• শিরোনাম

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    যেসব কারণে শেখ হাসিনার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত

    ড. হারুন-অর-রশিদ ভাইস-চ্যান্সেলর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

    যেসব কারণে শেখ হাসিনার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত

    নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামের নেত্রী, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আউং সান সুচির দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের (যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম) ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর হিংস্র আক্রমণ, নির্বিচারে হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের পর গ্রাম ছারখার, নারী ধর্ষণ ইত্যাদি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১ লক্ষাধিক জীবন বিপন্ন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দানের কারণে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম এখন নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এমনকি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীন ‘অক্সফোর্ড নেটওয়ার্ক অব পিস স্টাডিজ’ (সংক্ষেপে ‘অক্সপিস’)-এর ২ জন খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. লিজ কারমাইকেল ও ড. এ্যান্ড্র গোসলার এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘পিস এ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর প্রধান ড. হেনরিক উরডাল শেখ হাসিনাকে ‘মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার পক্ষে বলেছেন।

    আয়তনে বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র (১ লাখ ৪৭ হাজার ৬ শত ১০ বর্গকিলোমিটার বা ৫৬ হাজার ৯শ’ ৯০ বর্গমাইল)। জনসংখ্যা ১৬ কোটির উর্ধ্বে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি দেশ এটি (২৮৬৪ জন প্রতি বর্গমাইলে)। দেশটিকে দারিদ্র্য, সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ, মাদক ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হচ্ছে। তাছাড়া মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের প্রধানত যেসব এলাকায় (টেকনাফ, কক্সবাজার, বান্দরবান) রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এসে আশ্রয় নিচ্ছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে সেটি খুবই স্পর্শকাতর।


    এক কথায় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার হুমকি সত্ত্বেও শেখ হাসিনা বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল ও সম্পদশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধ্বনি তুলে মেক্সিকো বর্ডারে কাঁটাতার বসানোসহ অভিবাসনবিরোধী নীতি অনুসরণ করে চলেছেন কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেখানে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যত্র থেকে উচ্ছেদ হওয়া আশ্রয়প্রার্থী মানুষের ব্যাপারে প্রায় ‘দরজা বন্ধ নীতি’ অনুসরণ করছে, তখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয় ও সাহসী।

    পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১ কোটি মানুষকে (মোট জনসংখ্যার এক-সপ্তমাংশ) প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতি প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে আজও অম্লান। তবে শেখ হাসিনার বেলায় শুধু সেই স্মৃতিই নয়, শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তাঁর ধমনীতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবাহিত। বাঙালীর জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বটে (যা ১৯৭১ সালে তাঁরই নেতৃত্বে অর্জিত হয়), তবে তিনি একই সঙ্গে ছিলেন সর্বোচ্চ এক মানবতাবাদী, যাঁর স্বপ্ন ছিল ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’। তিনি ছিলেন বিশ্ব শান্তির একনিষ্ঠ প্রবক্তা।

    তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার মধ্যেও নেতৃত্বের এ বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে বিদ্যমান। ১২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে জনসভায় ভাষণদানকালে তিনি বলেন, আমরা মানুষ। আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছি (ইত্তেফাক, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, পৃ. ১ ও ১৯)। পরে তিনি আরও ঘোষণা দেন, যতদিন তারা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন না, ততদিন বাংলাদেশ তাদের পাশে থাকবে’ (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, পৃ. ১)।

    সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই।’ শান্তি, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে শেখ হাসিনার এ অবস্থান নতুন নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে বিদেশে অবস্থান করায় একমাত্র বোন শেখ রেহানা ব্যতীত পিতা-মাতা, ভাইসহ পরিবারের সকল সদস্যকে তিনি হারান। বাংলাদেশ সেনা শাসনাধীনে পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িক ধারায় ফিরে যায়। জনগণের ভোটাধিকার হরণ হয়। গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। এমনি এক সম্পূর্ণ বৈরি অবস্থায় ১৯৮১ সালে বিদেশে নির্বাসনে থাকাকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। শুরু হয় ‘ভোট ও ভাতের অধিকার’ প্রতিষ্ঠার নামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁকে এ সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে দেশে সেনা শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা পায়।

    ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ ২১ বছর শেষে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার গঠিত হলে প্রথমেই আইনের শাসন ও মানবতাবিরোধী কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে (১২ নবেম্বর ১৯৯৬) জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথ তিনি উন্মুক্ত করেন। সাধারণ আইনে বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়া শেষে এদের অনেকের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এদেশীয় যেসব দোসর মানুষ হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাঁর সরকার সাধারণ ট্রাইব্যুনালে সেসব চিহ্নিত অপরাধীর বিচারের ব্যবস্থা করে এবং মৃত্যুদ-সহ তাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় কার্যকর করা হয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ৩ পার্বত্য জেলায় দুই দশক ধরে চলছিল সশস্ত্র সংঘর্ষ ও বিদ্রোহ। উভয়পক্ষে অনেক রক্তক্ষয় ও প্রাণহানি ঘটে। ৫৫ হাজার পাহাড়ী অধিবাসী পাশ্ববর্তী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নেয়। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নিতে থাকে বিচ্ছিন্নতাবোধ। শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও নেতৃত্বে তৃতীয় কোন পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে তাঁর সরকারের স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘শান্তি চুক্তি’। এরপর থেকে পার্বত্য অঞ্চলে বিরাজ করছে শান্তি। এই একটি অবদানের জন্যই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য (যদিও স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক তিনি এই পদকে ভূষিত হন)। নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনা বিশ্বে এক রোল মডেল। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে তিনি ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করে চলেছেন। তাঁর সরকারের আমলে দারিদ্র্যসীমা ৪৪ শতাংশ থেকে নেমে ২২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (চরম দারিদ্র্য এখন ২২ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ)। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে তাঁর সরকার কর্তৃক গৃহীত হয় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী। পল্লী অঞ্চলে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য স্থাপন করা হয় একটি করে কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক। বিদ্যুত উৎপাদন ৩২০০ মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে তা ১৫০০০ মেগাওয়াটের অধিক। তাঁর সরকারের ৯ বছরে জনগণের মাথাপিছু আয় ৭০০ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তা এখন ১৬০২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার এক দশক ধরে ৬.৫ শতাংশের কাছাকাছি অব্যাহত থাকে এবং ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে তা দাঁড়ায় ৭.২ শতাংশে। দেশে সাক্ষরতার হার এখন ৭২ শতাংশের উর্ধে।

    আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শান্তির পক্ষে এবং সর্বপ্রকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবেলায় তাঁর ‘সন্ত্রাসবিরোধী আঞ্চলিক ফোরাম’ গঠনের প্রস্তাব এ অঞ্চলের দেশসমূহের নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাশ্মীর প্রশ্নে দুই পারমাণবিক অস্ত্র শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিলে শান্তির দূত হিসেবে তিনি ছুটে যান ঐ দুই দেশে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিসেনা প্রেরণকারী দেশ। অন্যান্য দেশের সঙ্গে এ দেশের শান্তিসেনারা আফ্রিকাসহ বিশ্বের জাতিগত সংঘাত-সংঘর্ষ কবলিত দেশসমূহে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও অশিক্ষা দূরীকরণ, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, বিরোধ মীমাংসায় সশস্ত্রপন্থা পরিহার, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা জাতিগত সংঘাতসহ যে কোন বিরোধ মীমাংসা ইত্যাদি সুপারিশসহ শেখ হাসিনা ২০১১ সালে জাতিসংঘে এক শান্তির মডেল পেশ করেছিলেন, যা সাধারণ পরিষদে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়।
    স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে ঈর্ষণীয় সাফল্য-অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এর মূল কৃতিত্ব শেখ হাসিনার নেতৃত্বের। ‘দিন বদলের সনদ’ বা ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে উন্নয়নের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে তিনি দৃঢ়পদে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীর সীমানায় আবদ্ধ না থেকে তা আজ বিশ্বসভায় উন্নীত ও যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বীকৃত। শান্তি, উন্নয়ন, সহাবস্থান, বৈষম্য দূর ও মানবাধিকারের পক্ষে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কী অভ্যন্তরীণ কী বৈদেশিক উভয়ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। তাই সার্বিক বিবেচনায় বিশ্বশান্তির নেতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি শেখ হাসিনারই প্রাপ্য।

    Comments

    comments

    কোন এলাকার খবর দেখতে চান...

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে আজকের অগ্রবাণী