বুধবার ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার দিন ফুরাল?

ডেস্ক রিপোর্ট   |   রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার দিন ফুরাল?

প্রশ্নটা মাথায় কয়েকদিন ধরে ঘুরছে- ডিজিটাল যোগাযোগ নিয়ে আমাদের উচ্ছ্বাস কি শেষ? কেন, ভালোই তো চলছে! এক স্মার্টফোনে জীবনটাই সহজ। পরিবার, স্বজন, প্রিয়জন- কাউকেই তো আর ছাড়া ছাড়া লাগে না। পৃথিবীর ওই প্রান্তে থেকেও যখন তখন বলা যায় ‘হ্যালো’। শুধুই কি বলা, দেখাও তো যায়। তাহলে সমস্যা কোথায়? টেলি-প্রযুক্তি সারাক্ষণ তো আমাদের আবেগকেই ছুঁয়ে যাচ্ছে। একদম নির্ভার। মান-অভিমান, ভাব-ভালোবাসা- সবকিছুর মাখামাখি তো ওই স্মার্টফোনেই। তাহলে কেন হইচই। এক পেগাসাস-কাণ্ডে কি সব শেষ! আর কি গোপনে বলব না কোনো ‘গোপন কথা’!

নিশ্চয় বলব- এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় অন্তত আমার মনে নেই। তবে যা আছে, সেটা উদ্বেগ। এই উদ্বেগ আমার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে, সুরক্ষা নিয়ে। কোথায় সেই সুরক্ষা? নিশ্চিত করে বলতে পারি, স্পাইওয়্যার পেগাসাসের মাধ্যমে আড়ি পাতার ঘটনা আমার মতো অনেকেরই উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস আর নির্ভরতার আবেগকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কাউকে বেশি, কাউকে কম।


বেশ ক’বছর আগের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘বেআইনি ভূমিকা’ রাখার অভিযোগ ওঠে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের বিরুদ্ধে। রাজনীতি বিষয়ে ব্রিটিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের তথ্য দিয়েছিল ফেসবুক। এ অভিযোগে ফেসবুক প্রধান মার্ক জাকারবার্গকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের শুনানিতেও হাজির হতে হয়। অল্প জ্ঞানে যা বুঝি, ফেসবুক তখন যা করেছে তা ‘মোটা বাণিজ্য’ ছাড়া কিছু নয়। কোটি কোটি গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সওদাগরি ছিল সেটি।

আর এবারে ঘটেছে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের ফোনে আড়ি পেতে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চৌর্যবৃত্তি। একটি হ্যাকিং সফটওয়্যারে হয়েছে কাজটি। সপ্তাহ, মাস বছর ধরে চলেছে। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানসহ ১৭টি সংবাদমাধ্যম যৌথ অনুসন্ধান চালিয়ে সম্প্রতি ফাঁস করেছে সেই ঘটনা।


অনুসন্ধানের শুরুটা অবশ্য স্বপ্রণোদিত নয়। ক্লু দিয়েছে প্যারিসভিত্তিক সংস্থা ‘ফরবিডেন স্টোরিস’ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ফাঁস হওয়া এক তথ্যভান্ডার বা ডেটাবেইসে কিছু ফোন নম্বর পায় তারা। রহস্য বুঝতে না পেরে জানায় সংবাদমাধ্যমকে। এরপর একযোগে অনুসন্ধান। ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’ নামে। যৌথ সে অনুসন্ধানেই বেরিয়ে আসে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার কাহিনি।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, স্পাইওয়্যার পেগাসাস দিয়ে যে ১৪টি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের মোবাইল ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ও ইরাকের প্রেসিডেন্ট বারহাম সালিহ। তালিকায় রয়েছেন ১০ জন প্রধানমন্ত্রী, যাদের তিনজন এখনও ক্ষমতায়। এরা হলেন- পাকিস্তানের ইমরান খান, মিসরের মোস্তাফা মাদবউলি ও মরক্কোর সাদ-এদিন আল ওথমানি। আড়ি পাতা হয়েছিল ফ্রান্সের অ্যাডওয়ার্ড ফিলিপে, বেলজিয়ামের চার্লস মিশেল, ইয়েমেনের ওবায়েদ বিন দাঘর, লেবাননের সাদ হারিরি, উগান্ডার রুহাকানা রুগুন্ডা, কাজাখস্তানের বাকিতজান সাগিনতায়েব ও আলজেরিয়ার নুরুদিন বেদুইর স্মার্টফোনে, যখন তারা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাদ পড়েননি মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহামেদও।

