বুধবার, জুন ১০, ২০২০

‘যে বাংলাদেশ আমাকে ডাক্তার বানিয়েছে, সেদেশের বিপদে পাশে থাকবো না!’

  |   বুধবার, ১০ জুন ২০২০ | প্রিন্ট  

‘যে বাংলাদেশ আমাকে ডাক্তার বানিয়েছে, সেদেশের বিপদে পাশে থাকবো না!’

‘বাংলাদেশের প্রতি ওনার প্রচুর টান। বাংলাদেশ বললেই অন্যরকম হয়ে যান তিনি। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য সেবা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের এখন ক্রান্তিকালেও কিছু করার জন্য ছুটে গেছেন। বাংলাদেশে যাওয়ার কিছুদিন আগে বললাম, সবাইকে রেখে এভাবে কি দেশে যাওয়া ঠিক হবে? উত্তরে তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, বলো কি তুমি! যে বাংলাদেশে আমার জন্ম, যে দেশে আমার শেকড়। যেই বাংলাদেশ আমাকে ডাক্তার বানিয়েছে, সেই বাংলাদেশের বিপদে আমি পাশে থাকবো না! এটা কোনভাবেই হতে পারে না। কথাগুলো বলতে বলতে ওনার চোখ ভিজে ওঠে। আমি আর বাধা দেইনি, জানি আমার বাধা মানবে না। দুই ছেলেও বললো, এই যুদ্ধে বাবাকে আটাকানো যাবে না। বাবার মনোবল চাঙ্গা রাখতে ছেলেরাও উৎসাহ দিয়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন নিউইর্য়কের জনপ্রিয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা বেগম দিনা।
আজ বুধবার সকালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের ছাত্রজীবনের রাজনীতি, বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, করোনাকালীন সময়ের ভূমিকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন দিনা।
মানুষের বিপদে পাশে থাকা এবং মানুষের জন্য কিছু করার ব্যাকুলতা ডা. ফেরসৌসের মাঝে সারাক্ষণ থাকে জানিয়ে আঞ্জুমান আরা বলেন, ‘আসলে উনি সবসময় মানুষকে সহযোগীতা করতে চান এবং এটা তিনি পছন্দ করেন। আমি উনাকে অনেক বছর ধরে চিনি। ১৯৯৮ সালে বিয়ের ৬ বছর আগে থেকেই, যখন আমি স্কুলে পড়ি। উনি মানুষকে সহযোগীতা করতে গেলে কোনো কিছুই চিন্তা করেন না। করোনাকালে হোক আর অন্য কোনো দুযোর্গকালীন অবস্থায় হোক। মানুষের বিপদের কথা শুনলে তিনি বসে থাকতে পারেন না। নিজের সাধ্য অনুযায়ী ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি দীর্ঘদিন ধরেই। আর এটা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গেই করেন। মানুষের সেবায় সারাটি জীবন নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আমার স্বামীর এইসব কাজে আমি গর্বিত। এমন মানুষটিকে আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি, যিনি মানুষের কথা চিন্তা করেন, মানুষকে ভালোবাসেন। বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাঁর, দেশকে খুব ভালোবাসেন।’
স্বামীর বিষয়ে বলতে থাকেন দিনা, ‘করোনাকালে নিউ ইর্য়কে করোনা আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছিল, সেই সময়ে নিউ ইয়র্কের অনেক চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে ঘরবন্দি হয়েছিলেন। আমাদের বাংলাদেশি প্রবাসীরা অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য একের পর এক ফোন দিত। সেই সময় দেখেছি দিন-রাত সব সময় মানুষের চিকিৎসা সেবাসহ সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করেছেন। যে সময় নিউ ইয়র্কে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস করতো না, সেই কঠিন সময়ে আক্রান্ত মানুষের আকুতি শুনে বাড়ি বাড়ি গিয়েও চিকিৎসা দিয়েছেন। মানুষের পাশে থাকতে গিয়ে ঠিকমত তিন বেলা খাবার খাওয়ার সময় পেতেন না অনেক সময়। শত শত মানুষ অসহায় হয়ে ফোন দিতেন ওনাকে। শুধু চিকিৎসা সেবাই নয়, বৈধ কাগজপত্রহীন মানুষের জন্য খাবার সামগ্রীও বিতরণ করেছেন।
