• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    বাজেট ঘোষণাই সব কিছু নয়, বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

    ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ০৩ জুন ২০১৭ | ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

    বাজেট ঘোষণাই সব কিছু নয়, বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

    নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার মেগা বাজেটের প্রস্তাব করেছেন। দেশবাসীকে উন্নয়নের চমক দেখাতে প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশাল বাজেটের সিংহভাগ অর্থাৎ ২ লাখ ৩৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে অনুন্নয়ন খাতে। বাজেটে নানা খাতে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাড়িয়ে আয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা।
    আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় এ বাজেটে ১ লাখ ৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকার ঘাটতি দেখানো হয়েছে। বাজেটে উন্নয়ন খাতে যে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে তা সাধারণ মানুষের প্রশংসা পাবে সন্দেহ নেই। শিক্ষা খাতে বাড়তি ব্যয় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখাবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়নবান্ধব পরিচিতি প্রস্তাবিত বাজেটের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে ঢালাওভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করতে গিয়ে সরকার যেভাবে ভ্যাট ও অন্যান্য কর বৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে তাতে নির্বাচনী বাজেটের ইমেজ বজায় থাকবে কিনা সংশয় রয়েছে। সেই ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের যেসব বাজেট এসেছে তার প্রতিটিই জনবান্ধব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
    বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে কখনই নাখোশ মনে হয়নি। সরকারের স্কন্ধে যখন পরবর্তী নির্বাচনের নিঃশ্বাস ফেলছে ঠিক সেই সময়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ব্যাংকে টাকা রাখলে করের বোঝা চাপানো কতটুকু যৌক্তিক তা বাজেট পাসের আগে ভেবে দেখতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও করের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপবে না। মধ্যবিত্ত ও বিত্তবানদের কাছ থেকে তা আদায় হবে। আক্ষরিক হিসেবে বক্তব্যটি যদি মেনে নেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রেও তা সরকারের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে তা ভেবে দেখার বিষয়। কারণ দেশে মধ্যবিত্তের ভিত ক্রমান্বয়ে জোরদার হচ্ছে। দেশ যখন মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে, তখন মধ্যবিত্তদের ওপর ভোগান্তি সৃষ্টির কর ও ভ্যাট প্রস্তাবের পরিণতি নিয়ে পূর্বাপর ভেবে দেখা উচিত। প্রস্তাবিত বাজেট ভালো কি মন্দ তা এর বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কল্যাণকর হবে না জনভোগান্তির কারণ ঘটাবে, তাও বাস্তবায়ন ক্ষেত্রের মুনশিয়ানার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে।
    এবার বাজেট সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে ব্যাংকের আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবে। সমালোচনা হচ্ছে ঘোষিত বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়াতেও। আশ্বাস দিয়েও করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ানোর এবং ব্যবসায়ীদের দাবি সত্ত্বেও করপোরেট করহার না কমানো নিয়েও সমালোচনা চলছে ব্যবসায়ী মহলে। স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ ব্যাংকে আমানত রাখে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় সেই আমানত এখন কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এমনিতেই ব্যাংকে রাখা আমানতের ওপর সুদ কমছে। তার ওপর রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ। এখন নতুন করে আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় আমানতের মূল টাকা কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন আমানতকারীরা।
    বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, ‘আমানতে আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে অর্থমন্ত্রী সৎ করদাতাদের কাছ থেকে সহজে কর আদায়ের চেষ্টা করছেন। যারা অর্থ পাচার করে বিদেশে তাদের প্রতিরোধ করার কোনো নির্দেশনা বাজেটে নেই। ’
    যাই হোক ১ লাখ টাকার ওপর ব্যাংকের আমানত থাকলেই যে বর্ধিত আবগারি শুল্ক দিতে হবে অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে কেউ ভালো চোখে দেখছেন না। সমালোচনা রয়েছে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়েও। ২০১২ সালে করা এ আইন ঘোষিত বাজেটে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে; যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে সিপিডি। ব্যবসায়ীদের চাপে অর্থমন্ত্রী ভ্যাটের হার কমানোর কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তার কথা রাখেননি। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ী সমাজে। এই ক্ষোভ মেটাতে নতুন আইনে অবশ্য ১ হাজার ৪৩টি পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর পরও প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নিয়ে সমালোচনা চলছে।
    বর্তমানে যে করমুক্ত আয়সীমা রয়েছে আড়াই লাখ টাকা এটি নির্ধারণ করা হয়েছে দুই বছর আগে। তার পর থেকে আর পরিবর্তন হয়নি। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল এবার বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হবে। অর্থমন্ত্রীও সে ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাড়ানো হয়নি সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমা। বাজেটে অর্থমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতি এই মুহূর্তে কম, তাই অপরিবর্তিত রয়েছে করমুক্ত আয়সীমা। ’ কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টিকছে না। সমালোচনা হচ্ছে এটি পরিবর্তন না করা নিয়েও। করমুক্ত আয়সীমা না বাড়িয়ে যেমন সমালোচিত হচ্ছেন অর্থমন্ত্রী তেমনি করপোরেট কর না কমিয়েও সমালোচনা হচ্ছে বাজেটের।
    করপোরেট করহার কম হলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ে। এমনিতেই বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল অন্তত সেই স্থবিরতা কাটানোর জন্য যেন করপোরেট করহার কমানো হয়। কিন্তু সেই দাবি অর্থমন্ত্রীর কানে পৌঁছায়নি। তিনি গতবারের মতো এবারও বাজেটে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রেখেছেন। এর বাইরে বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায়ও সমালোচনা হচ্ছে।
    বাজেটে ঘোষিত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি অর্জনের জন্য বেসরকারি খাতে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বিনিয়োগ লাগবে। আর সরকারি খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ লাগবে আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা কীভাবে আসবে তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় না হওয়ার পরও বছর বছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। বাজেটের ব্যয় মেটাতে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে মূসক বা ভ্যাট থেকে আয় ধরা হয়েছে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে যেখানে ২ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা যায়নি সেখানে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা কীভাবে আদায় হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
    বরাবরের মতো এবারও বাজেটে আয়ের প্রধান উৎস ধরা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের আয়কে। লক্ষ্য দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অন্যান্য উেসর সব আয় ধরেও বাজেটে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি। ঘাটতি মেটানো হবে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া ঋণ, সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং বৈদেশিক সহায়তা ও অনুদান থেকে। বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। বরাবরের মতো এবারও সরকারি দল ও শরিকদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত বাজেটকে গণমুখী এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে গণবিরোধী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
    উন্নয়ন বাজেট বা এডিপিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আটটি মেগা প্রকল্পে বড় বরাদ্দ থাকছে। বাড়ছে সামাজিক নিরাপত্তা নেটের আওতাও। এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রয়েছে যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে। এই খাতে বরাদ্দ ৪১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর পরই রয়েছে বিদ্যুৎ, শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি খাত।
    পরিশেষে বলছি, বড় বাজেট ঘোষণাই সব কিছু নয়। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বড় ধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বড় বাজেট জাতির আশা পূরণে সফল হবে না।
    লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী।e-mail: advahmed@outlook.com


    Facebook Comments Box


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757