শুক্রবার ৬ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা দিবসঃ তারুণ্যের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা

সৈয়দ নাজমুল হুদা   |   শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

বঙ্গবন্ধু  ও স্বাধীনতা দিবসঃ তারুণ্যের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা

জাতির জনক, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীণ ভূখন্ডে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের নাম। অখন্ড বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশে জন্মগ্রহণ করে ইতিহাসে উপমহাদেশের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছেন। শুধু উপমহাদেশ নয়, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে সগৌরবে অবস্থান নিয়েছিলেন এই মহানায়ক। শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, আমেরিকা সহ কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসার অপর নাম ছিলো বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “ বিশ্ব শাসক ও শোষিত এই দুই ভাগে বিভক্ত। আমি শোষিতের পক্ষে” ।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতিসংঘ, ওয়াইসি, কমনওয়েলথ, ন্যামসহ প্রভৃতি বিশ্ব সংস্থায় তিনি ছিলেন নিপীড়িত
প্রাগ্রসর প্রতিনিধি। বাংলাদেশের স্বাধীণতা ও সংহতির প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী প্রেরণা ৭ মার্চের ভাষণ। ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা, দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা প্রাপ্তি।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতা দিবসটি এবারো হতে পারতো অনন্য। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী ভাইরাস সংক্রমণ ও এ সংক্রান্ত সতর্কতার কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানসমূহ কিছুটা সংক্ষেপ করা হয়েছে। এতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান কিংবা স্বাধীনতা দিবসের প্রতি আমাদের ভালোবাসা, আবেগ, অনুভূতি কিংবা শ্রদ্ধাবোধ এর বিন্দুমাত্র কমতি নেই। এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মকান্ডে যাতায়াতে বিধি নিষেধ থাকলেও মনের ভালোবাসা কিংবা হৃদয়ের শ্রদ্ধায় সিক্ত হবে এবারের এই বিশেষ দিবসটি। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া দেশ ও জাতি গঠন সম্ভব নয় । দেশ গঠনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
মানবসভ্যতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুনগত মান প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নত জাতি গঠন সম্ভব। আর এ কাজে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করবে এ জাতির প্রাণশক্তি তারুণ্য। তরুণদেরকে কর্মমূখী ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করলে দেশের উন্নতিতে বিপ্লব আসবে। তাইতো বঙ্গবন্ধু শিক্ষার উন্নয়নে সু-শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে মেডিকেল শিক্ষায়ও গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
তারুণ্যের শক্তি ও সুশিক্ষায় সুস্বাস্থ্য ভূমিকা রাখবে যা আগামী প্রজন্মকে উন্নত জাতিতে পরিণত করবে।
বিশ শতকের বাঙ্গালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষাণী সহ অসংখ্য নেতৃবৃন্দ। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন আবার কেউ কেউ সরকার পরিচালনায় ও অংশগ্রহণ করেছেন।
কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করে একটি স্বাধীণ বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির চরিত্র ছিলো নিজস্ব ও নিজ স্বকীয়তায় অনন্য। তিনি মাওলানা ভাষাণীর কাছ থেকে নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, মেহনতি, বঞ্চিত, কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুশের অধিকার আদায়ের অনুপ্রেরনা নিয়েছিলেন। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী থেকে নিয়েছিলেন সংসদীয় গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক দীক্ষা।
বাঙ্গালী মুসলমানদের দুঃখ বেদনা, হিন্দুদের দুঃখ কষ্ট, অবাঙ্গালী উর্দুভাষী মোহাজেরদের আর্তনাদ ও কষ্টসমূহ উপলব্ধি করার জন্য তিনি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ৭ মার্চের অমর কাব্যখানিতে মুক্তিযুদ্ধের ডাক ছিলো বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে সমর্থন । তাঁর ছিলো বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক তৎপরতা। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন ছিলো জাতির পিতার বিচক্ষণ নেতৃত্বের প্রমাণ। ১২৬ টি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়। এমন একজন মহানায়ক ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মা সায়েরা খাতুনের কোল আলোকিত করে এসেছিলেন এই বাংলায়।
বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎচন্দ্র-ডি এল রায়-সুকান্ত- রজনীকান্ত সহ অসংখ্য শিল্পীর গান আর কবিতায় স্বদেশী আন্দোলন ছিলো তখন তুঙ্গে। ১৯২০ এ বিদ্রোহী কবির “বিদ্রোহী” কবিতা সৃষ্টি হয়েছে । এ সময়ে সংস্কৃতি ও সামাজিক দায়বোধ তরুণ নেতা শেখ মুজিবের মন ও মননে বিকশিত হতে থাকে।
