• শিরোনাম



    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...


    যেভাবে সম্রাটের উত্থান

    ডেস্ক | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

    যেভাবে সম্রাটের উত্থান

    সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগে যে শুদ্ধি অভিযান চলছে তাতে প্রধান আলোচিত নাম হলো ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি সম্রাটকে নিয়ে নানারকম আলোচনা, নানারকম গুঞ্জন। সম্রাটের গল্প কাহিনী যেন রুপ কথাকেও হার মানাচ্ছে। তবে এই শুদ্ধি অভিযানে যারা আটক হচ্ছে বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তাদের সঙ্গে সম্রাটের মৌলিক একটা পার্থক্য রয়েছে। খালেদ বা জি কে শামীম যেমন ফ্রিডম পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, আবার কেউ কেউ যেমন জামাত, শিবির থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ব্যাপারটি তেমন নয়। সম্রাট ছোটবেলা থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেই বড় হয়েছে। তাঁর বাবা আওয়ামী লীগের ত্যাগী তৃণমূলের নেতা। আওয়ামী লীগের জন্য তাঁর ত্যাগ অবদান কেউই খাটো করে দেখে না। সম্রাটকে শুধু একজন সন্ত্রাসী, ক্যাসিনো ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজ বললে মস্ত ভুল করা হবে। তাঁর চরম শত্রুরাও মনে করেন সম্রাট যেকোন দলের জন্যই বড় একটা সম্পদ। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন তোলে না। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই স্বীকার করেছেন যে হানিফ মায়ার পর ঢাকা মহানগরীতে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে সফল সংগঠক হলো ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছেন যে, যেকোন সময় ঢাকা মহানগরীতে ২০ থেকে ৪০ হাজার লোক জোগাড় করা তাঁর জন্য কোন ব্যাপারই না।


    কীভাবে উত্থান ঘটলো সম্রাটের?


    অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে, সম্রাটের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি হলো ছাত্রলীগের মাধ্যমে। মতিঝিল পাড়ায় ছাত্রলীগের মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু লেখাপড়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মধুর ছিল না সেজন্য ছাত্রলীগের রাজনীতিতে বেশিকিছু করতে পারেননি। পরবর্তীতে সম্রাট যুবলীগের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সাংগঠনিক দক্ষতায় সবার মন জয় করে ফেলেন। সম্রাটের ভালো গুণ ছিল যেকোন মানুষের বিপদে ঝাপিয়ে পরা, বিপদে সাহায্য করা। এভাবেই তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরু। শুধুমাত্র রাজনৈতিক সহকর্মী না যেকোন একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে গেল, তাঁর রক্তের দরকার, কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য কাউকে নিতে হবে কিংবা একজন গরীব মানুষের সহায়তা দরকার কিংবা একজন শিক্ষার্থীর বেতন বা পরীক্ষার ফিস বাকী পরে গেছে তাকে সহায়তা করা এই কাজগুলোর মাধ্যমেই সম্রাট পরিচিতি লাভ করেন।

    সম্রাট পাদপ্রদীপে আসেন ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের সংকটের সময়। এই সময় যখন বিএনপি জামাত জোটের তাণ্ডবে আওয়ামী লীগ দিশেহারা তখন সেই সময়ে ঢাকা মহানগরীতে আওয়ামী লীগের সংগঠন টিকিয়ে রাখাই দায় এবং আওয়ামী লীগের যে হেভিওয়েট নেতারা হয় পলাতক না হয় নিষ্ক্রিয় সেই সময় সম্রাটই হাল ধরেন আওয়ামী লীগের। বিশেষ করে ২০০৬ সালের শুরু থেকে আন্দোলন গড়ে তোলা হয় ঢাকা মহানগরীতে সেই আন্দোলনে সম্রাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সম্রাট সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি জামাত জোট সরকারের শেষদিনে পল্টন এলাকায় তাণ্ডব চালাতে চায় এবং আওয়ামী লীগের মিছিলের উপর আক্রমণ করতে চায়। তখন সম্রাট এবং তাঁর বাহিনী বিএনপি জামাতের আক্রমণের দাতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিল। এখান থেকেই সম্রাট আলোচিত এবং দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনে করা হত।

    ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মির্জা আজম। তাঁরাও সম্রাটের সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য তাকে পছন্দ করতেন এবং কাছে টেনে নেন।

    মূলত ২০০১ সালে সংগঠন চালানোর জন্যই চাদাবাজিতে হাতেখড়ি নেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। এসময় সংগঠনের টাকা জোগাড় করতে বিভিন্ন অফিসে ধর্না দেওয়া, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, বিভিন্ন ব্যবসায়ীক মহলের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ২০০৬ সালের পর যখন ওয়ান ইলেভেন আসে সেই সময় সম্রাট আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। এসময় দল পরিচালনা করা, যুবলীগের ঢাকা মহানগরীকে ঠিক রাখার মূল কাণ্ডারি ছিলেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট।

    এরপর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন রাতারাতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট একটা বড় ফ্যাক্টরে পরিণত হন। বিশেষ করে মতিঝিল পাড়ায় সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা আব্বাসের পতন ঘটলে একটা শূন্যতার তৈরি হয়। যদিও সেই শূন্যতা পূরণে সম্রাট সময় নেননি। দ্রুতই মতিঝিল পাড়া তাঁর দখলে চলে যায়। এই সময় তারসঙ্গে সিঙ্গাপুরের কানেকশন হয়। সিঙ্গাপুরে যে ক্যাসিনো বাণিজ্য এবং নানারকম ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। একদিকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির কাঁচা টাকা অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের হাতছানি দুইয়ে দুই মিলিয়ে সম্রাট নগরীতে আত্মপ্রকাশ করে। এখান থেকেই মূলত সম্রাটের বিচ্যুতি পর্বের সূচনা। এরপর সম্রাট সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান। সম্রাট সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে অর্থ উপার্জনের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন।

    সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য যুবলীগের চেয়ারম্যান পরিবর্তন হলেও যুবলীগের নতুন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও সম্রাটের ওপর নির্ভরশীলই থাকেন। যারফলে সম্রাটের স্বেচ্ছাচারী রাজত্ব কায়েম হয়। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং ক্যাসিনো বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ উপার্জন করে সম্রাট ‘রবিনহুডের’ জীবনযাপন শুর করেন। একদিকে তিনি গরিব দুঃখী মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেন, নিরন্ন মানুষকে রাত্রিবেলা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন অন্যদিকে তিনি ক্যাসিনো বাণিজ্যের মাধ্যমে যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যান। যুবসমাজকে বিপথগামী করার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করেন। সম্পদের পাহাড় গড়েন সিঙ্গাপুরে। এভাবেই সম্রাটের উত্থানপর্ব হয়েছে। একজন রাজনৈতিক কর্মী, যার সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত, যিনি একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ হতে পারতেন শুধুমাত্র অর্থলিপ্সার কারণে তিনি আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভিলেন। বাংলাদেশে আজ অপরাজনীতি বা রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের এক প্রতীক হলেন সম্রাট।

    Facebook Comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী


  • Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/ajkerogr/public_html/wp-includes/functions.php on line 4673