বাবার এই কর্মযজ্ঞে দুই ছেলে পাশে ছিলেন জানিয়ে দিনা বলেন, ‘আমেরিকার এমন দুযোর্গে কাগজপত্রহীন অনেক প্রবাসীই খাবারের কষ্টে পড়ে যান। ওইসব মানুষের জন্য কিছু একটা করার উদ্যোগ নেন তিনি। খাবারের কষ্ট আছেন এমন ফোন পেলে আমরা খাবার পৌঁছে দিতাম, তিনি চিকিৎসা সেবা দিতেন আর আমরা বাজার থেকে বিভিন্ন প্রকারের খাবার সামগ্রী এনে আমাদের বাড়ি এবং অফিসে রাখতাম। ওনার একাটাই নির্দেশনা ছিল, কেউ খাবারের জন্য এসে যেন ফিরে না যায়। কিংবা ফোন করলে যেন খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। আমাদের এই কাজে কলেজপড়ুয়া ছেলে আতিক খন্দকার এবং ছোট ছেলে নাসিব খন্দকারও সহযোগীতা করেছে। ছেলে দুটোও বাবার মতো মানুষের উপকার করতে পছন্দ করে। অনেকের বাড়িতে আমরা নিজেরাই উপস্থিত হয়ে খাবার দিয়ে আসি, সেটা এখনও চলছে। ভিডিও কলের মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের চেম্বারের পাশপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাত আর দিন নেই চিকিৎসা দিয়ে গেছেন।
এমন ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি ডা. ফেরদৌস। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্ত্রী বলেন, সেই বিয়ের আগে থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার পাগলামী দেখেছিলাম ওনার ভেতরে। এসব দেখতে দেখতেই তাঁর প্রতি অন্য রকমের ভালো লাগা তৈরি হয়। এরপর নিজে ও স্বামী ভালো কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি। আর এমন একটি পেশার মানুষকে আমি বিয়ে করেছি যিনি পেশায় মানুষ এখন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। উনারাই এখন করোনাকালীন সময়ে সম্মুখযোদ্ধা।
দিনা জানান, তিনি নিজেও অনেক কম খাবার খান। বাাড়িতে কম খাবার রান্না করতে বলতেন। জানতে চাইলে বলতো, অনেকেই খাবারের কষ্টে আছে। নানা সমস্যায় আছে। বিভিন্ন রকমের খাবার টেবিলে থাকলে সেইসব অনাহারি মানুষের মুখগুলো ভেসে ওঠে। এই খাবার আমার মুখে ঢুকে না। শুধু তাই নয়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও দিন রাত অসুস্থ থেকে ভার্চুয়াল মানুষের সেবা দিয়ে গেছেন।
বাংলাদেশে আসার পর ছড়ানো মিথ্যাচার এবং গুজব প্রসঙ্গে ডাক্তার ফেরদৌসে স্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, একটি বিষয় আমার এখনো মনে আছে, চট্টগ্রাম ওয়্যার নিজাম রোডে আমাদের বাসা ছিল। সেই ১৯৯২ সালের দিকে। ওই সময় জয় বাংলা শ্লোগান দিতে মানুষ ভয় পেতো। ছিলো জামায়াত বিএনপির শক্ত অবস্থান। সেই সময় তাঁকে দেখিছি বিভিন্ন আন্দোলন-মিছিলে সামনে সারিতে থেকে জয় বাংলা শ্লোগান দিতে। দূর সম্পর্কের আত্মীয় হওয়ার কারণে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে গিয়ে পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়েছিলেন। ছাত্রলীগ করতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছিলের। এমনকি ‘৯২-এ শিবিরের নির্যাতনের শিকার হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু আর দলের প্রতি এমন টান যাঁর, সেই মানুষটিকে কিভাবে ছাত্রদল-বঙ্গবন্ধুর খুনীদের স্বজন বানিয়ে ফেলা হয়! আমার স্বামীর ওপর মিথ্যাচার দেখে সত্যিই বুক ফেটে কান্না আসে। দুই দিন ঠিকমত আমরা কেউ ঘুমাতে পারিনি। কিন্তু সত্যটা ঠিকই প্রকাশ পেয়েছে। আমার স্বামীর পাশে যারা ছিলেন সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’
দেশের কোয়ারেন্টিনে থাকা স্বামী ফেরদৌস খন্দকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘উনাকে আমি বলেছি, মনোবল হারাবে না, তোমার পাশে সমগ্র বাংলাদেশ আছে।’


Posted ৬:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ জুন ২০২০

ajkerograbani.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

Archive Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া সম্পাদক ও প্রকাশক
মুহা: সালাহউদ্দিন মিয়া কর্তৃক তুহিন প্রেস, ২১৯/২ ফকিরাপুল (১ম গলি) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

২ শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ সরণি, মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।

হেল্প লাইনঃ ০১৭১২১৭০৭৭১

E-mail: [email protected] | [email protected]