বুধবার, জুলাই ৭, ২০২১

ভুসির দামেই মিলছে দুধ

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বুধবার, ০৭ জুলাই ২০২১ | প্রিন্ট  

ভুসির দামেই মিলছে দুধ

নরসিংদীতে দুধের দাম এখন ৪০ টাকা কেজি। পাঁচদিন আগেও বাজারে প্রতি কেজি দুধ বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দুধের দাম প্রতি কেজিতে কমেছে ২০ টাকা। অপরদিকে গরুর খাদ্য ভুসির দামও ৪০ টাকা। ভালো ভুসি কিনতে হলে প্রতি কেজিতে দাম দিতে হয় ৪০ টাকা। ভুসি এবং দুধ ভিন্ন হলেও দাম অভিন্ন। অর্থাৎ বাজারে এখন ভুসির দামে বিক্রে হচ্ছে দুধ। এতে প্রতিদিন লোকসান গুনছেন নরসিংদীর দুগ্ধ খামারীরা।

বিশেষ করে যারা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারি তারা এখন হতাশ। হঠাৎ করে দুধের দাম এতটা কমে যাবে তা তারা ভাবেননি। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ইটাখোলা মুনছেফেরচর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ কৃষক দুই বালতি দুধ নিয়ে বসে আছেন। দুধ কেনার মতো তেমন কোনো ক্রেতা নেই বললেই চলে। হাতেগোনা দু’একজন ক্রেতা থাকলেও দাম হাকায় ৪০ টাকা কেজি। এর বেশি দামে কেউ কিনতে চায় না। এতে বাধ্য হয়েই দুধ বিক্রি করতে হয় ৪০ টাকায়।


কিন্তু বৃদ্ধ কৃষক ৪০ টাকায় বিক্রি করতে নারাজ। তার বিবেচনায় অন্তত ৫০ টাকায় বিক্রি করতে না পারলে গাভি পালন করে লাভ হবে দূরের কথা গাভির খাবার জোগানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। এ জন্য তিনি মন খারাপ করে বসে আছেন ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রির আশায়। কিন্তু দেখাগেলো এ বৃদ্ধ কৃষকের আশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। অপেক্ষার বেলা বাড়লেও দাম বাড়ে না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ৪০ টাকা কেজি দরেই বিক্রি করে তাকে অসন্তোষ মনে অপূর্ণতা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।

দুপুর ১২টার দিকে নরসিংদীর ভেলানগর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এখানেও প্রায় একই অবস্থা। দুধ বিক্রেতার চেয়ে ক্রেতা কম। দু’একজন ক্রেতার আনাগোনা থাকলেও দাম ৪০ টাকার উপরে যেতে চায় না। কেউ কেউ আবার দুধ পাতলা না ভারি তা নিয়ে হাকাহাকি করেন। এমন দৃশ্যই লক্ষ্য করা গেছে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নরসিংদীর ভেলানগর বাজারে।


ইটাখোলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পরিচয় হয় কামাল মিয়া নামে একজন দুধ ক্রেতার সংগে। তিনি ইটাখোলা বাজার থেকে এক সংগে প্রায় ২০ কেজি দুধ কিনেছেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, দুধ কেনা বেচা করাই তার কর্ম। তার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের তেলিয়া ফুলপাড়া এলাকায়। প্রতিদিন তিনি এলাকার বিভিন্ন দুগ্ধ খামার থেকে চুক্তিভিত্তিক ৪৫ টাকা কেজি দরে নিজে দুধ দোহন করে ক্রয় করেন এবং সেই দুধ নরসিংদী শহরে মানুষের বাসায় বাসায় মাসিক চুক্তি অনুযায়ী ৭০ টাকা দরে বিক্রি করেন। কিন্তু গত প্রায় এক সপ্তাহের লকডাউনের প্রভাবে বাজারে ৬০ টাকার দুধ ৪০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। এজন্য তিনি কষ্ট করে খামার থেকে দুধ দোহন না করে সরাসরি ৪০ বা ৪৫ টাকায় বাজার থেকে ক্রয় করে শহরের বাসা-বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে কামাল মিয়ার কোনো লোকসান নেই। বরং লাভ ও সুবিধা বেশি। কিন্তু কামাল মিয়া লাভবান হলেও লোকসানের বোঝা বহন করছে খামারিরা।

শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার মো. আলকাছ মিয়া জানান, ৮ মাস আগে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি একটি অস্ট্রেলিয়ান জাতের গাভি ক্রয় করেছেন। দৈনিক দুধ দেয় ১০ থেকে ১২ কেজি। গাভি কেনার পর থেকে তিনি প্রতিদিন গড়ে ৬০ টাকা দরে বাজারে দুধ বিক্রি করতেন। কিন্তু গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিক্রি করছেন ৪০ টাকায়। এতে প্রতিদিন তিনি ন্যায্য দাম থেকে কম পাচ্ছেন ২০০ টাকা।

একই এলাকার বারিক মিয়া জানান, তার দেশীয় ক্রস জাতের ৬টি গাভি রয়েছে। সবগুলো থেকে দৈনিক মোট দুধ উৎপন্ন হয় ২০ কেজি। চলমান লকডাউনের আগে প্রতি কেজি দুধ বিক্রে করতেন তিনি ৭০ টাকা দরে। আর এখন বিক্রি করছেন ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। এতে তিনি প্রতিদিন কম পাচ্ছেন প্রায় ৬০০ টাকা।

তিনি আরো জানান, বাজারে দুধের দাম অন্তত কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা হলেও উৎপাদন খরচ উঠে আসে। এর কম হলে গাভি পালন করে কেউ লাভবান হতে পারবে না। কারণ দুধ উৎপাদন করতে গাভিকে ঘাস, খড় ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে ভুসি খাওয়াতে হয়। আর এ ভুসি এখন বাজার থেকে কিনতে হয় প্রতিকেজি ৪০ টাকায়। কাজেই ভুসির দামে দুধ বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসানই গুনতে হবে খামারিদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন, এই পরিস্থিতি এখন প্রায় সারাদেশেই। তবে দুধের নূন্যতম একটা দাম থাকা দরকার।

তিনি আরো জানান, তাদের অফিসিয়াল খাতাপত্রে নরসিংদী জেলায় মোট দুগ্ধ খামার আছে ১ হাজার ৪৫০টি এবং দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নরসিংদী পিছিয়ে নেই। জাতীয়ভাবে একজন মানুষের যেখানে প্রতিদিন ২৫০ মিলি লিটার দুধ খাওয়া উচিত, সেখানে নরসিংদীর ২২ লাখ ২৪ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে প্রতিদিন প্রতিজনে খেতে পারছে ২৬৩ মিলি লিটার। অর্থাৎ জাতীয়ভাবে নরসিংদীতে দুধের চাহিদা পুরণ করে মাথাপিছু ১৩ মিলি লিটার দুধ বাড়তি থাকে। এই বাড়তি দুধ সরবরাহ করা হয় ঢাকায়। কিন্তু করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে যদিও পণ্য সরবরাহে কোনো বাধা নেই তবুও সম্ভবত আগের মতো আর সরবরাহ হচ্ছে না। যে কারণে দুধের ন্যায্য দাম খামারিরা পাচ্ছেন না।

Posted ৩:০৭ পিএম | বুধবার, ০৭ জুলাই ২০২১

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement