• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    মিয়ানমারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারিই হবে সর্বোত্তম পথ

    ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ | ১২ অক্টোবর ২০১৭ | ৮:৪৪ অপরাহ্ণ

    মিয়ানমারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারিই হবে সর্বোত্তম পথ

    সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারের ক্ষমতাদর্পী সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মিয়ানমারে যখন মানবতা বিপন্ন হয়ে পড়েছে তখন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর এমন চিন্তাভাবনা হতাশার মধ্যেও আশার আলো জাগিয়েছে।
    মিয়ানমারের জনসংখ্যার ৪০ ভাগই ১৪০টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, রোহিঙ্গারা এ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। শত শত বছর ধরে তারা আরাকান বা রাখাইনে বসবাস করছে। আরাকানে বর্মি আধিপত্য কায়েমের আগে থেকেই সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাস। ব্রিটিশ আমলে পরিচালিত শুমারিতে আরাকানের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর যেমন উল্লেখ রয়েছে তেমন ১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতার সময় নাগরিকত্ব আইনে আরাকানে বসবাসকারী রাখাইন, রোহিঙ্গাসহ সব জাতিগোষ্ঠীকে আরাকানি হিসেবে চিহ্নিত করে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এমনকি সামরিক শাসক নে উইনের সময় ১৯৬১ সালেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হতো।
    মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সে দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে বর্মি উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে। অহিংসার প্রতিকৃতি বৌদ্ধ ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাবিরোধী ডামাঢোল সৃষ্টি করে ক্ষুদ্র এ জাতিগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। এ গণহত্যাকে বৈধতা দিতে তারা আরসা নামে এক জঙ্গি সংগঠনের হামলাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করছে। রাখাইনে শান্তি বিনষ্টকারী জঙ্গি সংগঠন আরসার বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকার কিংবা সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া পদক্ষেপ নিয়ে সভ্য দুনিয়ার কিছু বলার নেই বা থাকা উচিতও নয়। কিন্তু গুটিকয়েক জঙ্গিকে দমনের নামে একটি ক্ষুদ্র জাতিকে যেভাবে তারা নিধনে উঠেপড়ে লেগেছে তা অপরাধ। এ অপরাধ কর্মকাণ্ডে মিয়ানমারের সেনা কমান্ডাররা যে জড়িত তা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য।
    যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন গণহত্যায় জড়িত মিয়ানমার সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তা তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড সামাল দিতে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। একইভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সামরিক উপকরণ বিক্রি বন্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবা যেতে পারে। মিয়ানমারের সেনা প্রধানসহ সামরিক অধিনায়কদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং বিদেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কথাও ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াও বাঞ্ছনীয়।
    প্রায় তিন দশক ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কখনো এ চেষ্টার সুফলও মিলেছে।
    ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সেই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমার সমাজের সদস্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর আওতায় রাখাইন রাজ্য থেকে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু ২০০৫ সালে প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেয় মিয়ানমার। এরপর রাখাইন রাজ্যে কয়েক দফায় অস্থিরতা তৈরি করে নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। সে প্রক্রিয়া এখনো চলছে। গত ২৫ আগস্ট নতুন মাত্রায় অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী।
    মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যা চলছে তা আসলে ‘গণহত্যা’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম বিষয়টিকে এভাবেই দেখছে।
    এর নীলনকশা প্রণয়ন করা হয় অনেক আগেই। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জনতোষণের লক্ষ্যে ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা প্রচার করতে থাকে, বৌদ্ধরাই মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিক। ১৯৭৪ সালে রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
    এ বছরের শুরুর দিকে ঢাকা সফরে এসেছিলেন মিয়ানমারের বিশেষ দূত। বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গার বিষয়ে উদ্বেগের কথা তাঁকে জানিয়েছিল সরকার। তিনি তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, আশ্রিতের সংখ্যা মাত্র দুই হাজার হতে পারে। আসলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নাগরিক বলেই স্বীকার করে না মিয়ানমার। কার্যত তারা রোহিঙ্গাদের ওপর ‘প্রতিশোধ’ নিচ্ছে। সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের কথায়ই এর প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করছেন তাঁরা। প্রসঙ্গত, ওই সময় রাখাইন জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের অধিবাসীরা জাপানিদের পক্ষ নিয়েছিল। রোহিঙ্গারা ছিল ব্রিটিশ তথা মিত্র বাহিনীর পক্ষে।
    বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হচ্ছে রোহিঙ্গা। তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের বসতি থেকে তাড়ানো হচ্ছে। ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার জন্য অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করা হয়। নির্বাচনে পরাজয় এড়াতে তখন সরকার এটি করেছিল। গত বছরের অক্টোবর মাসে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী নতুন করে নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। গত ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে বলে জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে।
    রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। তারা মিয়ানমারের ওপর চাপও প্রয়োগ করছে। মিয়ানমার চাপ অনুভব করছে বলেই রোহিঙ্গাদের আসার সংখ্যা কমছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। মিয়ানমারকে জাতি নিধনের বা প্রতিশোধ গ্রহণের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথ থেকে সরাতে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মহলকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে তাদের বাধ্য করতে হবে।

    লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম এবং প্রধান সম্পাদক দৈনিক আজকের অগ্রবাণী।
    e-mail: advahmed@outlook.com


    Facebook Comments


    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673