• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল অলির বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে জিয়া ও শওকত আলীর গোপনীয় প্রতিবেদনে

    বিশেষ প্রতিবেদক | ০২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৮:৪২ অপরাহ্ণ

    মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল অলির বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে জিয়া ও শওকত আলীর গোপনীয় প্রতিবেদনে

    ডক্টর কর্নেল (অবঃ) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বাংলাদেশের একজন প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী। ১৯৭১ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেন। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার তিনি অন্যতম স্বাক্ষী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।
    অলি আহমেদের পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার চন্দনাইশে। তাঁর বাবার নাম আমানত ছাফা এবং মায়ের নাম বদরুননেছা। তাঁর স্ত্রীর নাম মমতাজ বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে, দুই ছেলে।

    ১৯৭১ সালে অলি আহমদ কর্মরত ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহরে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার পর নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন।


    প্রতিরোধযুদ্ধকালে অলি আহমদের নেতৃত্বে এক দল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাইয়ে। ২০ এপ্রিল মিরসরাইয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে দুই ভাগে ছিলেন এবং সামনে ও পেছনে ছিল তাঁদের প্রতিরক্ষা। অলি আহমদ তাঁর সেনা চাকরির অভিজ্ঞতা জানতেন, পাকিস্তান সেনারা সাধারণত আক্রমণ করে ভোরে। সূর্য ওঠার আগে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে, সেই সুযোগে। এ জন্য তিনি সহযোদ্ধাদের ভোর থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত বিশেষভাবে সজাগ ও যুদ্ধাবস্থায় রাখতেন। প্রতিদিন তিনি খুব ভোরে উঠে প্রতিরক্ষা তদারক করতেন। ২০ এপ্রিল সূর্য ওঠার আগে উঠে সহযোদ্ধা ফয়েজ আহমদকে নিয়ে প্রতিরক্ষা তদারক করছিলেন। সেখানে প্রতিরক্ষায় ছিলেন দুজন মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু তখন তাঁরা ছিলেন না। এটি ছিল এ মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রতিরক্ষার সবচেয়ে সামনের অবস্থান। কাউকে না পেয়ে তিনি শঙ্কিত এবং সম্ভাব্য এক বিপদের গন্ধ পান। সবাইকে সতর্ক করে সব সহযোদ্ধাকে স্ট্যাড টু পজিশনে পুনর্বিন্যাস করেন। এই পজিশনকে সামরিক ভাষায় বলা হয় যুদ্ধাবস্থা। সম্ভাব্য যুদ্ধের সব ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করে অলি আহমদ পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে যান। আর তখনই তিনি দেখতে পান, ফাঁকা রাস্তায় সীতাকুণ্ড থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসছে একটি জিপ। নিমেষে সেটি ফরোয়ার্ড পোস্ট পজিশনে এসে সজোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে। অবাক অলি আহমদ দেখেন, জিপ থেকে লাফিয়ে নামছে ওই পজিশনে নিয়োজিত তাঁর দলের সেই দুই সহযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম এবং অন্য একজন। তাঁরা দুজন অলিকে জানান, পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁদের দেখে ফেলেছে। ধাওয়া করে আসছে। এর দুই মিনিটের মধ্যেই অলি ফাঁকা রাস্তায় দেখতে পান, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি জিপ ও ট্রাকবহর আসছে এবং দুই শ গজ দূরে থেমে শুরু করে ব্যাপক গোলাগুলি। এই আশঙ্কাতেই ছিলেন অলি আহমদ। এ জন্য সহযোদ্ধাদের তিনি আগেই প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে দ্রুতই প্রত্যুত্তর পায় পাকিস্তানি সেনারা। অলির ৫০ গজ দূরে মেশিনগান নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন দু-তিনজন সহযোদ্ধা। তাঁর নির্দেশে তাঁরা পাকিস্তানি বহরের একদম পেছনের গাড়ি লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। পাঁচ গজের মধ্যে এলএমজি নিয়ে পজিশনে ছিলেন তাঁর আরেক সহযোদ্ধা। তিনি তাঁকে বলেন জিপ লক্ষ করে গুলি করতে। গজ বিশেক দূরে ছিল মর্টার দল। তারা মাঝের ট্রাক লক্ষ করে মর্টারের গোলাবর্ষণ করে। তিনি নিজে রিকোয়েললেস রাইফেল দিয়ে পাকিস্তানিদের আঘাত হানেন। আরআরের ছিল মাত্র দুটি গোলা। একটি আমগাছের ডালে লাগায় কোনো ক্ষতি হয়নি পাকিস্তানিদের। দ্বিতীয়টি সরাসরি আঘাত হানে ট্রাকে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রাকে থাকা পাকিস্তানি সেনারা রাস্তার ওপর লাফিয়ে পড়তে শুরু করে। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করতে থাকে এদিক-সেদিক। এ সময় অলি আহমদের নির্দেশে গর্জে ওঠে মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্র। পাকিস্তানিরা ভাবেইনি যে মিরসরাইয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত অবস্থান। রাস্তার দুই ধার ছিল উন্মুক্ত। তারা পালাতেও পারেনি। বেশির ভাগ মারা পড়ে বা আহত হয়। খবর পেয়ে আরও পাকিস্তানি সেনা সেখানে আসে এবং যুদ্ধ যোগ দেয়। রাত ১০টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। অলি আহমদ অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সামান্য অস্ত্র এবং সহযোদ্ধা নিয়ে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করেন।

    কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রমের ১৯৭৪ সালের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের ওপর প্রয়াত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর শওকত আলী বীর-উত্তমের ইংরেজিতে লেখা মন্তব্যের বাংলা দাঁড়ায় এমন- ‘সাংগঠনিক ব্যাপারে এই কর্মকর্তার রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী এবং বর্তমান পদবি থেকেও বড় দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই কর্মকর্তা একদিন সেনাবাহিনীর সম্পদ হতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কার্যত তিনি ছিলেন প্রথম কর্মকর্তা যিনি ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে একাত্তরের ২৫/২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণার ব্যাপারে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন।’

    এ মন্তব্যটি জেনারেল মীর শওকত লিখেছিলেন ১৯৭৪ সালের ৮ মার্চ। এ দলিলটি স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যে বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আছে তার অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ কর্নেল অলি সব কিছু অবহিত করার আগে জিয়াউর রহমান কোনো কিছুই অবহিত ছিলেন না। তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের কাজে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর খবর তাঁকে প্রথম কর্নেল অলি জানান।

    উল্লিখিত বার্ষিক প্রতিবেদনের শেষাংশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর-উত্তর ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে লিখেছিলেন, ‘তিনি (কর্নেল অলি) পরিপূর্ণভাবে অনুগত এবং অত্যন্ত সাহসী একজন অফিসার। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত এবং কর্মোদ্যোগী।’ জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় জেড ফোর্সের কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক ভূষিত হয়েছেন বীর-উত্তম খেতাবে। কর্নেল অলি আহমদ যুদ্ধের সময় জেনারেল জিয়ার অধীনে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। জেনারেল শওকত ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। এ তিনজনের মধ্যে দুজনই প্রয়াত হয়েছেন। এখন শুধু বেঁচে আছেন কর্নেল অলি আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের যে ঘটনাপ্রবাহ, তার সঠিকতা নিরূপণে এ তিনজনের স্বাক্ষরিত একটি দলিল মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ।

    ওই প্রতিবেদনে জেনারেল শওকত লিখেছেন, ২৫/২৬ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছে বলে কর্নেল অলি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অবহিত করেন। অর্থাৎ ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা তাদের অধীন অফিসারদের অসাধারণ ও অনন্য কাজগুলো তুলে ধরেন, যাতে তা দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ওই অফিসারের পেশা পরিকল্পনায় সহায়ক হয়। এ ক্ষেত্রে জেনারেল শওকত কর্নেল অলির বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন, অন্য কিছু নয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান ওই একই প্রতিবেদনের একই পৃষ্ঠায় কর্নেল অলি সম্পর্কে সব ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ওই লেখায় জেনারেল জিয়াউর রহমান জেনারেল শওকতেরও ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে তার মন্তব্য লিখেছেন। সুতরাং জেনারেল শওকত প্রতিবেদনে যা লিখেছেন তাতে যদি কোনো অসত্য কথা থাকত তাহলে জেনারেল জিয়া ঊর্ধ্বতন অফিসার হিসেবে সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে নিজের মতামত দিতে পারতেন। বরং জেনারেল জিয়া কর্নেল অলি সম্পর্কে আরো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী