রবিবার ১লা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ; গুজব বনাম বাস্তবতা

ইমদাদুল হক সোহাগঃ   |   বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০ | প্রিন্ট  

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ; গুজব বনাম বাস্তবতা

আমাদের দেশে কিছু পন্ডিত আছে, এরা সবসময়ই সবজান্তা শমশেরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এখন পান্ডিত্য দেখাতে শুরু করেছে করোনা সংক্রামণ নিয়ে। এই পন্ডিত শ্রেণীর অনেকেই দিন ক্ষণ পর্যন্ত বেধে দিয়ে ভবিষ্যতবাণী প্রদান করছে আগামী সাত দিনে এটা হবে, আগামী পনের দিনে সেটা হবে, ভাইরাসে ডিম পেরেছে সেই ডিম এখন ফোটার অপেক্ষায় আরও কত কি। অথচ করোনা নিয়ে গবেষণা করা গবেষকরাই এখনো পর্যন্ত এই ভাইরাসের চরিত্র বিশ্লেষণ করে কোন কনক্রিট সিদ্ধান্তে আসতে পারে নাই। এই পণ্ডিত শ্রেণীর অভিযোগ ও দাবির শেষ নেই, একটা দাবি পূরণ হতে দেরি আছে তো নতুন দাবি নিয়ে হাজির হতে দেরি নেই। বর্তমান সময়ে এই শ্রেণীর লোকদের সবথেকে বড় অভিযোগ সরকার বাহাদুর নাকি করোনায় আক্রান্তের এবং মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করছে।যারা বলছে সরকার গোপন করছে তাদের কাছে জানতে চাই, আমরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছি মানুষ নাকি লাভে লোহা বয় (বহন করে) বিনা লাভে নাকি কেও তুলাও বয় না, তাহলে আক্রান্ত ও লাশের সংখ্যা গোপন করে সরকারের লাভ টা কি?এটাতো মহামারীতে মৃত্যু, কোন পলিটিকাল মার্ডার না যে সংখ্যাটা বেশি হলে সরকার বিব্রত হবে।আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে তো মনে হয় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেই বরং সরকারের লাভ,কারণ তখন সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে বড় বড় অংকের অনুদান হাতিয়ে নিতে পারবে।বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মানুষের করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার যে খবর গুলো প্রচার করে তারা তৃপ্তির ঢোকর তুলছে তাদের কাছে আমার জানতে ইচ্ছা করছে করোনা আসার আগে কি বাংলাদেশের কোন হাসপাতালে বা কোথাও কোন মৃত্যু হতোনা।তাদের মধ্যে প্রতিদিন জ্বর শ্বাসকষ্ট, এজমা, নিউমোনিয়া এসব কারণে প্রতিদিন কতজন মারা যেত সেই পরিসংখ্যান টা কি আপনাদের জানা আছে,যদি সেই পরিসংখ্যানটি আপনার জানা থাকতো তাহলে এখন কোথাও কেও মারা গেলেই সেটি পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে করোনায় মারা গিয়েছে বলে চালিয়ে দিতেন না।এখন আসুন সেই পরিসংখ্যান নিয়ে একটু বিশ্লেষণে যাওয়া যাক।যদিও বিশ্লেষণ টি আমার না, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সাজ্জাদ হোসেন সাজু। বিশ্লেষণ টি আমার খুবই পছন্দ হয়েছে তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
বিশ্লেষণ(১)
যারা বলছেন সরকার তথ্য সঠিক দিচ্ছেনা তারা নিশ্চয় সরকার তথা মিরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার তথ্য সত্য মনে করেন না। এবং তারা বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ মার্চের ৮ তারিখে নয় বরং সংক্রামণ শুরু হয়েছে তারও আগে থেকে, তাহলে সেটা কত আগে থেকে হতে পারে ধারণা আছে? আচ্ছা ধারণা করি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে দেশে এসেছে। তার মানে ২৯ জানুয়ারি অর্থাৎ আজ থেকে ৬২ দিন আগে।তারমানে বাংলাদেশ করোনা আক্রান্তের ৬২ দিন অতিক্রম করছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ইতালিতে ৩৯ দিনের হিসেবে আক্রান্ত ৮০১২২ মৃত ১০ হাজার। ইতালিতে মানুষ ৬ কোটি বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানে তিন গুণ অর্থাৎ বাংলাদেশে ৩৯ তম দিনে জ্যামিতিক হারে আক্রান্ত হওয়ার কথা ২০ লাখ মৃতের হিসাব টা হওয়ার কথা ৫০ হাজার।
বিশ্লেষণ (২)