কার বা কত হাজার ফোনে আড়ি পাতা হয়েছে- সেটি ‘পেগাসাস কেলেঙ্কারি’র তাৎপর্য নয়। বরং কারা কী উদ্দেশ্যে আড়ি পেতেছেন, সেখানেই ঘটনার ভয়াবহতা। অনুসন্ধানকারীরা ‘মোটা দাগে’ যা বলেছেন, তা হলো- নজরদারির কাজটি চালিয়েছে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট নিশ্চয় আলাদা। যেমন- ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন ও আমিরাতের রাজকুমারী লতিফা আল মাখতুমের ফোনে একই উদ্দেশ্যে স্পাইওয়্যার দেওয়া হয়নি। হ্যাকড ফোনগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট বিশ্নেষণে একটি বিষয় পরিস্কার- আড়ি পাতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ফোন ব্যবহারকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নিজের অভিমত তৈরিতে তারা কোথা থেকে তথ্য নেন- সেটি জানা। ঠিক এমন উদ্দেশ্য থেকেই ২০১৮ সালে মেক্সিকোতে সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ অবরাডরের স্ত্রী, সন্তান, গাড়িচালক ও তার এক চিকিৎসকের ফোনে নজরদারি করা হয়।

স্পাইওয়্যার পেগাসাস কীভাবে কাজ করে সেটি এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়, তবে প্রাসঙ্গিক নিশ্চয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব পরিচালনাকারী ক্লডিও গার্নিয়েরি বলেছেন, যদি কোনো স্মার্টফোনে পেগাসাস সফটওয়্যার ঢোকানো যায়, তাহলে সেই ফোনটি চলে যায় আরেকজনের নজরদারিতে। ফোন মালিকের এসএমএস, কল, ছবি, ইমেইল- সবই তিনি দেখতে পান। এমনকি ‘নিরাপদ’ বলে পরিচিত হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যালের মতো অ্যাপের ‘এনক্রিপটেড’ বার্তাও তিনি পড়তে পারেন। গোপনে চালু করতে পারেন ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন। প্রশ্ন আসে- এসবের বাইরে ব্যক্তিগত বলে কি আর কিছু আমাদের আছে?

স্পাইওয়্যার পেগাসাস তৈরি করেছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘এনএসও গ্রুপ’। বিভিন্ন গোয়েন্দা দলিলে ২০১৬ সালেই সফটওয়্যারটি সম্পর্কে জানা যায়। ‘কিউ সুইট’ ও ‘ট্রাইডেন্ট’ নামে আগে ব্যবহার হতো এটি। ২০০৯ সালে হ্যাকিং প্রযুক্তি হিসেবে সফটওয়্যারটি বিক্রি শুরু করে এনএসও। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিশ্বের ৪০টি দেশের ৬০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেতা। শুধু সন্ত্রাসী, শিশুদের যৌন নিপীড়নকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও মানব পাচারকারীর মতো বড় অপরাধীদের ওপর নজরদারি করার শর্তেই তারা সেটি বিক্রি করে। প্রশ্ন হলো- ইমানুয়েল মাক্রোন, ইমরান খান, অ্যাডওয়ার্ড ফিলিপে, চার্লস মিশেল, ব্যারোনেস মঞ্জিলা পলা উদ্দিন অথবা রাজা ষষ্ঠ মোহামেদ- এরা সবাই কি মানব পাচারকারী নাকি মাদক ব্যবসায়ী?

আরও প্রশ্ন- ফোন বদলে কাজ হবে? বিশ্বে স্পাই সফটওয়্যারগুলোর মধ্যে পেগাসাসকে এখন সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করা হয়। তবে এমন সফটওয়্যার রয়েছে কয়েক হাজার। নানাভাবে এসব সফটওয়্যার স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি চালায়। আমরা প্রতিদিন যেসব অ্যাপ ব্যবহার করি, তার অনেকগুলোতে লুকিয়ে রাখা হয় স্পাইওয়্যার।

অনেকের ধারণা, ফেসবুকের মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য আদান-প্রদান হলে কেউ বুঝতে পারেন না। কারণ হোয়াটসঅ্যাপ ডেটা ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন’ বা অপঠনযোগ্য করে ফেলে। একই ধারণা প্রাইভেট মেসেজিং অ্যাপ সিগন্যাল, টেলিগ্রাম, বিপ এবং লাইন সম্পর্কেও। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। এসব অ্যাপে যোগাযোগের তথ্যও চুরি হয় পেগাসাসের মতো প্রযুক্তিতে।

টেলি-প্রযুক্তি উৎকর্ষের এই সময়টাই আসলে কঠিন। প্রযুক্তির সঙ্গে মূল্যবোধের যে সম্পর্ক তা ফিকে হয়ে আসছে দিন দিন। ক্ষমতা, কূটনীতি আর বাণিজ্যের কাছে গৌণ হয়েছে নীতিবোধ। তাই স্মার্টফোনের সঙ্গে আমাদের যে আবেগ তাতে পড়েছে অবিশ্বাস আর সন্দেহের রেখা। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বলতে হয়তো কিছুই আর নেই!

Facebook Comments Box

Posted ১:০৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০