• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময় দিন আজ

    কানতারা খান | ০৩ নভেম্বর ২০১৮ | ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ

    মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময় দিন আজ

    আজ ৩রা নভেম্বর। শোকাবহ জেলহত্যা দিবস। মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময়, রক্তঝরা ও বেদনাবিধুর একটি দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে চার জাতীয় নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একাত্তরের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন দেশ মাতৃকার সেরা সন্তান জাতীয় এই চার নেতাকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে একাত্তরের পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। প্রগতি-সমৃদ্ধির অগ্রগতি থেকে বাঙালিকে পিছিয়ে দিয়েছিল। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় বর্বরোচিত এ ধরনের হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
    বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এ চার নেতাকে কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা এ দিন প্রথমে গুলি ও পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন জাতীয় এই চার নেতা।
    মূলত যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার স্থতিকেও গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছিল স্বাধীনতার সময়েই। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় হায়েনাদের পক্ষে যা সম্ভব হয়নি, তা-ই তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির চার বছরের মাথায় জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে। তারপরও তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি। তারা ভালো করেই জানতো, বঙ্গবন্ধু চলে গেলেও তার আদর্শের বাহক রয়ে গেছে অনেক। সেই অনেকের চারজনকে যখন একসঙ্গে জেলখানায় পাওয়া গেল, তখন হায়েনারা আর সময় নষ্ট করেনি। চার নেতাকে তারা জেলখানায় ঢুকে হত্যা করে পাকিস্তান বিভক্তির প্রতিশোধ নিয়ে বুঝিয়ে দেয়, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে না।
    পৃথিবীর ইতিহাসে জেল হত্যা দিবস এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক শোকাবহ দিন। কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলার মাটি থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম চিরতরে মুছে ফেলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস ও বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।
    পৃথিবীর যে কোন আইনে জেলের ভিতর হত্যা করা একটা জঘন্য অপরাধ। সেই অপরাধের বিচার বন্ধ করা আরো বড় অপরাধ। কিন্তু লজ্জাজনক হলেও সত্য এই বিচার নিষিদ্ধ করে একটা সংশোধনী সংবিধানে সংযোজন করে হত্যাকারীদের নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করা হয়। পরে তাদের পররাষ্ট্র বিভাগের অধীনে চাকুরী দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়।
    জাতীয় ৪ নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার এ ঘটনায় তখনই লালবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হলেও দীর্ঘ ২১ বছর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখে সেই সময়ের সরকারগুলো। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার জেল হত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে। এরপর দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় বিচার কাজ চলার পর গত জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামির মধ্যে ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তার শাস্তি এবং অপর ৫ জনকে খালাস দেয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
    ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাসেম মৃধাকে খালাস দেন। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন হাইকোর্ট।
    হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সরকার পক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তবে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের গ্রেফতার করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়।
    ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল ওই আপিলের ওপর রায় দেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনা সদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করেন। আবুল হাসেম ও মারফত আলী দু’জন সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।
    পরিশেষে বলছি, যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়নি, তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। আবার সেই ব্যক্তিরাই বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সহকর্মী জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করেছে। তারা ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধু না থাকলে ও জাতীয় চার নেতা না থাকলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না। সেটাই ছিল তাদের প্রচেষ্টা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করা। তাদের সেই ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। তাই জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তার হাতে অনেক কাজ এখনো বাকি, সেগুলো সম্পন্ন করতে আরও বেশি শক্তি প্রদান করতে হবে তাকে। যুদ্ধাপরাধীদের, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার যেমনি জননেত্রী শেখ হাসিনা কার্যকর করেছেন তেমনি জেল হত্যায় জড়িতদেরও বিচার করবেন।


    লেখক : আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য, সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগের নির্বাচন পর্যবেক্ষক সমন্বয় উপ-কমিটির সদস্য।


    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4670