শুক্রবার ৬ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি কর্নেল (অবঃ) অলি আহমদ বীর বিক্রম

ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল   |   বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি কর্নেল (অবঃ) অলি আহমদ বীর বিক্রম

ডক্টর কর্নেল (অবঃ) অলি আহমদ বীর বিক্রম মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য ১৯৭১ যুদ্ধকালিন সময়ে সর্বপ্রথম বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেন। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার তিনি অন্যতম স্বাক্ষী।
ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন অলি আহমদসহ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা বিদ্রোহ করেন। ২৫ মার্চ ঢাকায় যখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সে সময় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ঝানঝুয়া এবং সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বিদ্রোহের শুরুতেই রেজিমেন্ট অধিনায়ক ঝানঝুয়া নিহত হন। এরপর ব্যারাকে ফিরে মেজর জিয়া আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এ সময় ক্যাপ্টেন অলি আহমদ তার সঙ্গেই ছিলেন। ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতেৃত্বে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র দখল করা হয়, সেখান থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
১৩ এপ্রিল রাতে মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে মিরসরাইয়ে যেতে বলেন এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে রাতেই রামগড় থেকে ৩৫ মাইল দূরে মিরসরাইয়ে এসে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ উপস্থিত হন। এ সময় তার সঙ্গে ছিল দুই প্লাটুন প্রাক্তন ইপিআর সদস্য এবং এক প্লাটুন নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্রের মধ্যে ছিল একটি তিন ইঞ্চি মর্টার, একটি মেশিনগান আর একটি ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী ছোট কামান। অলি আহমদসহ যোদ্ধারা যুদ্ধে গেরিলা কৌশল অবলম্বন করলেন। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় গোপনে রাস্তার দুই পাশে বাংকার তৈরি করে সেখানে অবস্থান নিলেন।
১৯ এপ্রিল ভোরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ নায়েক ফয়েজ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখলেন, প্লাটুন কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ও প্লাটুন হাবিলদার স্ব স্ব বাংকারে নেই। খবর দিয়ে দ্রুত তাদের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রস্তুতি শেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কে উঠেই চমকে গেলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। দেখলেন, একটি মাইক্রোবাস আসছে। তার একটু পেছনে একটি সাধারণ ৩ টনি ট্রাক। তার একটু পেছনেই সারিবদ্ধভাবে আসছে ২০টি সামরিক ট্রাকের বহর। প্রতিটিই সৈন্যবাহী ট্রাক। তিনি দ্রুত আড়ালে গেলেন। পুরো শত্রুবাহিনী তাদের অবস্থানে ঢুকে পড়তেই ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ফায়ার ওপেন করলেন। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে ধার করা ৭৫ মিলিমিটার-বিধ্বংসী কামান দিয়ে তিনি সবচেয়ে পেছনের ট্রাকটি ধ্বংস করে দেন। হাবিলদার সিদ্দিক মর্টার ফায়ার করে সামনে ও মাঝখানের তিনটি সামরিক ট্রাক উড়িয়ে দেন। অধিকাংশ শত্রুসেনা নিজ গাড়ির মধ্যেই নিহত হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুবাহিনীর গুলিতে হাবিলদার সিদ্দিক আহত হন। ল্যান্সনায়েক আবুল কালামও অতর্কিত এক মর্টার শেলের আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এ সময় আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। এ যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।
১৯৭১ সালে অলি আহমদ কর্মরত ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহরে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার পর নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন।
জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে তিনি সেনাবাহিনীতে তার চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দান করেন। তখন তার আরো ৯ বছর চাকরি ছিল। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি যোগাযোগ মন্ত্রী হন। যমুনা সেতুর কাজ তার সময়েই শুরু হয়। বিএনপিতে তিনি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। দীর্ঘকাল বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পর ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এলডিপি থেকে একক ভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। এরআগেও তিনি ছয়বার সংষদ সদস্য নির্বাচিত হন।
কর্নেল অলি আহমদ বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি’র প্রেসিডেন্ট, জাতীয় মুক্তিমঞ্চের আহ্বায়ক ও ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম (অবঃ) সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতার আদর্শের উজ্জল দৃষ্টান্ত। আজীবন তিনি দুর্নীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। নিজের প্রাপ্তির জন্য অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন নাই। মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান, দেশপ্রেম অতুলনীয়।
তিনি দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, ন্যায় বিচার এবং সুশাসনের জন্য সংগ্রাম করেই চলেছেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সর্বপ্রথম খেতাবপ্রাপ্ত সমর নায়ক। তার পিএইচডি অভিসন্ধিতে লেখা রাষ্ট্রবিপ্লব সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামক পুস্তিকায় অত্যান্ত পরিস্কার ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।রাষ্ট্রের এই দূরবস্হায় তার মত অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে হাল ধরা উচিত। অনেকে মনে করেন তিনিই হতাশযুক্ত জাতীকে মুক্তি দিতে পারবেন এবং আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করতে পারেন। আমি তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে দেখতে চাই। আমি বিশ্বাস করি তিনিই পারবেন দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, ন্যায় বিচার এবং সুশাসনের বাংলাদেশ গড়তে।
লেখক: মুক্তিযুদ্ধা ও রাজনীতিবীদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি।

Facebook Comments Box


Posted ৮:২৬ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১