• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    বিচার বিভাগের মর্যাদা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না

    ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ২৫ মে ২০১৭ | ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

    বিচার বিভাগের মর্যাদা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না

    সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ (১৬তম) সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নবেম্বর হাইকোর্টে ৯ জন আইনজীবী এই রিট করেন। রিট কারীরা হলেন-এডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী, এডভোকেট একলাস উদ্দিন ভুঁইয়া, এডভোকেট ইমরান কাউসার, এডভোকেট মাসুম আলীম, এডভোকেট মো.সারওয়ার আহাদ চৌধুরী, এডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম, এডভোকেট নুরুল ইনাম বাবুল, এডভোকেট শাহীন আরা লাইলী, এডভোকেট রিপন বাড়ৈ।
    রিটে দাবি করা হয়, ষোড়শ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম অংশ। তাই ওই সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।
    রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, কতিপয় সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদে নিয়ে আসব। শুধুমাত্র এই গ্রাউন্ডের উপর ভিত্তি করেই এই ষোড়শ সংশোধনী করা হয়েছে। তিনি বলেন, এজন্য আমরা আদালতে বলেছি, এ সংশোধনী জনগণের মতামতে করা হয়নি। এখানে আর্টিকেল ৭ অনুসারে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। এমন কি আপিল বিভাগের রায়ের পরিপন্থী করা হয়েছে।‘শুধু তাই নয়, ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মহান স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পার্লামেন্ট থেকে যা নিয়ে এসেছিলেন তারও পরিপন্থী ।’
    এই রিটের শুনানিতে বলা হয় ‘ষোড়শ সংশোধনী একটি মেকি আইন (কালারেবল লেজিসলেশন) এবং এটা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ) ক্ষমতার পৃথকীকরণের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৯৪ (৪) এবং ১৪৭(২) অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ। এই সংশোধনী সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের (খ) দফাকে আঘাত করেছে। কেননা সংবিধানের ৭-এর ‘খ’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৌলিক স্তম্ভ পরিবর্তন করার কোনো বিধান নেই এ কারণে রুলের সারবত্তা রয়েছে এবং রুলটি সফল।
    সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চে পঞ্চম দিনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে নিম্ন আদালত কব্জা করে নিয়েছে সরকার, এখন সুপ্রিম কোর্টকেও কব্জায় নিতে চাচ্ছে। নিম্ন আদালত মানেই আইন মন্ত্রণালয়। এখন উচ্চ আদালতকে পার্লামেন্টের কাছে নিয়ে গেছেন। তাহলে বিচার বিভাগের কী থাকল?
    বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপদি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
    সরকার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন এর্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম। রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। শুনানিতে এটর্নি জেনারেল বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। সাংবিধানিক বিষয় এখানে জড়িত। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, এ অবস্থাতে বিচারপতিদের অপসারণ বা ইত্যাদির বিষয়ে কোনো আইন নাই। কাজেই এ বিষয়ে ত্বরিত গতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
    এটর্নি জেনারেল বলেন, আমি বলছি, হ্যাঁ নেয়া উচিত। আপনি বলেছেন, এ মাসেই শেষ করা সম্ভব। আমি বলেছি অবশ্যই শেষ করা সম্ভব। পুরো মে মাস পড়ে আছে। এরপর এটর্নি জেনারেল বলেন, ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে একটা বিরাট অংশের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে। সংসদ সদস্যদের মধ্যে কারা কারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এর তালিকা চাওয়া হোক।
