• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    বাগদাদীর বিদায় আল হাশিমের আগমন অতঃপর?

    শেখ কনক | ০১ নভেম্বর ২০১৯ | ১১:৩২ অপরাহ্ণ

    বাগদাদীর বিদায় আল হাশিমের আগমন অতঃপর?

    ইসলাম ধর্মে কেয়ামতের আগে ইসা নবী আসবে এবং তার আগে যে কথিত খলিফা আসবে ও দাবিক নামক জায়গায় বিধর্মীদের সাথে লড়াই হবে ইব্রাহিম আওয়াদ আল বদরি ওরফে আবু বকর আল – বাগদাদী হলেন সেই ব্যক্তি – এমটিই দাবি করতেন আই এসের যোদ্ধারা। সে ধারণা থেকেই তাদের পতাকাও ছিল কাল রংয়ের।
    ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতক, কোরানিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রিধারি, ফুটবলার বাগদাদী এই বিংশ শতাব্দীতে এসে ফিরে গিয়েছিলেন হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ) জন্মেরও আগে সেই আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে। ইসলামের নামে এমন অজ্ঞতা, বর্বরতা এবং নিষ্ঠুরতা এখনকার পৃথিবীর মানুষ এর পূর্বে আর দেখেনি। ২০১৪ সালে আবুবকর আল- বাগদাদী নিজেকে ‘খলিফা ইব্রাহিম’ ঘোষণা করে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের তার প্রতি আনুগত্য দাবি করেন। সে সময়ে ইরাক ও সিরিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল দখল করে তিনি গঠন করেন ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড সিরিয়া বা আইসিস। দখলকৃত অঞ্চলে কঠিন শরিয়া আইন চালু করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষন, লুটপাট করে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে লক্ষ লক্ষ ইরাক সিরিয়ার নাগরিকদের। দেশ ছাড়তে গিয়ে সাগরে ডুবে প্রান হারায় শত শত নারি ও শিশু। সে সময়ে শিশু আইলানের সাগড় পাড়ে ভাসমান মৃতদেহ পৃথিবীর মানুষকে দুঃখে ভারক্রান্ত করে তোলে। অগনিত মানুষের মাথা কাল কাপড়ে ঢেকে এক কোপে সে মাথা দেহ থেকে বিছিন্ন করার ঘটনার ভিডিও প্রচার করে সারা পৃথিবীতে নৃশংসতার পূর্বের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এই স্বঘোষিত খলিফা। ২০০৪ সালের পর থেকে এই জঙ্গি গোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন প্রায় ১১ টি করে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আই এস যখন প্রথমে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিসনের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ায় তখন একে স্বাগত জানিয়ে বলেছিল, ‘ইসলামী ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মুসলিম ও তার শত্রুদের শেষ যুদ্ধ”। কিন্তু ভবিষ্যাদ্বাণীর ফল হয় উল্টো। মূলত সেই থেকে আইএসের ধীরে ধীরে কমতে থাকে দখলকৃত এলাকা। ২০১৭ সালের শেষের দিকে ইরাকের মসুল এবং সিরিয়ার রাকা আই এসের হাত ছাড়া হলেই মূলত বাগদাদীর কথিত খেলাফতের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।
    পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত জঙ্গিগোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে আইএস তাদের মধ্যে কেবল নৃশংসতার দিক থেকে শক্তিশালী ছিলো না তাদের সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশি শক্তিশালী ছিলো তা হলো, রাশিয়া তিউনিসিয়া সৌদিআরব সহ বহুদেশের প্রায় ৪০ হাজার বিদেশি যোদ্ধা যাদের সাথে ছিল সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর চাকরিচ্যুত তার জেনারেল ও গোয়েন্দা সামরিক কর্মকর্তারা। অর্থের দিক থেকেও এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী সংগঠনটি ছিল পৃথিবীর অন্য যে কোন সন্ত্রসী সংগঠনের চেয়ে অনেক বেশি সম্পদশালী। এদের নিয়ত্রনে থাকা এলাকার তেল বিক্রি, লুটতরাজ, কর ও মুক্তিপন আদায় করে এরা বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছিলো। সেই সাথে ছিল অত্যাধুনিক উপায়ে যোগাযোগ, অনলাইনে প্রচার এবং নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগাবার যোগ্যতা সম্পন্ন জ্ঞান। এ সকল মাধ্যম ব্যবহার করে তারা অতি সহজেই নতুন প্রজন্মকে মগজধোলাই করতে পারতো।
    ইসলামে জঙ্গিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে মূলত খিলাফতের শাসনামলে। ৬৫৮ সালে সিফফিনের যুদ্ধ সন্ধির মাধ্যমে অবসান হলে বিষয়টি আলী (রাঃ) এর পক্ষের একটি দল মেনে না নিয়ে তারা বলতে থাকেন যুদ্ধের ফলাফল কেবল আল্লার হাতে। মানুষ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে না। অর্থাৎ সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হতে পারে না। তারা বললো, আলী এবং মুয়াবিয়া কুরানের বিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাই তারা উভয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়ার যোগ্য। এই দল আলী এবং মুয়াবিয়া উভয়ের পক্ষ ত্যাগ করলো। ইতিহাসে এদের ‘খারেজি ‘ বলা হয়। যার শাব্দিক অর্থ হলো বের হয়ে আসা। এই খারেজদের দমন করতে আলী(রাঃ) এর ‘নাহরাওয়ানের যুদ্ধ’ নামে আর একটি যুদ্ধ করতে হয়। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে খারেজিরা গুপ্ত হত্যার পথ বেছে নেয়। ইবনে মুসলিম নামে একজন খারেজি ৬৬১ সালের ২৬ জানুয়ারী আলী (রাঃ) কে বর্তমান ইরাকের কুফার শাহী মসজিদের ভিতরে হত্যা করে। এ খারেজির অনুসারীরা ইসলামের নামে কেবল বেধর্মীদের উপরই জঙ্গি হামলা করে না বরং তাদের মতের সাথে না মিললে মুসলমানদেরও কাফের আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা করতে থাকে। আইএস জঙ্গিরা প্রথমে মুসলমান শিয়াগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে শিয়ারা ইসলামের আদর্শ বিচ্যুতি জনগোষ্ঠী। একই সঙ্গে তারা সিরিয়ায় হাজার বছর ধরে বসবাস রত খ্রিস্টান ও ইয়াজেদি জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম নৃশংসতা চালিয়ে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে ইসলামের ভাবমূর্তির অপূরনীয় ক্ষতি করে। তারা ইয়াজেদি সম্প্রদায়ের মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে প্রকাশ্যে নিলামে তোলে। তাদের ধর্ষণ করে ভিডিও ছেড়ে খোদ ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী কাজকর্ম করে ইসলামের ভাবমূর্তি সাংঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানুষকে মেরে মৃতদেহ ক্রুশবিদ্ধ করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রদর্শন করে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে জর্ডানের এক পাইলটকে পুর্ব ঘোষণা দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার মত ভয়ংকর বর্বরতার নজির স্থাপন করে।
    ২৩ বছর বয়সী মার্কিন তরুণী কায়লা মুয়েলার ২০১২ সালে সিরীয় শরনার্থীদের জন্য কাজ করতে তুরস্ক সিরিয়া সীমান্তে গিয়ে ছিলেন। ২০১৩ সালে তাকে সিরিয়ার আলেপোল্লে থেকে অপহরণ করে বাগদাদী নিজের আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। অবশেষে কায়লা মুয়েলারকে ধর্ষন ও হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয়, বাগদাদি নিজেই তাকে ধর্ষন ও হত্যা করেন। আমেরিকা বাগদাদীর হাতে হত্যার স্বীকার কায়লা মুয়েলারের নাম অনুসারে গত ২৬ অক্টোবর, শনিবার সকালে সিরিয়ার উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের ইদলিব প্রদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে “কায়লা মুয়েলার” অভিযানে একটি সুরঙ্গের ভিতরে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে তিন শিশু সন্তান সহ আত্মঘাতী বোমা ফাটিয়ে নিজেকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেন বাগদাদী।

