তই বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। এ কারণে দুই মেরুতে জমাট বরফ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর প্রভাবে আগে যেসব জায়গায় জোয়ারের পানি উঠত না, সেসব অঞ্চল এখন প্লাবিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম সবার শীর্ষে। কিন্তু দেশের কত শতাংশ মানুষ এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল? এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করে তোলার তাগিদ দিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

    জানতে চাইলে জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য আহসান উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জ্ঞানবিজ্ঞান ব্যবহার করে দেখানো হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কী কী পরিবর্তন ঘটছে। এখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। মানুষকে বোঝাতে হবে। আবহাওয়ার যে মতিগতি, তাতে হাওরে আগাম বৃষ্টি বা ঢল নামতেই পারে, এটা সাধারণ মানুষ এমনকি সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের জানতে হবে। মার্চের মধ্যেই বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করতে হবে। ’ তাঁর মতে, এ বিষয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ রকম আগাম বন্যা আরো হতে পারে। আইনুন নিশাতও মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অনেক কিছু পড়ানো হচ্ছে। তবে নীতিনির্ধারক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলাটাও জরুরি। তিনি বলেন, প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা আগামী শতকে পৃথিবীর তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এটা কার্যকর করা কঠিন হবে।

    আজকের ধরিত্রী দিবসে বনায়নের ওপর জোর দেওয়া হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। উন্নয়নের নামে এখানে প্রতিনিয়তই বন দখল হচ্ছে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৫৮ হাজার একর জমি উন্নয়নের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে সরকারি অন্য সংস্থাকে। এ ছাড়া জবরদখল হয়েছে দুই লাখ ৭০ হাজার একর বনভূমি। একটি দেশে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে আছে মাত্র ১০ শতাংশের মতো। বনভূমি দখল হওয়ার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে হাতিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী। পাহার-টিলা কেটে ফেলা হচ্ছে নির্বিচারে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বকে জোর দিতে হবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর। গুরুত্ব দিতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর। এ ছাড়া বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নদী দখল ও দূষণ কমানোর ওপর জোর দিতে বলেছেন তাঁরা।

    আবহাওয়া কর্মকর্তা আরিফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বছর আবহাওয়ায় কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যখন প্রচণ্ড রোদ থাকার কথা, তখন বৃষ্টি হচ্ছে। আবার যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন উঠছে গা-জ্বালা করা রোদ। এবার সুনামগঞ্জ ও অন্যান্য হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার মূলেও রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন। অথচ এ বিষয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি ছিল না।

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757