’৪৩ এর মন্বন্তরে, ’৪৬-৪৭ এর দাঙ্গা ও দেশভাগে, ’৪৮ ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়ে, ’৫২ ভাষা আন্দোলনে, ’৫৪ যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচনে, ’৫৮ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, ’৬৯ গণ আন্দোলন, ’৭০ এর নির্বাচনে এই মহান নেতার ছিলো স্বক্রিয় ভূমিকা। ’৭০ ছিলো স্লোগানে মুখরিত – “এক নেতার এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, সেনা শাসনের অভিজ্ঞতা, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের হাহাকার থেকে মুক্তি লাভের জন্য ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ই মার্চের বক্ত্রিতা বদলে দেয় বাঙ্গালী জাতির ভাগ্য। যুধ মোকাবেলার কৌশল, দেশের স্বাধীণতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, জীবন উতসর্গ করার প্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করলেন “ এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীণতার সংগ্রাম।
হাজার বছরের পরাধীণতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে।
১৬ই মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক হয়। আলোচনার জন্য জনাব ভূট্টো ও ঢাকায় আসেন। ২৩ মার্চ দেশব্যাপী স্বাধীণতার পতাকা উত্তোলিত হয়েছে। ভোর পাঁচটায় ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে পতাকা উঁড়িয়ে দেন। সেইদিন পতাকা উড়িয়ে সারাদেশের মানুষ প্রতিরোধ দিবস পালন করে। এই সময়ে গড়ে উঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী।
মূলত ৭ই মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব-ভূট্টো আলোচনা হয়।
২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা সদর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়াটারস্ । বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২ টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন- ‘‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের সকলে, তোমরা যে যেখানে আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীর প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে”। পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডীর ৩২ নম্বর থেকে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এ, তারপর করাচিতে, এবং শেষে পাঞ্জাবের শাহিওয়াল জেলে নিয়ে আটকে রাখে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টায় তিনি বন্দী ছিলেন নির্জন কারাবাসে।
তরুনরাই আগামীর বাংলাদেশ গড়ার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার প্রতীক। স্বপ্নজয়ীর অদম্য প্রানশক্তির এই তরুনরাই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা ছিলো এই তরুনরাই। দেশের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে প্রান দেয়ার অবিস্মরণীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করেছিলো এই তরুন প্রজন্ম । স্বাধীন দেশ ও স্বাধীনতার জন্য প্রান দেয়ার ইতিহাস ঘটিয়েছিলেন হ্যামেলিনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গনবন্ধুর ডাকে। দীর্ঘ নয় মাস তাদের রক্তের বিনিময়ে এ মাটিকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সোনার বাংলা গড়তে সেই তরুন সমাজকেই এগিয়ে আসতে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৫-৩০ বছরের ছেলে মেয়েদের তারুন্যে ভরা যৌবন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তরুন প্রজন্মের মতে (ক) ৭মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন তরুন প্রজন্মের জন্য ‍ুছিল স্বার্থক ও যথাপোযুক্ত যা মুক্তিযুদ্ধের প্রেরনা যুগিয়েছিল (খ) তরুন প্রজন্মে অধিকাংশ মনে করে মুত্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধু। (গ) ভাষা আন্দোলন, শোষন-নির্যাতন আর উন্নয়নের প্রতীক মানেই অধিকাংশ তরুণ সমাজ মনে করে বঙ্গবন্ধু। (ঘ) বঙ্গবন্ধু মানেই মানেই আপোষহীন ও নিঃস্বার্থ রাজনীতিবীদ। [উত্তরগুলো একহাজার(১৫-৩০) বছরের বয়সের তরুনদের মধো প্রশ্ন করে তার ফলাফলের ভিত্তিতে লিখিত ]
এবারের স্বাধীনতা মার্চ ইতিহাসের পাতায় অনন্য। কারন এই বছর জাতির পিতার জন্মশত বাষিকী।মহাধুম ধাম আর ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আয়োজনের মাধ্যমে পালিত এ জন্মশত বাষির্কী। আগামি প্রজন্মের চিন্তা-চেতনায়,কর্মে,শিক্ষায় যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর দর্শন, সমাজ ব্যবস্থা ও চিন্তা ধারার বীজ বুনে দিতে পারি তবেই স্বার্থক হবে স্বাধীনতার স্বাদ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী শুধুমাত্র নিছক উদযাপনের মধ্যে আটকে রা রেখে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও আদশ্যকে প্রতিফলিত করার উদোগ গ্রহণ করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে সবোচ্চ বিদ্যাপীঠে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে হবে। তরুণ প্রন্জমের কাছে প্রকৃত ইতিহাস ও সত্য তুলে ধরতে হবে।
শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরার জন্য তরুণ প্রন্জমকে ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন নিয়ে। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যাশায় এবারের স্বাধীনতা দিবসটি হোক যথাযথ মর্যাদাময়।
লেখক: শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

Facebook Comments Box


Posted ১০:১৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১