    প্রধান বিচারপতি বলেন, এগুলো আমরা শুনানির সময় বা রায়ের সময় দেখব। জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, সংসদ সদস্যরা ক্রিমিনাল এটি যদি সঠিক না হয়, তাহলে রায় প্রদানকারী ওই বিচারপতিকে অপসারণ করা উচিত। এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারাইতো নিজ দলের সদস্যদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কেন পারছেন না? পার্লামেন্ট মেম্বাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন রেখেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এটার একটা ইতিহাস আছে। বিভিন্ন দেশে হর্স ট্রেডিং (এমপিদের ভোট কেনা বেচা) হচ্ছে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচারকদের ক্ষেত্রে হর্স ট্রেডিং হবে না এটার নিশ্চয়তা কী। প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আরও অনেক প্রশ্ন আছে।
    প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এটা পলিটিক্যাল ইস্যু। অনেক ইস্যু থাকে। ভাস্কর্যও একটা ইস্যু হয়ে গেছে। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, এটা পলিটিক্যাল ইস্যু নয়। এটার সাথে ওটা মিলাবেন না। নিম্ন আদালতের বিচার পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আদলতের ৮০ পার্সেন্ট সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে নেই। আপনি বলছেন, বিচার বিভাগ কার্যকর, এক জেলায় ৫ মাস ধরে জজ নেই। বিচার বিভাগ কার্যকর হলো কিভাবে? জবাবে এটর্নি জেনারেল জানান, বিচার বিভাগ যখনই অকার্যকর হয়ে যাবে, তখন দেশে অরাজকতা চলতে থাকবে।
    এরপর প্রধান বিচারপতি বলেন, নিম্ন আদালত মানেই আইন মন্ত্রণালয়। এখন উচ্চ আদালতকে পার্লামেন্টের কাছে নিয়ে গেছেন। তাহলে বিচার বিভাগের কী থাকল? এটর্নি জেনারেল তার জবাবে বলেন, বিচার বিভাগ এটা বলতে পারে না। আইন না থাকলেও রাষ্ট্রপতি বিচারপতি অপসারণ করতে পারবেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, এটা আপনি কি বললেন। আপনি তো হাজার বছরে পেছনে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন।
    এটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেন প্রধান বিচারপতি। এজলাসে মিডিয়া না থাকলে আরও কিছু প্রশ্ন তাকে করতেন বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। প্রধান বিচারপতি বলেন, মিস্টার এটর্নি জেনারেল, আরও কিছু প্রশ্ন ছিল। মিডিয়ার (সংবাদকর্মীদের) উপস্থিতির কারণে বেশ কিছু প্রশ্ন করলাম না। বিভিন্ন দেশের সংবিধান, বিচার বিভাগ ও আইন-আদালত এবং প্রধান বিচারপতির উদাহরণ টেনে আদালত বলেন, ওইসব দেশকে অনুসরণ করা উচিৎ আমাদের।
    প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার শুনানির (লিখিত বক্তব্য) কিছু শব্দের ব্যবহার দেখে আমার মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। কিন্তু মিডিয়ার উপস্থিতির কারণে সেসব প্রশ্ন করতে পারলাম না। কারণ, এসব প্রশ্ন মিডিয়ায় চলে যেতে পারে। কোর্ট উঠলে পরে এসে এই আপত্তিকর শব্দগুলো সংশোধন করবেন। এ সময় এটর্নি জেনারেল বলেন, আপনারা এগুলো নোট করে রাখেন পরে আমরা সংশোধন করে নেব।
    এরশাদের সময়ে আদালত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন। তখন এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে থাকা বিরোধী রাজনৈতিক জোট আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দল দাবি করে বলেছিল, সংসদে পাস করা সরকারের কোনো আইন আদালত যখন বাতিল করে দেয়, তখন ওই সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার থাকে না।
    বিচার বিভাগের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। মর্যাদার প্রধান কারণ হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। কাজেই বিচারপতিরাও স্বাধীন। ন্যায়বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব নয়।
    পরিশেষে বলছি, বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের সংশয় সৃষ্টি না হয় সেদিকে অবশ্যই সরকারকে সুদৃষ্টি দিতে হয়। বিচার বিভাগ এখনো স্বাধীন, জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর মর্যাদা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
    লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী। e-mail: advahmed@outlook.com


    Facebook Comments Box


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757