যারা বিশ্বাস করেন সেব্রিনা ফ্লোরা প্রথমদিন সঠিক বলেছে অর্থাৎ ৮ মার্চ প্রথম রোগী ধরা পড়েছে। কিন্তু পরের তথ্য ভুল। তাহলে আজ ২৩ তম দিন অতিক্রম করছে দেশ, ইতালিতে ২৩ তম দিনে ৯১৫২ জন আক্রান্ত ছিল। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ইতালির ৩ গুণ সে হিসেবে গাণিতিক হারে বাংলাদেশে আক্রান্ত হওয়ার কথা ৩০ হাজার এবং জ্যামিতিক হারে ৮০ হাজারের অধিক।২৩ তম দিনে ইতালিতে মারা গেছিল ৩০০ জন সে হিসেবে আমাদের দেশে গাণিতিক হারে ৯০০ জন এবং জ্যামিতিক হারে আজ একদিনেই ১৮০০ জন মারা যাওয়ার কথা, সেই সাথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য আরও ২০০ যোগ করে হিসাবটা ২০০০ হওয়ার কথা ছিলো।কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখতে পারছি বলেন তো?
বিশ্লেষণ (৩)
আপনারা যারা বলছেন, সরকারের টেস্ট করা সক্ষমতা নেই,তাই নো টেস্ট নো পজেটিভ। আপনাদের এই পয়েন্টের সাথে একমত হয়েই আসুন উপরের তথ্য উপাত্তের সাথে একটু মিলিয়ে নেই। ধরেই নিলাম সরকারের সক্ষমতা নেই,তাই তারা নো তারা নো টেস্ট নো পজেটিভ নীতিতে এগোচ্ছে,তাহলে আজ সরকারি হিসাব অনুযায়ী মৃত রুগীর সংখ্যাটি হওয়ার কথা ছিলো ২০০০ এর উপরে কিন্তু সেখানে সরকারি হিসাবে করোনায় মৃতের সংখ্যা ০ এবং সোশ্যাল মিডিয়া সহ মূলধারার গণমাধ্যমে আসা করোনার উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন মৃতের সংখ্যাটা ১০(যদিও করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত কারো নমুনায় ই IEDCR এর পরীক্ষায় করোনা পজেটিভ পাওয়া যায় নাই)।কোথায় ২০০০ প্লাস আর কোথায় ১০,ব্যবধান টা আসলেই আকাশ পাতাল।
বিশ্লেষণ( ৪)
বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার জন্য এতোদিন একমাত্র ভরসা ছিলো IEDCR,তাদের সক্ষমতা নিয়ে আমাদের সকলের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। এই পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার ফোনকলের মধ্যে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ১৫০০ প্লাস,তারমানে আমরা বুঝতেই পারছি যাদের মধ্যে শতভাগ লক্ষণ বা উপসর্গ ছিলো তারাই নমুনা পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছে। এই শতভাগ উপসর্গের নমুনার মধ্যে এই পর্যন্ত করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে মাত্র ৫১ জনের যেটা আশংকার অনুপাতে খুবই নগণ্য।
তার মানে যুক্তিতর্কে গাণিতিক হিসাবে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে আমাদের পন্ডিত শ্রেণীর কোন যুক্তিই ধোপে টিকছে না, কারণ এখানে কিছু একটা ভৌগোলিক অথবা প্রাকৃতিক ফ্যাক্টর কাজ করছে যেই ফ্যাক্টর সকল গাণিতিক হিসাবকে পালটে দিচ্ছে। এই পন্ডিত শ্রেণীর প্রধান টার্গেট হচ্ছে সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করা। সরকার এটা পারছেনা, ওটা করছেনা এই বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে সরকারকে বিব্রত করা।অথচ বাংলাদেশের মত একটা মধ্যম আয়ের কাতারে শামিল হতে যাওয়া দেশের সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে সরকার যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির চ্যালেঞ্জ নিয়েছে তা এদের চোখে পড়েনা। সরকার যদি করোনা মোকাবেলায় শতভাগ সফল ও হয় তবু এই পন্ডিত শ্রেণীর মধ্যে সেটা স্বীকার মতো মানসিকতা এখনো তৈরি হয় নায়, এতোটাই মানসিক দৈন্যতা এদের।
আমি বিশ্বাস করি সরকার যা কিছুই করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল মেনেই করছে এবং গ্রীষ্মে উচ্চ তাপ, বর্ষায় উচ্চ আদ্রতা এবং আমাদের হার্ড ইমিউনিটি(রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
লেখকঃ ইমদাদুল হক সোহাগ
সাবেক শিক্ষার্থী, বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Facebook Comments Box


Posted ৮:১৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১