• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    বিজয়ের মাস ডিসেম্বর ও একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল

    অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান | ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

    বিজয়ের মাস ডিসেম্বর ও একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল

    বিজয়ের মাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ে ঢাকার বেঙ্গল প্লাটুনের কমান্ডার, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবীদ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির-এলডিপির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে। যিনি কর্মজীবনে একজন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে এর সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উপদেষ্টা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


    ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এর গঠিত প্রথম দল জনদল এর মাধ্যমে। ইসমাঈল হোসেন বেঙ্গল এই দলের ১নং প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এরই মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। পরে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি উক্ত দলে যোগ দেন এবং এই দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে সাবেক চাঁদপুর-৬ (বর্তমানে চাঁদপুর-৪) এবং ঢাকা-১০ (রমনা) আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পান। জাতীয় পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চীফ কর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল আমৃত্যু লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির-এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


    ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলের মুখে শুনা একটি মুক্তিযুদ্ধের কথা এখানে উল্লেখ করছি। যা শুনতে পাঠক জানতে পারবেন ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল কত বড় যোদ্ধা ছিলেন এবং দেশ স্বাধীনের পেছনে তার ভূমিকা কি ছিলো। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর।

    স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে এক এক করে সারাদেশ থেকে পাক হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের খবর আসছে। বিজয়লগ্নে বাংলার জনপদগুলোতে চলছে উল্লাসের মিছিল। এমনি অবস্থায় চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রাক্কালে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট (বাকি ইউনিট) কমান্ডার আবদুল্লাহিল বাকির নেতৃত্বে ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলসহ মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকার খিলগাঁওয়ের রাজাকার ক্যাম্প অ্যাটাক করার। তাদের টার্গেট ছিল খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ৮০ ফুট রোডে উৎপেতে থেকে পাক হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ করার।
    কারণ এই পথ দিয়ে ভারি অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা যাতায়াত করত এবং প্রতিদিন টহল দিত। তাদের সিদ্ধান্ত ছিল একসঙ্গে অতর্কিত আক্রমণ করে শত্রু নিধন করে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া। কমান্ডার বাকি দায়িত্ব দিলেন ৩ ডিসেম্বর রাতে অ্যাটাক করার। ঢাকায় ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলসহ যে কয়জন ছিলেন তার মধ্যে কমান্ডার বাকি, আমিরুস সালাম বাবুল ও ছোট ইসমাইল অন্যতম। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল ছোট ইসমাইলকে নিয়ে চৌধুরীপাড়ায় তার বন্ধু রতনের বাসায় অবস্থান করেন।

    ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল ও ছোট ইসমাইল চৌধুরীপাড়া থেকে মেরাদিয়ার উদ্দেশে রওনা হলেন। সেদিন ঢাকা শহরে হঠাৎ কারফিউ ঘোষণা করা হলো। সারা শহর সন্ধ্যা হতেই গভীর কালো আধারে জনমানবশূন্য অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা ২ জন মানুষ রাস্তার পাড় ধরে হেঁটে চলছেন মেরাদিয়ার দিকে। খুব সাবধানে পাক হানাদার বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে যেতে তাদের সময় লাগল প্রায় দেড় ঘণ্টা। সেদিন তাদের পাসওয়ার্ড ছিল ‘আছিও’। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল পাসওয়ার্ড ‘আছিও’ বলে চিৎকার করলে কমান্ডার বাকিও ‘আছিও’ বলে সাড়া দিলেন।

    সেদিন কায়েতপাড়ার ফকির খালির নগরপাড়া ক্যাম্প থেকে তাদের ডেপুটি কমান্ডার আতিকুর রহমান আতিক ও শফিকুর রহমান সহিদের নেতৃত্বে কায়েতপাড়া থেকে বালু নদী হয়ে অস্ত্র নিয়ে মেরাদিয়ায় আসার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও তারা না আসায় ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলসহ মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন অপারেশন বাতিল করলেন।

    পরবর্তী অপারেশনের দিন ঠিক করলেন ৪ ডিসেম্বর। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে বলা হলো তিনি যেন সকালেই ক্যাম্পে ফিরে যান। সবাইকেসহ অস্ত্র নিয়ে দ্রুত মেরাদিয়া আসেন। ওইদিন মেরাদিয়া থেকে ঢাকা ফেরার সময় খিলগাঁও চৌরাস্তা-সিপাহীবাগের মাঝামাঝি বাতেনের টেইলার্সের কাছে আসার পর কমান্ডার আবদুল্লাহিল বাকি ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে বললেন, তোমরা এখানে কোথাও থেকে যাও। সকালে ক্যাম্পে যেতে সুবিধা হবে। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল তার কাছে জানতে চাইলেন, এখন অনেক রাত হয়েছে, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কারফিউ এর মধ্যে ভয়াবহ অন্ধকার পরিবেশে যাওয়া কি ঠিক হবে?

    কমান্ডার আবদুল্লাহিল বাকি রিভালবারের বাটে হাত রেখে ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে উদ্দেশে করে ঢাকাইয়া স্টাইলে তার শেষ উক্তি শোনালেন, ‘আমরা গেরিলা, গেরিলারা কিছু ভয় পায় না’।
    তিনি ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে ও ছোট ইসমাইলকে রেখে আমিরুস সালাম বাবুলকে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল ও ছোট ইসমাইল বাতেনের বাড়িতে থেকে গেলেন। পরদিন সকালে কমান্ডার বাকির নির্দেশ মোতাবেক বালু নদী হয়ে কায়েতপাড়া ক্যাম্পে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে শেখের টেকের কাছে যেতেই অবিভিক্ত ঢাকার শেষ মেয়র গেরিলা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা, বক্সার আইয়ুব খান ও তৈয়ব আলী কমান্ডারের সঙ্গে ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলের দেখা।

    সাদেক হোসেন খোকা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গলকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাকিকে কোথায় রেখে এসেছিস? উত্তরে তিনি জানালেন ঢাকায়। তিনি তখনো জানতেন না কমান্ডার আব্দুল্লাহিল বাকি ও আমিরুস সালাম বাবুল পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের কাছেই জানতে পারলেন খিলগাঁও রেল কালভার্টের নিচে তাদের লাশের সন্ধান মিলেছে।

    কমান্ডার শহীদ আবদুল্লাহিল বাকি ও আমিরুস সালাম বাবুলের মতো ৩০ লাখ শহীদ ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর বিজয়ের মাসে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার জন্য যে ৩০ লাখ শহীদ আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। স্মরণ করি হাজার হাজার মা-বোনকে, যারা ইজ্জত সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। স্মরণ করি এদেশের সাধারণ মানুষকে যারা সহযোহিতা করতে গিয়ে ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

    মুক্তিযুদ্ধের বেঙ্গল প্লাটুন কমান্ডার, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল এ বছরের ৩১ আগস্ট সোমবার দুপুর দেড়টায় রাজধানীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল ছিলেন আমৃত্যু দেশপ্রেমিক। তার মৃত্যুতে এলডিপির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যা আমাদের পক্ষে পূরন করা অসম্ভব। আমি বিজয়ের মাসে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার রুহের মাগফিরাত কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

    লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673