    ইতিহাসের আরেক সন্ত্রাসী সংগঠন আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনের মতই সাগরে সমাহিত বাগদাদীর পতনে আইএস চ্যাপটার এখনি শেষ হয়ে যাবে এমনটি ভাববার কোন কারণ নেই।


    খেলাফতের স্বপ্ন তাদের আপাতত শেষ হয়ে গেলেও ইতোমধ্যেই তাদের ইরাক সিরিয়ার বাইরেও সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া সহ মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন দেশে। বাগদাদির পতনে হয়তো আইএস পূর্বের মত সংগঠিত হয়ে সহসাই হামলা চালাতে পারবে না তবে চোরাগোপ্তা হামলা কিংবা গুপ্তহত্যার মত ঘটনা যে ঘটতে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। ইতোমধ্যেই আইএস বাগদাদির মৃত্যু যেমন স্বীকার করে নিয়েছে তেমনি তারা তাদের পরবর্তী নেতা হিসেবে আবু ইব্রাহীম আল হাশিম আল কুরেশি নামে তাদের নতুন নেতার নাম ঘোষনাও করেছে। বাগদাদীরা মরতে থাকবে আল হাশিমদেরও জন্ম হবে। ধর্মের নামে তারা যেটা করবে সেটা হবে খারেজ বা বাতিলদের ধর্ম।
    ধর্মের নামে এ নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা আজ আর কেবল ইরাক কিংবা সিরিযার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন সারা পৃথিবীর বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।

    দুঃখ এবং আশ্চর্যের বিষয় দুনিয়াজুড়ে শতকোটি সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে একটাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যা মুসলমান পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে এই আইএস কিংবা বাগদাদীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়না। যার ফলে দিনকে দিন ইসলামের ভাবমূর্তি শুন্যের কোঠায় নামতে বসেছে। সময় এসেছে এখন সাধারণ ধার্মিক মুসলমানদের জঙ্গিবাদের পাল্টা ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে সোচ্চার হওয়া এবং ঐক্যবদ্ধ ভাবে আওয়াজ তোলা যে, বাগদাদীদের জঙ্গিবাদ আসলেই শান্তির ধর্ম ইসলামের ভাষা নয়, নয় স্বীকৃত কোন পথও। সেই সাথে সারা বিশ্বের আইনশৃংখলা বাহিনীরও সর্বদা সজাগ থেকে দৃঢ়তার সাথে প্রস্তুত থাকতে হবে এ ধরনের জঙ্গিবাদ রুখে দাঁড়াবার।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী