শুক্রবার ৬ই আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মুজিব জন্মশতবর্ষ: গর্বের ও গৌরবের শাশ্বত অধ্যায়

সৈয়দ নাজমুল হুদা   |   বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২০ | প্রিন্ট  

মুজিব জন্মশতবর্ষ: গর্বের ও গৌরবের শাশ্বত অধ্যায়

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি মহাধুমধামে উদযাপনের বেশ জোরে শোরেই মহাপ্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমি কিছু পরিকল্পনা। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালনের মাধ্যমে ক্ষনগননা শুরু করা হয়েছে। সময় ও দিন সম্পর্কে কিছু সচেনতা নেওয়া হয়েছে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে আর দ্রুতগতিতে সময়টি আমাদের সামনে এগিয়ে আসছে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম ১৯২০ সালে এই মহান নেতার। ওই বছর বাংলাদেশের মাটিতে কত শিশু জন্ম গ্রহণ করেছে তার কোন সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে যারাই জন্ম গ্রহন করূক তারা খুবই ভাগ্যবান। বিশেষ করে ১৭ মার্চ দিনটিতে জন্মগ্রহণকারী সকল শিশু। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজনকৃত এই দিনটি ইতিহাসের পাতায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বছরটি হবে বঙ্গবুন্ধর জন্মশতবর্ষিকী। অসম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠা দেশটির এই নেতার জন্মদিনে কিছু স্মৃতিচারণায় সামিল হতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করছি। ১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। সাংবাদিকেরা বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালে তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে বললেন “আমি আমার জন্মদিনের উৎসব পালন করি না। এই দুঃখিনী বাংলায় আমার জন্মদিন ই বা কি ! পশ্চিমাদের ইচ্ছামতে আমাদের প্রাণ দিতে হয়। এদেশের জনগনের জন্মের আজ নেই কোন মহিমা।” এমন মহান নেতার জন্মশতবর্ষিকী খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাসের পাতায়।
বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর স্বাধীনতা শব্দগুলি একে অপরের সাথে মিশে আছে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অসম্ভব। একটি তর্জনির ইশারায় বজ্রকন্ঠের দীপ্তস্বরে সাত কোটি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে। ছিল না কোন প্রশিক্ষণ, অস্ত্র কিংবা আর্থিক সামর্থ্য, কিন্তু ছিল নেতার নিদের্শনা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোন জাতি পাওয়া যাবে না যারা সামরিক ও পারমানবিক শক্তিধর দেশকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। এটা শুধুমাত্র বাঙ্গালী জাতিই পেরেছে। এজন্যই বাঙ্গালী বীরের জাতি। বাঙ্গালী পেরেছিল কারণ তাদের নেতা ছিল শেখ মুজিবুর রহমান। যার দক্ষ নেতৃত্ব আর সাহসের মাধ্যমে অমানিষার অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রী করা হয়েছিল পুরো জাতিকে। যার আলোয় আলোকিত ছিল গোটা দেশ। এজন্য অনেকে বঙ্গবন্ধুকে ‘নয়নের মনি’ বলে থাকে। যিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে ন্যায় আর শান্তির প্রতীক হিসাবে। যিনি ছিলেন রাজনীতির মহাকবি। একটি শোষণ-ব না আর পরাধীনতার থেকে এদেশের মানুষকে মুক্তি দিয়ে এনে দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন একটি ভূখন্ড, স্বাধীনতা, সংবিধান আর জাতীয় পতাকা। এ কারনেই তিনি বাঙ্গালীর জাতির পিতা। ১৭ মার্চ ইতিহাসের পাতায় একটি স্মরণীয় দিন। একটি আনন্দের দিন। একটি প্রতিবাদী ও জাতির মুক্তির দিন। কারণ এ দিনটিই বাংলাদেশে জাতীয় শিশু দিবস। বঙ্গবন্ধু ভালবাসতেন শিশুদের। কোমলে কঠোর আর ভালবাসায় অপরিসীম ছিলেন তিনি। তাঁর ছিল শিশুর মত আচরণ। ছিল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে অসম্পদায়িক চেতনার মানুষ। এ কারণে তিনি ছিলেন শিশুদের প্রতিনিধিস্বরূপ। তাইতো ১৯৯৬ সাল থেকে দিনটি শিশু দিবস হিসাবে ও পালিত হয়। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মা সায়েরা খাতুনের কোলে আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ করেন আজকের এই মহানায়ক। রোমানদের আগের বর্ষপঞ্জিকা ছিল চন্দ্রবর্ষের। সম্রাট জুলিয়াস সৌরবর্ষ পুঞ্জিকা প্রবর্তন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে আলোকবর্ষের কথা ইতিহাসে আছে। কিন্তু আমরা স্বাধীন বাংলায় নতুন একটি বর্ষ হিসাবে একটি বছর কে মুজিবের নামে পালন করছি। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার নামে একটি বছর যার সাথে জড়িয়ে আছে স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীও। ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে মুজিবর্ষের ক্ষনগণনা। আর এর মূল অনুষ্ঠানটি হবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের মধ্যে দিয়ে। যা শেষ হবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চে। এই স্বাধীনদেশে জন্ম নিয়ে ইতিহাসের একটি স্মরনীয় দিন দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য হওয়ায় আমরা সৌভাগ্যবান। আমেরিকা, চীন, জাপান, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া সহ বিশ্বের কোন দেশেই তাদের জাতির জনকের নামে এত জাকজমকপূর্ন ভাবে এ জাতীয় অনুষ্ঠান বা একটি বর্ষ আয়োজিত হয়েছে কিনা তা জানা নেই। তবে স্বাধীন বাংলায় মুজিববর্ষ পালন এটা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীন বাংলার সফল রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু কন্যা তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই বাংলায় যথাযোগ্য মর্যাদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে মুজিবশতবর্ষ। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর যে সকল দেশে বাঙ্গালী আছে, সেখানেই যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে এই বর্ষটি আর বর্ষের অনুষ্ঠানসমূহ। স্বাধীন বাংলায়, স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রতিটি শিশু থেকে শুরু করে বাঙ্গালীর হৃদয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর কর্মযজ্ঞ। স্বাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধু অমর ও অবিনশ^র। যতদিন বাঙ্গালী, বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জাতীয় পতাকা, সংবিধান, গনতন্ত ও দেশ থাকবে ততদিন রবে বঙ্গবন্ধু। একটি জাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্তি¦ক ও রাষ্ট্রগত চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌছাতে যিনি প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকেন তিনি হন সর্বজন স্বীকৃত নেতা। বাঙ্গালী জাতির জীবনে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তারিখে সেই বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। হাজার হাজার নিপড়িত নির্যাতিত মানুষের মনের অব্যক্ত কথা কবি তাঁর মহাকাব্যে ১৮ মিনিটে প্রকাশ করেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো নেতা পাওয়া যাবে না যে এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়েছেন। এ কারনেই বঙ্গবন্ধুকে অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা কোন অর্থনৈতিক পরিবর্তন কোন কিছুই স্বাধীনতার চেয়ে বড় হতে পারে না। শুধুমাত্র নেতৃত্ব আর সাহসীকতার এ জাতি আধুনিক মরণাস্ত্র সমৃদ্ধ দখলদার বাহিনীর হাত থেকে স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা ছিনিয়ে এনেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমাকে ফাঁসির মে নেওয়া হলেও আমি বলবো আমি বাঙ্গালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। সেই থেকেই মনের অজান্তেই বাংলা, বাঙ্গালী ও বাংলা ভাষা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রে। আর তাঁর জনক বঙ্গবন্ধু । যিনি বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ শ্রেণীর পেশার মানুষকে একত্রিত করে অসম্পদায়িক একটি গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ১৭৫২ সালে আমেরিকার বিপ্লবের কবি বলে খ্যাত ফিলিপ ফ্রেনিউ। যার কবিতার মধ্যে আজকের আমেরিকার বিপ্লবের প্রেরণা ও উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। যার কবিতায় কট্টর বিট্রিশবিরোধী সমালোচনা ছিল। যাকে বলা হয় আমেরিকার বিপ্লবের কবি। বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি বাংলাদেশ নামক দেশটির কবি বঙ্গবন্ধু। যিনি ১৮ মিনিটেই তার মহাকাব্যে খানিতে বিপ্লব, অনুভুতি, আবেগ আর দেশত্ব প্রেম তুলে ধরেছিল। দেশটিকে স্বাধীনতার ঘোষনা করেছিল। বাংলাদেশে এখন ঋতুরাজ বসন্ত বিরাজ করছে। বসন্তে অপূর্ব সেজেছে বাংলার রূপপ্রকৃতি। গাছে-গাছে ফুল, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চারদিক। শত ফুলের সমরাহে এবারের ১৭ মার্চ। নতুন একটি বর্ষ যার নাম মুজিববর্ষ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-“আজি হতে শত বর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছো মোর কবিতা খানি, কৌতূহল ভরে, আজি হতে শতবর্ষ পরে।
বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেনঃ ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৬ এর ৬দফা, ’৬৯ এর গনঅভ্যুস্থান, ’৭০ নির্বাচন, ’৭১ মক্তিযুদ্ধ সবই যেন ইতিহাসের পাতায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অবদান। বঙ্গবন্ধুর অবদান, ত্যাগ, তিতীক্ষা আর সংগ্রামের সফল স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন জাতি হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। যিনি এই স্বাধীনতার জন্য জীবনের প্রায় ১২টি বছর কারাগারে দিন কাঁটিয়েছেন। বাঙ্গালি জাতি চিরকাল এই মহান নেতাকে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। বঙ্গবন্ধুর চোখে অপারেশনের পর চোখে চশমা পরতেন। একটু চোখে তাঁর জ্যোতি কম থাকলেও খোদা তাঁর অন্তর চক্ষুর জ্যোতি এত বেশি করে দিয়েদিলেন যা দিয়ে সাত কোটি বাঙ্গালির ইচ্ছা-আকাঙ্খা আর মনের চাওয়া পাওয়া দেখতে পারতেন। মুজিবের সাহস আর সংগ্রামী জীবন বাঙ্গালি জাতির অনুপেরণার বাতিযর। বঙ্গবন্ধু অনন্তকাল রবে প্রতিটি বাঙ্গালির হ্নদয়ের মনিকোঠায়। প্রতিটি শিশুর শিক্ষাসুলভ আচরনের মধ্যে। বঙ্গবন্ধুকে অসীমের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই হবে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শণ ধারণ ও লালন করতে হবে প্রতিটি বাঙ্গালীকে। বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালি জাতির জন্য একটি গর্বের ও অহংকারের নাম। এটি শাশ্বত ও অতুলনীয়। এই মুজিবশত বর্ষে আমরা ভিশন-২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নত জাতিতে পরিনত হবো। পাশাপাশি দেশটি হবে বঙ্গবন্ধুর সোনর বাংলাদেশ। শুভ শুভ শুভদিন বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্মদিন।
সৈয়দ নাজমুল হুদা, শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

Facebook Comments Box


Posted ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১