• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    যেভাবে মুফতি হান্নানের উত্থান

    অগ্রবাণী ডেস্ক: | ১৩ এপ্রিল ২০১৭ | ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

    যেভাবে মুফতি হান্নানের উত্থান

    ১৭ বছর আগের ঘটনা। ২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া শেখ লুত্ফর রহমান কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তব্য রাখবেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেতে কয়েকদিন আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছে বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। আর দু’দিন বাকি আছে জনসভার। হঠাৎ মাঠের পাশে পুকুরের মধ্যে কিছু একটা নজরে আসে গোয়েন্দাদের। যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পান পুকুরের পানিতে আঁধডোবা একটি তার। সেই তারের সূত্র ধরে সভাস্থলে আবিষ্কার হয় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা। নিরাপত্তাবাহিনীর হিসেবে জনসভা চলাকালীন বোমাটি বিষ্ফোরিত হলে কয়েক হাজার মানুষ নিঃশেষ হয়ে যেতে পারতো। এছাড়া বোমাটি ছিল সভাস্থলে মঞ্চের কাছেই।


    বোমা পাওয়ার পর আরও তৎপরতা শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এবার জনসভার দিনই হ্যালিপ্যাডের কাছে আরও একটি পুঁতে রাখা বোমা উদ্ধার করা হয় সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উপস্থিতিতে। পুলিশ সেই বোমার কারখানার সন্ধান পায় কোটালীপাড়া মুফতি হান্নানের সাবানের ফ্যাক্টরিতে। ছড়িয়ে পড়ে হান্নানের নাম। দেশ ছাপিয়ে বিদেশের পত্র-পত্রিকায় নাম আসে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানের। এলাকায় সাদাসিধে সেই হান্নানের এমন ভয়ঙ্কর রূপ প্রকাশ পাওয়ার পর হতবাক সেখানকার মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করতে গিয়ে এই জঙ্গি নেতা সম্পর্কে ভয়ঙ্কর সব তথ্য খুঁজে পায়। গোয়েন্দাদের ভাষ্য মতে, হান্নানের বিশেষত্ব হলো তিনি পাকিস্তানে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশে নিজে বিভিন্ন জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। হান্নান আফগান স্টাইলে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অপতত্পরতা চালান। প্রথমে দেশি বোমা ব্যবহার করলেও পরে পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া বোমা বানানো এবং আক্রমণ বিষয়েও তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে এবং এ নিয়ে প্রশিক্ষণও দিতেন হান্নান। তার থাবায় বার বার কেঁপেছে গোটা দেশ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে মাজার রাজপথ জনসভা সংস্কৃতি অঙ্গন। জানা গেছে, আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়া এই জঙ্গি নেতা ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। তার আগ পর্যন্ত বিগত সাত বছরে এই জঙ্গির সরাসরি হস্তক্ষেপে সারা দেশে ১৭টি নাশকতার ঘটনা ঘটে। নিহত হয়েছেন ১০১ জন মানুষ। আহত হন ছয় শতাধিক। এসব ঘটনার একটি সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলা। এ মামলায় আদালত তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছে। গত রাতে এক সহযোগীসহ মুফতি হান্নানকে গাজীপুরের কাশিমপুর এবং অপর আরেক সহযোগীকে সিলেট কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা হয়। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অন্যতম গডফাদার মুফতি হান্নান যুগের অবসান ঘটল। গোয়েন্দাদের মতে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের গোড়াপত্তন ঘটে যে কজন ব্যক্তির হাত ধরে, তাদের অন্যতম হলেন এই মুফতি আবদুল হান্নান। শুরুতে পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ হুজি-বিতে যোগ দিয়ে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা বনে যান।

    ajkerograbani.com

    কে এই হান্নান : মুফতি হান্নানের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। আদালতে তার জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তার পড়াশোনা গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখান থেকে চলে যান ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায়। ১৯৮৭ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ভর্তি হন। সেখানে লেখাপড়ার সময় জয়েশ-ই-মোহাম্মদ, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী, আল কায়েদা, সিপাহি সাহাবা পাকিস্তান, হরকাতুল মুজাহিদীন, লস্কর-ই-তৈয়বা, হিযবুল মুজাহিদীন-এর মতো সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। আফগানিস্তানে গিয়ে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। সেই যুদ্ধে আহত হয়ে পেশোয়ারে কুয়েত আল-হেলাল হাসপাতালে ১০ মাস চিকিৎসা নেন। এরপর করাচির ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করেন। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ফিরে মুফতি হান্নান পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়ে কাজ করেন। এর কিছুদিন আগে আফগানফেরত এদেশীয় মুজাহিদরা গঠন করেন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) নামে উগ্রপন্থি সংগঠন। ১৯৯৪ সালের দিকে মুফতি হান্নান হুজি-বিতে যোগ দেন। অল্প দিনেই হুজি-বির শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন হান্নান।

    জঙ্গিবাদের প্রথম ছোবল : ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু। হুজি-বির কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ জন আহত হন। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। ওই হামলায় নিহত হন আটজন।

    চারবার হান্নানের নিশানায় শেখ হাসিনা : মুফতি হান্নান ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। ওই বছরের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে দুটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল যা সমাবেশের আগে পুলিশ উদ্ধার করে। এর একটি ছিল ৭৬ কেজি ওজনের বোমা। কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার আগে দূর-নিয়ন্ত্রিত এই বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ফরিদপুরে এক পীরের মাহফিলে। ২০০০ সালের ১৩ জুলাই ওই বোমা বিস্ফোরণে একজন নিহত হন, গুরুতর আহত হন সাতজন। কোটালীপাড়ায় হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০১ সালের ৩০ মে খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হুজি। কিন্তু তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদীতে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে যাওয়ায় সেটি আর সফল হয়নি। গ্রেফতার হওয়া ওই ১৫ জনই মুফতি হান্নানের নেতৃত্বাধীন হুজির সদস্য। মুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে আরও জানা যায়, ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শেখ হাসিনা সিলেটে নির্বাচনী জনসভায় গেলে সেখানে বোমা পেতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা আঁটা হয়। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভাস্থলের কাছাকাছি ফাজিল চিশতি এলাকায় আরিফ আহমেদ রিফার ভাড়া দেওয়া মেসে বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে দুই বোমাবাজ নিহত হয়। এই বোমাই জনসভাস্থলে পুঁতে রাখার কথা ছিল। বার বার শেখ হাসিনাকে হত্যা পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২০০৪ সালে হুজির হাতে আসে আর্জেস গ্রেনেড। তখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলে। সে সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, নেতা ও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের সহযোগিতায় ২১ আগস্ট চূড়ান্ত হামলা হয় শেখ হাসিনার জনসভায়। আওয়ামী লীগ নেতারা এ সময় মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে প্রাণে রক্ষা করেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আইভি রহমানসহ ২২ নেতা-কর্মী। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মূল মঞ্চের ১৫-২০ গজ দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে বেষ্টনীর বাইরে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বোমা হামলায় ঘটনাস্থলে নিহত হন নয়জন এবং পরে আহত আরও একজন হাসপাতালে মারা যান। ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যান ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। ফেরার পথে ফটকের কাছে গ্রেনেড হামলায় আনোয়ার চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ তিনজন। মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন। এসব বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মুফতি হান্নানের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয়েছে। দুটির বিচার শেষ হয়েছে। মুফতি হান্নান ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর দুই দফায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে এসব হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ দেন। এর আগে ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেফতার হন মুফতি হান্নান। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

    Facebook Comments Box

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4757