সোমবার, মার্চ ৯, ২০২০

বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দ

আর কে চৌধুরী   |   সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দ

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মহানায়ক। সেরা মুক্তি সংগ্রামী, সেরা রাষ্ট্রনায়ক। জননন্দিত নেতা হিসেবে তার তুলনা ছিলেন তিনি নিজেই। দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা ও দায়বোধ তাকে মহীরূহে পরিণত করেছিল। ব্যক্তি শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অস্তিত্বের শত্র“রা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেই হত্যা করতে চেয়েছে।
১৫ আগস্টের ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের যে কালো অধ্যায়ের সূচনা করে তার পরিণতিতে বারবার বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যে সাম্প্রদায়িকতা ও দ্বিজাতিতত্তে¡র বিভেদ নীতিকে বাংলাদেশের মানুষ কবর দিয়েছিল, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস চলে ১৫ আগস্টের পর থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বাংলাদেশের মানুষ খুনিচক্র এবং তাদের দোসরদের সে ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়নি। ১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় দেশবাসীর প্রত্যাশার পরিপূরক হিসেবে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং খুনিদের পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ইতিহাসের এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। সদ্য স্বাধীন দেশ গঠনে যখন সরকার ব্যস্ত, তখনই হত্যা করা হলো দেশের স্থপতিকে। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার নীলনকশা। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় চায়নি, বাংলাদেশের এমন শত্রু কম ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের বাইরে যেমন প্রত্যক্ষ শত্রুরা ছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেও তার আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রচ্ছন্ন বিরোধীদের শক্ত অবস্থান ছিল। দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের মদদে এ দেশেরই কিছু দুর্বৃত্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে জাতির জনককে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা কেবলমাত্র এক ব্যক্তিকেই হত্যার প্রয়াস ছিল না, ছিল জাতির স্বাধীনতার শক্তিকে হত্যার অপচেষ্টা। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তারা একটি আদর্শকে খুন করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুজিবাদর্শের বাংলাদেশকে তাঁর স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত করা যায়নি। স্বাধীনতার আদর্শকে নিরঙ্কুশ করতে এখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার কাজে অধিকতর মনোনিবেশ করতে হবে। যখন বিশ্বজুড়ে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সংকীর্ণ রাজনৈতিক মতবাদ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে তখন বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতার ত্যাগের আদর্শ বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমি ছিলাম ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধক্ষ। নগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কেমন চলছে? কিভাবে করলে ভালো হবে? কোথায় কি সমস্যা আছে? সেসব বিষয় নিয়ে আমরা (তৎকালিন নগর সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফা, সহ-সভাপতি ফজলুল করিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রহিম, কোষাধক্ষ আমি আর কে চৌধুরী) নিয়মিত সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করতাম। তারি ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট সন্ধ্যার পর আমরা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে তার সঙ্গে বসি। আলোচনা হয় দীর্ঘসময় ধরে । পুর্বের ন্যায় বঙ্গবন্ধুর মধ্যে সেদিনও ছিল খুব প্রানচাঞ্চচলতা। বঙ্গবন্ধুর কখনই ভাবেনি তার করা স্বাধীন বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ঘাতকরা তার ঘনিষ্টজনদের উপর নির্যাতন চালায়। আমাকে হত্যা করার জন্য কয়েকবার আমার বাড়িতে আক্রমন চালায়। তাদের অর্ত্যাচার থেকে বাঁচতে আমাকে ৬ মাস আÍগোপনে থাকতে হয়।
১৯২০ সালের আজকের দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বাধীনতার স্থপতি। তার অসাধারণ নেতৃত্বের গুণে তিনি কেবল বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবেই পরিগণিত হননি, নিজেকে তিনি নেতৃত্বের এমন এক সুমহান স্তরে সমাসীন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে একাত্তরে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা তার নাম বলতে বলতেই দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন। একাত্তরের ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দী করে। কিন্তু কী আশ্চর্য বন্দী মুজিব আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। রণাঙ্গণে প্রতিজন যোদ্ধাই হয়ে উঠলেই এক একজন মুজিব। তার নামেই পরিচালিত হল মুক্তিযুদ্ধ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অবশেষে বাঙালি পেল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতার জন্য বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ৬৬এর ৬ দফা, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর জীবন সবার জন্যই এক শিক্ষণীয় বিষয়। তার অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার জন্য আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি যেমন আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তেমনি দেশের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তাই বাঙালি জাতি চিরকাল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকে স্মরণ করবে। কবির ভাষায়, ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সভাপতি বাংলাদেশ ম্যাচ ম্যানুফ্যাকচারার এসোসিয়েশন, সদস্য এফবিসিসিআই এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।


Posted ৮:৪১ পিএম | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement